শোক সামলাতে চীনে শুরু হয়েছে মৃত ব্যক্তির এআই রূপের ব্যবহার, কীভাবে কাজ করে এটি আর কতটা কার্যকর
শেয়ার করুন
ফলো করুন

গত বছর চীনে এক ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর তাঁর পরিবার এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ফার্মের সাহায্যে তাঁর একটি এআই সংস্করণ তৈরি করে, যাতে বৃদ্ধা মাকে শোক সামলাতে সাহায্য করা যায়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা নিয়ে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যা এখন রীতিমতো ভাইরাল। এর পক্ষে ও বিপক্ষে বহু মত দিচ্ছেন বিশ্বের নেটিজেনরা।

মৃত চাইনিজ ব্যক্তিটির এই এআই সংস্করণটি তাঁর আশি বছর বয়সী মায়ের সঙ্গে অনলাইনে কথা বলতে পারে এবং তাঁকে একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর বাস্তবতার সঙ্গে ধীরে ধীড়ে মানিয়ে নিতে পরিবারটিকে সাহায্য করছে। চীনের জিয়াংসু প্রদেশভিত্তিক এই ফার্মের প্রযুক্তি টিমের প্রধান ঝাং জেওয়েই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটির কথা প্রকাশ করেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে।

এআই সংস্করণটি তাঁর আশি বছর বয়সী মায়ের সঙ্গে অনলাইনে কথা বলতে পারেন
এআই সংস্করণটি তাঁর আশি বছর বয়সী মায়ের সঙ্গে অনলাইনে কথা বলতে পারেন

শানডং প্রদেশে বসবাসকারী ওই পরিবারটি ঝাংয়ের ক্লায়েন্টদের একজন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত ছেলের এআই রূপ নিয়মিত ভিডিও কলে তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন।
গত বছরের শুরুতে ওই বৃদ্ধার একমাত্র সন্তান সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পরিবার চেয়েছিল খবরটি তাঁর কাছ থেকে গোপন রাখতে, কারণ তিনি অশীতিপর এবং হৃদরোগে ভুগছেন।

বিজ্ঞাপন

মৃত ব্যক্তির ছেলে অর্থাৎ বৃদ্ধা মায়ের নাতি ঝাংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন আর তাঁর বাবার অনেক ছবি, ভিডিও ও কথাবলার অডিও দিয়ে একটি ডিজিটাল এআই প্রতিরূপ তৈরি করতে বলে। প্রতিবেদন বলছে, এই এআই প্রতিরূপটি দেখতে হুবহু ওই ব্যক্তির মতো, এমনকি কথা বলার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে থাকার অভ্যাসটিও নকল করে।
এই ভার্চুয়াল ছেলে প্রতিদিন একটি চ্যাট অ্যাপের মাধ্যমে ভিডিও কলে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন।

এআই প্রতিরূপটি দেখতে হুবহু ওই ব্যক্তির মতো
এআই প্রতিরূপটি দেখতে হুবহু ওই ব্যক্তির মতো

মা প্রায়ই ছেলেকে ভালো করে খেতে, গরম কাপড় পরতে এবং বাইরে গেলে নিজের নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখতে বলেন। জবাবে ছেলে তাঁকে আশ্বস্ত করে যে তিনি মায়ের কথা মেনে চলবেন। আরও বলেন, তাঁকে অন্য শহরে কাজ করতে হচ্ছে, তাই মায়ের কাছে ফিরতে পারছেন না। এখন পর্যন্ত মা জানেন না যে তার ছেলে মারা গেছেন। প্রতিবেদনে পরিবারের আর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

