ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় বড় পর্দার সামনে তখন হাজারো মানুষের ঢল। লিওনেল মেসি গোল করতেই মুহূর্তের মধ্যে উল্লাসে ফেটে পড়ল পুরো এলাকা। কেউ লাফিয়ে উঠলেন, কেউ অপরিচিত একজনকে জড়িয়ে ধরলেন। নীল-সাদা আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে সেই উচ্ছ্বাস দেখে যে কেউ ভাবতে পারেন, এটি হয়তো বুয়েনস এইরেসের কোনো চত্বর। অথচ এটি ঢাকা, আর সেই উল্লাসে মেতে থাকা প্রায় সবাই বাংলাদেশি।
বিশ্বকাপ এলেই এমন দৃশ্য এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়; ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ আরও অনেক দেশেও দেখা যায়। নিজেদের জাতীয় দল বিশ্বকাপে না খেললেও ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে নিজেদের উৎসবে পরিণত করেন কোটি কোটি মানুষ।
বিবিসির এক বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলছে মাত্র দুটি—যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল। বাকি দেশগুলোর মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়া কখনোই বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে পারেনি। চীন ও ইন্দোনেশিয়া খেলেছে মাত্র একবার করে। অথচ এসব দেশের জনসংখ্যা মিলেই বিশ্বের একটি বড় অংশ।
প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক—এত মানুষের দেশ অথচ বিশ্বকাপে একটি দলও নেই কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা ফুটবলে সাফল্যের একটি উপাদান হলেও সেটিই সব নয়। প্রতিভা খুঁজে বের করার ব্যবস্থা, মানসম্মত একাডেমি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং শক্তিশালী লিগ কাঠামো—এসবের সমন্বয় ছাড়া বিশ্বমানের দল গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
ফুটবল অর্থনীতি নিয়ে গবেষণার জন্য পরিচিত ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ স্টেফান শিমানস্কির মতে, বড় জনসংখ্যা একটি দেশের সম্ভাবনা বাড়ায়, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দরকার অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং ফুটবল-জ্ঞান। তাঁর ভাষায়, ফুটবলেও অর্থনীতির মতো শুধু মানুষ থাকলেই হয় না; সেই মানুষকে দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থাও থাকতে হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন সেই কথারই প্রতিফলন। দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় ফুটবল নিয়ে আবেগ রয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই ছাদে উড়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ডের পতাকা। রাত জেগে খেলা দেখা, বড় পর্দায় সমর্থকদের ভিড়, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক—সব মিলিয়ে পুরো দেশ যেন এক মাসের জন্য ফুটবলের উৎসবে মেতে ওঠে।

অনেকের মতে, এত ফুটবলপ্রেমী মানুষের দেশ হয়েও বিশ্বকাপে না খেলতে পারা হতাশাজনক। তবে সমস্যার মূল কারণ ক্রিকেট নয়; বরং ফুটবলের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব।

ভারতের সাবেক ফুটবলার শ্যাম থাপার মতে, ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা অনেক পরিবারকে ফুটবলের বদলে ক্রিকেট বেছে নিতে উৎসাহিত করে। তবে এই যুক্তিরও ব্যতিক্রম রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটে সফল হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ফুটবল বিশ্বকাপও খেলছে। ফলে অনেকের মতে, সমস্যা জনপ্রিয়তায় নয়, পরিকল্পনার ঘাটতিতে।
চীনের উদাহরণও ভিন্ন বাস্তবতার কথা বলে। বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও দেশটি ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি। অন্যদিকে মরক্কো কয়েক দশকের পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এশিয়ার ফুটবলে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের জন্য এই উদাহরণগুলো যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনি বাস্তবতারও স্মারক।
বিশ্বকাপের ট্রফি হয়তো এখনো বাংলাদেশের নাগালের বাইরে। কিন্তু বিশ্বকাপের আনন্দ থেকে বাংলাদেশিরা কখনোই নিজেদের দূরে রাখেননি। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে, রাত জেগে খেলা দেখে, জয়-পরাজয়ে হাসি-কান্না ভাগ করে নিয়ে তারা বারবার প্রমাণ করেছেন—বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আর বিশ্বকাপকে হৃদয়ে ধারণ করা এক বিষয় নয়।

ফাইনালের বাঁশি বাজলেও বিশ্বকাপের আবেশ খুব দ্রুত মিলিয়ে যাবে না। দেশের কোথাও না কোথাও আবারও বড় পর্দার সামনে জড়ো হবে মানুষ। কেউ মেসির স্মৃতি নিয়ে, কেউ এমবাপ্পের গতির গল্পে, কেউ হ্যারি কেন কিংবা অন্য কোনো তারকার নামে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠবেন। আর সেই উল্লাসের ভিড়েই নীরবে বেঁচে থাকবে আরেকটি স্বপ্ন—একদিন এই বড় পর্দায় অন্য কোনো দেশের নয়, লাল-সবুজ জার্সি গায়ে বাংলাদেশের ফুটবলারদের বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখবে এই দেশ। সেই অপেক্ষাই হয়তো বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
ছবি: প্রথম আলো ও এএফপি