
জাপানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ দত্তক নেওয়ার প্রথা বহুদিনের। আপনি কি জানেন জাপানের সুজুকি, টয়োটা বা কিক্কোমানের মতো বিশাল কোম্পানির মালিক বিলিয়নিয়ার পরিবারগুলো ঘরজামাই দত্তক নিয়ে থাকে পারিবারিক লেগ্যাসি এগিয়ে নিতে? আসলে জাপানে প্রাপ্তবয়স্কদেরকে দত্তক নেওয়া একটি কমন ও বৈধ প্রথা। এটি মূলত পারিবারিক ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া এবং বংশগত ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্যই করা হয়। পাশ্চাত্যে যেখানে শিশু দত্তক গ্রহণ বেশি প্রচলিত, জাপানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদেরকেই দত্তক নেওয়া হয়।

ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া
জাপানের শতাব্দী-প্রাচীন অনেক কোম্পানি পারিবারিক মালিকানাধীন। খুব সেকেল ধারনার পরিচায়ক হলেও পুত্র সন্তান না থাকলে বা ছেলেকে এত বড় কোম্পানি চালানোর উপযুক্ত মনে না করলে জাপানের অনেক ধনাঢ্য পরিবার কোনো যোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে দত্তক নেয় যাতে ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় ও পরিবারের ঐতিহ্য বজায় থাকে। যেমন, জাপানের বিখ্যাত সুজুকি মোটর করপোরেশনের টানা চারজন প্রধানই ছিলেন দত্তক নেওয়া পুত্র। মাত্র গত বছর মারা যাওয়া সুজুকির প্রধান ওসামু সুজুকি ছিলেন আসলে দত্তক ঘরজামাই।

নিনটেনডো, কিক্কোমান, টয়োটার মতো বড় কোম্পানিগুলোও এই প্রথা ব্যবহার করেছে বিভিন্ন সময়ে। জাপান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দত্তক গ্রহণে শীর্ষে, এবং এর ৯০ শতাংশর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। সাধারণত ২০-৩০ বছরের তরুণদেরকেই দত্তক নেওয়া হয়।
মুকোয়োশি ট্র্যাডিশন
দত্তক ঘরজামাই বোঝানো হয় এই কথাটি দিয়ে। এই ট্র্যাডিশন অনুযায়ী, কন্যার স্বামীকে দত্তক নেওয়া হয়। তিনি শ্বশুরবাড়ির পদবি গ্রহণ করেন এবং ব্যবসা ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। এটি আসলে জাপানের পুরোনো একটি প্রথা এবং এখনো প্রচলিত।

উত্তরাধিকার ও কর
দত্তক প্রাপ্তবয়স্ককে সম্পদ হস্তান্তর করলে করের বোঝা অনেক কমে যায়। তাই নিঃসন্তান দম্পতিরা প্রায়ই এভাবে উত্তরাধিকার নির্ধারণ করেন জাপানে।
পরিবারের নাম টিকিয়ে রাখা
জাপানে পরিবারের নাম ও সম্মানকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। এদিকে কন্যাসন্তান বিয়ে হলে স্বামীর পদবী গ্রহণ করে। তাই জামাতাকে দত্তক নেওয়ার মাধ্যমে পরিবারের নাম প্রজন্ম ধরে টিকিয়ে রাখা হয়।
দত্তক গ্রহণ প্রক্রিয়া
আইনি নিবন্ধন: দত্তক নেওয়া হলে এটি সরকারি পারিবারিক নথি (কোসেকি)-তে নথিভুক্ত হয়। দত্তক নেওয়া ব্যক্তি নিজের পুরনো পদবি ত্যাগ করে নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করেন।
সম্মতি ও যোগ্যতা: দত্তক নিতে হলে দত্তক নেওয়া ও দত্তক হওয়া ব্যক্তি- উভয়ের সম্মতি লাগবে। দত্তক হওয়া ব্যক্তির বয়স অন্তত ১৫ বছর হতে হবে এবং দত্তকগ্রহীতার চেয়ে ছোট হতে হবে।
দায়িত্ব: দত্তক নেওয়া প্রাপ্তবয়স্ককে নিজ সন্তানের মতোই দায়িত্ব নিতে হয়, যেমন উত্তরাধিকার ও বয়স্ক দত্তকদাতার দেখাশোনা।