ঝাং তিন বছর ধরে এরকম বিভিন্ন পরিস্থিতে গ্রাহকদেরকে কাস্টোমাইজড এআই সেবা দিচ্ছেন। এই খবরটি চীনের সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, এবং মানুষের মতামত বিভক্ত এই বিষয়ে। একজন অনলাইন ব্যবহারকারী বলেন, “এটি খুবই স্পর্শকাতর। এআই ছেলে একটি মর্মস্পর্শী মিথ্যা।” আরেকজন বলেন, “দারুণ একটি উদ্ভাবন। আমি আমার বাবাকেও এভাবে ফিরিয়ে আনতে চাই।” তবে অন্যরা ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। একজন বলেন, “আমি এই পরিবারের পক্ষ নিচ্ছি না। মা দীর্ঘদিন ধরে প্রতারিত হচ্ছেন। সত্য প্রকাশ পেলে এটি তাঁকে আরও কষ্ট দেবে বলে আমি আশঙ্কা করি।”

চীনে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মৃত মানুষের প্রতিরূপ” তৈরি করার প্রযুক্তি এক নতুন ঘটনা
চীনে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মৃত মানুষের প্রতিরূপ” তৈরি করার প্রযুক্তি এক নতুন ঘটনা

মৃত সন্তানের শোক সামলাতে এআই আশীর্বাদ নাকি নতুন সংকট?

প্রিয়জন হারানোর বেদনা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর ও কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। বিশেষ করে সন্তানের মৃত্যু—এ শোক ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। এমন এক বাস্তবতায় চীনে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মৃত সন্তানের “ডিজিটাল প্রতিরূপ” তৈরি করার প্রযুক্তি কি শোক সামলানোর সহায়ক, নাকি তা আরও গভীর মানসিক জটিলতা তৈরি করছে?

একদিক থেকে দেখলে, এটি অনেকের জন্য স্বস্তির এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। যারা হঠাৎ প্রিয়জন হারান, তারা প্রায়ই ‘অসমাপ্ত কথোপকথন’ বা অপূর্ণ আবেগে ভোগেন। এআই-চালিত এই ভার্চুয়াল সত্তার সঙ্গে কথা বলা অনেকের কাছে থেরাপির মতো কাজ করছে। তারা মনে করছেন, অন্তত কিছুটা হলেও প্রিয়জনের উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি “গ্রিফ প্রসেসিং”-এর একটি বিকল্প পদ্ধতি, যা মানুষকে ধীরে ধীরে বাস্তবতা মেনে নিতে সাহায্য করতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তি শোকের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে
এ ধরনের প্রযুক্তি শোকের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে

তবে বিষয়টির অন্য দিকও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি শোকের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। মৃত্যু মেনে নেওয়ার পরিবর্তে মানুষ যদি ভার্চুয়াল উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, এমনকি একধরনের আবেগগত আসক্তিও গড়ে উঠতে পারে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো নৈতিকতা ও গোপনীয়তা। মৃত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর বা চেহারা ব্যবহার করে এআই তৈরি করা কতটা ন্যায়সংগত? সেই ব্যক্তি জীবিত থাকলে কি এমন ব্যবহারের অনুমতি দিতেন? অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের আবেগের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আইনি ও নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

এছাড়া, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এআই কখনোই প্রকৃত মানুষ নয়; এটি কেবল ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এক অনুকরণ। ফলে ব্যবহারকারী যদি এটিকে বাস্তব বলে ধরে নেন, তাহলে এক ধরনের “মায়া” তৈরি হতে পারে, যা বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও মানসিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

এআই কখনোই প্রকৃত মানুষ নয়; এটি কেবল ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এক অনুকরণ
এআই কখনোই প্রকৃত মানুষ নয়; এটি কেবল ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এক অনুকরণ

সব দিক বিবেচনায়, মৃত সন্তানের শোক সামলাতে এআই ব্যবহারের বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে ইতিবাচক বা নেতিবাচক নয়। এটি যেমন কিছু মানুষের জন্য সান্ত্বনার উৎস, তেমনি অন্যদের জন্য নতুন ধরনের মানসিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা, নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রয়োজনে পেশাদার মনোবিদের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শোক একটি ব্যক্তিগত যাত্রা—এআই সেই যাত্রায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতাকে প্রতিস্থাপন করার মতো শক্তি তার নেই।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

ছবি: প্রতীকী ও এ আই দিয়ে তৈরি আর পেকজেলস, ইন্সটাগ্রাম থেকে নেওয়া

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০০: ৩৫
বিজ্ঞাপন