
ভাজি, ভর্তা কিংবা ঝোলে পিচ্ছিল ভাবের জন্য ঢ্যাঁড়স অনেকেরই পছন্দ নয়। আমাদের কাছে এটি পরিচিত একটি সবজি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কাছে ঢ্যাঁড়সের সেই পিচ্ছিলতাই এখন পরিবেশ রক্ষার একটি সম্ভাবনাময় উপাদান হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ঢ্যাঁড়স থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক পলিস্যাকারাইড বা আঠালো উদ্ভিজ্জ উপাদান পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলোকে একসঙ্গে জড়ো করে পানির বাইরে আলাদা করতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে সমুদ্রের পানির পরীক্ষায় ঢ্যাঁড়সের নির্যাস প্রায় ৮০ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পেরেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে এসিএস ওমেগায়।
আমাদের রান্নাঘরের পরিচিত একটি সবজি যদি ভবিষ্যতে দূষিত পানি পরিষ্কারের প্রযুক্তিতে কাজে লাগে, তাহলে খাবারের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্কটাও নতুন করে ভাবতে হয়।

ঢ্যাঁড়স কাটলে যে পিচ্ছিল ও আঠালো পদার্থ বের হয়, তার মধ্যেই রয়েছে প্রাকৃতিক পলিস্যাকারাইড। গবেষকেরা এই উদ্ভিজ্জ পলিমার আলাদা করে পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সঙ্গে কীভাবে কাজ করে, তা পরীক্ষা করেছেন।
এখানে ঢ্যাঁড়স সরাসরি প্লাস্টিক ‘খেয়ে ফেলছে’—বিষয়টি এমন নয়। বরং এর প্রাকৃতিক পলিমারগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছোট ছোট কণাগুলোকে একসঙ্গে জড়ো করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ফ্লকুলেশন। ফলে কণাগুলো জমাট বেঁধে তুলনামূলক ভারী হয়ে পানির নিচে বসে যায়। পরে সেগুলো আলাদা করা সহজ হয়।
গবেষণায় এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘ব্রিজিং’ মেকানিজমের সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ রান্নার সময় ঢ্যাঁড়সের যে পিচ্ছিল ভাব অনেকের অপছন্দের কারণ, সেই বৈশিষ্ট্যের পেছনে থাকা প্রাকৃতিক পলিমারই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের জায়গা।
গবেষণায় শুধু কৃত্রিমভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো পানি ব্যবহার করা হয়নি। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উৎস থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে ঢ্যাঁড়স ও মেথির নির্যাস পরীক্ষা করেছেন।

ফলাফল পানির ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হয়েছে। সমুদ্রের পানির ক্ষেত্রে ঢ্যাঁড়সের নির্যাস প্রায় ৮০ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পেরেছে। ভূগর্ভস্থ পানির নমুনায় মেথির নির্যাস ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করেছে। আর মেথি ও ঢ্যাঁড়সের সমান অনুপাতের মিশ্রণ মিঠাপানির নমুনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ অপসারণে সফল হয়েছে।
অর্থাৎ সব ধরনের পানিতে একই উদ্ভিজ্জ উপাদান একইভাবে কাজ করেনি। পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের ধরন, আকার ও আকৃতির পার্থক্য এর একটি কারণ হতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন।

প্লাস্টিকের বড় টুকরা সময়ের সঙ্গে ভেঙে পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কণায় পরিণত হলে সেগুলোকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। নদী, সমুদ্র, মাটি এবং বিভিন্ন জলীয় পরিবেশে এসব ক্ষুদ্র কণার উপস্থিতি এখন বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। এর পৃষ্ঠে বিভিন্ন দূষকও আটকে থাকতে পারে। জলজ প্রাণী এসব কণা গ্রহণ করলে খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যেও তা প্রবেশ করতে পারে।
এ কারণেই পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরানোর কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।

পানি পরিশোধনের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বর্তমানে কৃত্রিম পলিমার ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীদের আগ্রহের জায়গা হলো, এসব উপাদানের কিছু ক্ষেত্রে উদ্ভিদ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক পলিস্যাকারাইড ব্যবহার করা সম্ভব কি না।
এই গবেষণায় ঢ্যাঁড়স ও মেথির পলিমারকে প্রচলিত সিন্থেটিক পলিমার পলিঅ্যাক্রাইলামাইডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পরীক্ষায় উদ্ভিদজাত পলিমারগুলো বিভিন্ন পানির নমুনা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণে কার্যকর হয়েছে। গবেষকেরা এগুলোকে সম্ভাব্য জৈব-বিয়োজ্য ও কম বিষাক্ত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে এখানেই গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাটিও মনে রাখা জরুরি।
এখনই এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। গবেষণাটি ছিল পরীক্ষাগারভিত্তিক ও বেঞ্চ-স্কেল পরীক্ষা। বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ উদ্ভিজ্জ পলিমার ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিভিন্ন পানির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন।
বাস্তব সমুদ্র, নদী বা বিশাল পরিমাণ পানিতে একই প্রক্রিয়া একই দক্ষতায় কাজ করবে কি না, সেটি এখনো গবেষণার বিষয়। গবেষণাপত্রেও বিভিন্ন ধরনের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও উদ্ভিজ্জ পলিমারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই এই মুহূর্তে ‘ঢ্যাঁড়স সমুদ্র পরিষ্কার করতে পারে’ বলার চেয়ে ‘ঢ্যাঁড়সের প্রাকৃতিক পলিমার মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণের সম্ভাবনাময় উপাদান’ বলা বেশি নির্ভুল।

বিজ্ঞান অনেক সময় আমাদের একেবারে পরিচিত জিনিসের মধ্যেই নতুন সম্ভাবনা খুঁজে নেয়। ঢ্যাঁড়সের পিচ্ছিল রসও তার একটি সুন্দর উদাহরণ।
যে সবজি আমরা ভাজি, ভর্তা কিংবা ঝোলে ব্যবহার করি, তার ভেতরের প্রাকৃতিক পলিমার নিয়ে গবেষণা এখন পানিদূষণ মোকাবিলার নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে। এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে ঘরে বসে ঢ্যাঁড়স ভিজিয়ে সমুদ্রের পানি পরিষ্কার করা যাবে।
বরং গবেষণাটি আমাদের সামনে একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। প্রকৃতিতে থাকা সহজলভ্য উদ্ভিদজাত উপাদান থেকেও ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব পানি পরিশোধন প্রযুক্তির ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
আমাদের খাবারের তালিকায় থাকা একটি সাধারণ সবজি একদিন এমন প্রযুক্তির অংশ হতে পারে, যা নদী, হ্রদ কিংবা সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা সরাতে সাহায্য করবে। গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে প্রকৃতিকে রক্ষা করার নতুন কোনো পথ যদি আমাদের পরিচিত একটি সবজির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, সেই সম্ভাবনাকে আরও খুঁজে দেখার কারণ নিশ্চয়ই আছে।
তথ্যসূত্র: সায়েন্স ডেইলি
ছবি: পেকজেলসডটকম