সব আছে, তবু ভালো নেই? এই ৫ লক্ষণ মানসিক বার্নআউটের ইঙ্গিত
শেয়ার করুন
ফলো করুন

এমন অভিজ্ঞতা অনেকের জীবনে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিতে পারে। একে শুধু ‘কাজের ক্লান্তি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। দীর্ঘদিনের চাপ, নিজের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে বাস্তব জীবনের অসামঞ্জস্য এবং সব সময় অন্যের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা মানসিক বার্নআউটের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

তবে মনে রাখা জরুরি, প্রতিদিনের ক্লান্তি বা ব্যস্ততা মানেই বার্নআউট নয়। এটি সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক অবসাদ, কাজ বা জীবনের প্রতি অনীহা এবং নিজের সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক অনুভূতির সঙ্গে জড়িত।

১. বিশ্রামের পরও ক্লান্ত লাগে

এক রাত ভালোভাবে ঘুমানোর পরও যদি মনে হয় শরীর-মন যেন আগের মতোই ক্লান্ত, তাহলে বিষয়টি খেয়াল করার মতো। কাজের চাপের কারণে সাময়িক ক্লান্তি স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্রাম, ছুটি কিংবা অবসর নেওয়ার পরও যদি শক্তি ফিরে না আসে, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রভাব থাকতে পারে।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই যদি মনে হয়, ‘আবার একটা কঠিন দিন শুরু হলো’ তাহলেও নিজের মানসিক অবস্থার দিকে একটু মনোযোগ দেওয়া দরকার।

২. যে জীবন বেছে নিয়েছেন, সেটাই আর ভালো লাগে না

কখনো কখনো সমস্যাটা কাজের পরিমাণে নয়, কাজ বা জীবনযাপনের ধরনে। যে চাকরি, জীবনধারা বা সামাজিক অবস্থান একসময় সাফল্যের প্রতীক মনে হয়েছিল, সেটিই হয়তো এখন আপনাকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে তুলছে।

অন্যের চোখে জীবনটা যতই সফল দেখাক, নিজের কাছে যদি সেটি অর্থহীন মনে হয়, তাহলে সেই অসামঞ্জস্য মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

৩. সব সময় ‘পারফেক্ট’ থাকার চাপ অনুভব করেন

ভালো চাকরি, সুন্দর বাড়ি, দামি গাড়ি, সন্তানের সেরা স্কুল, সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি সবকিছুতেই নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

সমস্যা তখনই বাড়ে, যখন নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অন্যের চোখে কেমন দেখাচ্ছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সব সময় নিখুঁত থাকার এই চাপ ধীরে ধীরে মানসিক শক্তি কমিয়ে দিতে পারে।

৪. টাকা খরচ করেও আনন্দ পান না

বার্নআউটের সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপও অনেক সময় জড়িয়ে থাকে। নিজের পছন্দের জীবনযাপন ধরে রাখতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ, ঋণের চাপ বা এমন চাকরিতে টিকে থাকা যেটি একেবারেই ভালো লাগে না। মানসিক ক্লান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আবার উল্টো দিকও আছে। নিজের প্রয়োজনের জন্য সামান্য খরচ করেও যদি অপরাধবোধ হয়, কিংবা আয় থাকা সত্ত্বেও জীবন উপভোগ করার সুযোগ না থাকে, তাহলে নিজের জীবনযাপন নিয়ে একবার ভাবা দরকার।

৫. নিজের পছন্দ ও জীবনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে

আপনি কী চান আর বাস্তবে কী করছেন এই দুইয়ের মধ্যে দূরত্ব যত বাড়তে থাকে, মানসিক চাপও তত বাড়তে পারে।
হয়তো আপনি অন্য ধরনের কাজ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শুধু সামাজিক মর্যাদার কারণে একটি নির্দিষ্ট পেশায় আছেন। হয়তো ধীর গতির জীবন চান, কিন্তু সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন। কিংবা নিজের ভালো লাগার জন্য সময় বের করতে পারছেন না।
বিশ্রাম নিয়েও যদি স্বস্তি না আসে, নিজের জীবন নিয়ে অনীহা তৈরি হয় কিংবা মনে হয় ‘আমি আসলে এই জীবনটা চাইনি’। তাহলে সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

বিজ্ঞাপন

কঠোর পরিশ্রম আর বার্নআউট এক নয়

অনেকেই মনে করেন, বেশি কাজ করলেই বার্নআউট হয়। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরল নয়। নিজের পছন্দের ও অর্থপূর্ণ কোনো কাজে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেও একজন মানুষ তৃপ্তি পেতে পারেন। অন্যদিকে, নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে না মেলা কাজ অল্প সময় করেও মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দিতে পারে।

তাই শুধু কত ঘণ্টা কাজ করছেন, সেটি নয় কাজটি আপনার জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবর্তন চাইলে সেটি ব্যর্থতা নয়

নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবা মানেই আপনি ব্যর্থ হয়েছেন, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। ক্যারিয়ার বদলানো, কিছুদিন বিরতি নেওয়া, জীবনযাত্রা সহজ করা কিংবা নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক সময় সুস্থ ও সচেতন সিদ্ধান্ত হতে পারে।

তবে হঠাৎ বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের আর্থিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি।

পাশে থাকা মানুষগুলোও গুরুত্বপূর্ণ

মানসিকভাবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে সবকিছু একা সামলানোর চেষ্টা না করাই ভালো। পরিবার, বন্ধু কিংবা বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সঙ্গে নিজের অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে।

প্রয়োজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, মন খারাপ বা দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো বিষয়গুলোকে হালকাভাবে দেখা উচিত নয়।

অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও মানসিক শান্তির অংশ

জীবন বদলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে ভাবুন। সম্ভব হলে কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় খরচের জন্য জরুরি তহবিল তৈরি করুন। এতে চাকরি পরিবর্তন, বিরতি নেওয়া কিংবা নতুন কোনো পরিকল্পনা করার সময় চাপ কিছুটা কম থাকে।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনা শুধু ভবিষ্যতের নিরাপত্তাই দেয় না, অনেক সময় বর্তমানের মানসিক চাপও কমাতে সাহায্য করে।

নিজের জন্য সময় রাখুন

শুধু কাজ থেকে একদিন ছুটি নিলেই সব ক্লান্তি দূর হয় না। প্রতিদিনের জীবনে নিজের জন্য ছোট ছোট বিরতির জায়গা তৈরি করাও জরুরি। বই পড়া, গান শোনা, হাঁটতে বের হওয়া, নতুন কিছু শেখা কিংবা নিছক কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকা, যা আপনাকে স্বস্তি দেয়, সেটির জন্য সময় রাখুন।

সব সময় কাজের মধ্যে থাকতে হবে এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসা দরকার। বিশ্রামও জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ।

শেষ কথা

সফল দেখানো আর ভালো থাকা, দুটি এক বিষয় নয়। আপনার জীবন বাইরে থেকে যতই সুন্দর মনে হোক, ভেতরে যদি প্রতিদিন ক্লান্তি, চাপ কিংবা শূন্যতা জমতে থাকে, তাহলে নিজের দিকে একটু ফিরে তাকানোর সময় এসেছে।

কোন জীবন আপনাকে সত্যিই ভালো রাখে, কোন কাজ আপনাকে আনন্দ দেয় আর কোন প্রত্যাশাগুলো শুধু অন্যের জন্য পূরণ করছেন, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু কতটা অর্জন করলেন, তা নয়; নিজের বেছে নেওয়া জীবনটিতে কতটা শান্তিতে আছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

ছবি: এআই

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৪: ৪৯
বিজ্ঞাপন