
২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এই ঐতিহাসিক ভেন্যুতেই মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো ও ইংল্যান্ড। নিজেদের ঘরের মাঠে মেক্সিকো কতটা বাড়তি সুবিধা পাবে, দর্শকদের উন্মাতাল সমর্থন ম্যাচের গতিপথ কতটা বদলে দিতে পারে কিংবা আজতেকার উচ্চতা ইংল্যান্ডের জন্য কতটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে—এসব নিয়েই চলছে বিশ্লেষক ও ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনা।

ইংল্যান্ডের কোচ অ্যালান শিয়েরার বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কিশোর বয়সে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ টেলিভিশনে দেখে আজতেকা স্টেডিয়ামের প্রেমে পড়েছিলেন তিনি। সেই মাঠেই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের নাটকীয় কোয়ার্টার ফাইনালের স্মৃতি আজও ফুটবল ইতিহাসের অংশ।
এবার সেই একই মাঠে ইংল্যান্ডকে খেলতে দেখার অপেক্ষায় আছেন তিনি। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি ম্যাচ নয়, ফুটবলের ইতিহাসের সঙ্গে নতুন করে সাক্ষাৎ। বিশ্বকাপের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হতে প্রস্তুত আজতেকা। তবে ম্যাচ শুরুর আগে চলুন হাল ফ্যাশন-এর পাঠকদের জন্য জানিয়ে দেওয়া যাক বিশ্বের অন্যতম কিংবদন্তি এই স্টেডিয়ামের গৌরবময় ইতিহাস ও নেপথ্যের কিছু অজানা গল্প।

রাজধানী মেক্সিকো সিটির দক্ষিণে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬২ সালে। প্রায় চার বছরের নির্মাণ শেষে ১৯৬৬ সালের ২৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকা এবং ইতালির তোরিনো মুখোমুখি হয়েছিল। শুরুতে স্টেডিয়ামটির ধারণক্ষমতা ছিল এক লাখের বেশি দর্শক। নিরাপত্তা ও আধুনিকায়নের কারণে বর্তমানে এটি প্রায় ৮৩ হাজার দর্শক ধারণ করতে পারে।
আজটেকা স্টেডিয়ামের নকশা করেছিলেন মেক্সিকোর দুই খ্যাতনামা স্থপতি পেদ্রো রামিরেস ভাসকেস এবং রাফায়েল মিখারেস আলসেরেকা। ১৯৬৬ সালে উদ্বোধন হওয়া এই স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হয়েছিল এমনভাবে, যাতে প্রায় প্রতিটি আসন থেকেই মাঠ পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।

স্টেডিয়ামটি আংশিকভাবে মাটির নিচে নির্মিত। ফলে বাইরে থেকে এটি তুলনামূলক নিচু দেখালেও ভেতরে প্রবেশ করলে বিশাল গ্যালারির পরিধি চোখে পড়ে। বৃত্তাকার নকশা, খাড়া গ্যালারি এবং বহুস্তরের আসন বিন্যাস দর্শকদের মাঠের খুব কাছাকাছি থাকার অনুভূতি দেয়। প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল এবং শব্দের প্রতিধ্বনি মাথায় রেখেই এর নকশা করা হয়েছে, যার ফলে ম্যাচের সময় দর্শকদের গর্জনে পুরো স্টেডিয়াম কেঁপে ওঠে। আধুনিক সংস্কারের পরও আজটেকার ঐতিহাসিক স্থাপত্যের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে। বর্তমানে এটি প্রায় ৮৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ফুটবল স্টেডিয়াম।
আজতেকা স্টেডিয়ামের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, এটি বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম, যেখানে দুটি ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
১৯৭০ বিশ্বকাপ

এ স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রাজিল ও ইতালির ফাইনাল। পেলের নেতৃত্বে ব্রাজিল ৪-১ গোলে জিতে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে এবং স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফি নিজেদের করে নেয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপ
১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনাল আয়োজন করে আজতেকা। এবার আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে সেই বিশ্বকাপ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা আসর হিসেবে বিবেচিত।
‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’

আজতেকা স্টেডিয়ামের ইতিহাস বলতে গেলে ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালের কথা না বললেই নয়। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের সেই ম্যাচেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা প্রথমে হাত দিয়ে গোল করেন, যা পরে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে ইতিহাসে স্থান পায়। মাত্র কয়েক মিনিট পরই তিনি বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে গোলটি করেছিলেন, সেটি পরে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
একই ম্যাচে বিশ্বের অন্যতম বিতর্কিত গোল এবং অন্যতম সেরা গোল—দুটিই হয়েছিল আজতেকা স্টেডিয়ামে।
শুধু বিশ্বকাপ নয়, আজতেকা স্টেডিয়াম অসংখ্য আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলের বড় ম্যাচের আয়োজক। ১৯৬৮ সালের অলিম্পিক ফুটবলের ফাইনাল, ১৯৯৯ সালের কনফেডারেশনস কাপের ফাইনাল, অসংখ্য কনকাকাফ গোল্ডকাপ ফাইনাল ও মেক্সিকো জাতীয় দলের বহু স্মরণীয় ম্যাচ হয়েছে এখানে। এই স্টেডিয়াম দীর্ঘদিন ধরে মেক্সিকোর জনপ্রিয় ক্লাব ‘ক্লাব আমেরিকা’রও ঘরের মাঠ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ২৪০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত আজতেকা স্টেডিয়াম। ফলে এখানে অক্সিজেনের মাত্রা তুলনামূলক কম। এ কারণে অনেক বিদেশি দল ম্যাচের শেষ দিকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। উচ্চতার এই প্রভাব আজতেকাকে প্রতিপক্ষের জন্য আরও কঠিন ভেন্যুতে পরিণত করেছে।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আগে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে আজতেকা স্টেডিয়ামে। এ স্টেডিয়ামই ইতিহাসের প্রথম ভেন্যু হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ (১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬) আয়োজনের গৌরব অর্জন করেছে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাই আজতেকা শুধু একটি স্টেডিয়ামের নাম নয়; এটি পেলের বিশ্বজয়, ম্যারাডোনার জাদু, কোটি দর্শকের উল্লাস এবং ফুটবলের অমর স্মৃতির এক জীবন্ত সংগ্রহশালা।
ছবি: উইকিপিডিয়া, রয়টার্স ও ইন্সটাগ্রাম