বিদেশিদের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক পদ্ধতি
বিদেশি বাসিন্দা: দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি থাকলে বিদেশিরাও জাপানে দত্তক নেওয়া যেতে পারে, তবে আদালতের অনুমোদন দরকার।
ইমিগ্রেশন: দত্তক নেওয়া মানেই নতুন ভিসা বা নাগরিকত্ব মেলে না; আলাদা করে আবেদন করতে হয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
জাপানিরা মনে করে, ব্যবসার ধারাবাহিকতা: যোগ্য উত্তরাধিকারী বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেক পরিবারিক ব্যবসা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি
অনেকে এখন এটিকে প্রাগম্যাটিক বা কৌশলগত ব্যবসা পদ্ধতি মনে করে। আর আসলে এই সময়ে এসে নারীদেরকে উত্তরাধিকারবলে ব্যবসা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যোগ্য মনে না করার কারণ নেই। বিশ্বে এখন বিভিন্ন দেশে বহু নারী ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তুখোড় দক্ষতা দেখাচ্ছেন। নারী রাষ্ট্রনায়কের সংখ্যাও তো কম নয়। সব মিলিয়ে বেশ সেকেলে এই মুকোইয়োশির পক্ষের যুক্তিগুলো।

ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপটে প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক গ্রহণ
জাপানে ধনী পরিবারগুলো মেয়ের স্বামীকে মুকোয়োশি প্রথায় দত্তক নেয়। এভাবে তারা ব্যবসার উত্তরাধিকারী তৈরি করে। দত্তক ছেলে নিজের পদবি বাদ দিয়ে স্ত্রীর পরিবারের পদবি নেয়। বাস্তবতা হচ্ছে, জন্মহার কমে যাওয়ায় জাপানে শুধু মেয়ে সন্তান থাকা ব্যবসায়ী পরিবার বেড়েছে। ফলে মুকোয়োশি বা দত্তক ঘরজামাই খুঁজে দেওয়ার জন্য সে দেশে বিশেষ ম্যাচমেকিং সেবা চালু হয়েছে। এমনকি জাপানে একটি প্রবাদ আছে: ছেলে তুমি বেছে নিতে পারো না, কিন্তু জামাই বেছে নিতে পারো।
ব্যবসায়িক কারণে দত্তক নেওয়ার কারণ আসলে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা। এই যুগে এসেও ব্যবসার জন্য যোগ্য নেতা নিশ্চিত করতে পুরুষকেই বেছে নিতে চায় জাপানি পরিবারগুলো। রক্ষণশীল আর সেকেলে এই চিন্তা অনযায়ী, ব্যবসার ঐতিহ্য, পরিবারের নাম ও সম্পদ বাঁচিয়ে রাখতে যোগ্য লোককে বেছে নেওয়া হয়ে সেখানে। ব্যবসার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকা নিশ্চিত করতেই তারা এমন পদক্ষেপ নেয় বলে জানা যায়। এই সময়ে যখন নারীরা রাষ্ট্র থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় ব্যবাদায়িক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তখন জাপানের এই ঘরজামাই দত্তক নেওয়ার প্রথা আসলেই অবাক করে সবাইকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এটিই তাদের যুগ যুগ ধরে লালিত ঐতিহ্য যা তারা খুব সহজে ছাড়বে বলে মনে হয় না।
সূত্র: বিবিসি, প্রজেক্ট নাইটফলের ইন্সটাগ্রাম, রিসার্চগেট
ছবি: ইন্সটাগ্রাম