কংক্রিটের শহরে সবুজের ঠিকানা জাতীয় বৃক্ষমেলা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কংক্রিটের শহরে সবুজ যেন বিলাসিতা। অথচ আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলা মাঠে ঢুকতেই সেই অনুভূতি বদলে যায়। চারদিকে গাছের সারি, ফুল-পাতার গন্ধ, পাখির ডাক আর সবুজে ঘেরা বসার জায়গা—মনে হবে যেন শহরের মাঝেই ছোট্ট একটি বোটানিক্যাল পার্ক। এখানে ঢুকলে মুহূর্তেই ভুলে যেতে ইচ্ছা হবে যানজট, ধুলো আর ব্যস্ততার শহরকে। বর্ষার এই সময়ে তাই জাতীয় বৃক্ষমেলা শুধু গাছ কেনার জায়গাই নয়, প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ারও এক সুন্দর উপলক্ষ।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলা মাঠে চলছে এই জাতীয় বৃক্ষমেলা। মেলা চলবে ৭ আগস্ট পর্যন্ত, তবে প্রয়োজনে সময় বাড়তে পারে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত এ আয়োজনে প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না।

বন বিভাগ আয়োজিত এবারের মেলায় অংশ নিয়েছে ১২০টি স্টল। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন নার্সারির পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে তথ্যকেন্দ্র, প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশ্রামাগার, ব্রেস্টফিডিং কর্নারসহ প্রয়োজনীয় নানা সেবার ব্যবস্থা।

আড়াই হাজারের বেশি প্রজাতির গাছ

এবারের মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বৈচিত্র্য। প্রায় আড়াই হাজার প্রজাতির গাছ একসঙ্গে দেখার সুযোগ মিলছে এখানে। ফলদ, বনজ, ঔষধি, মসলাজাতীয়, শোভাবর্ধনকারী, ইনডোর প্ল্যান্ট কিংবা সংগ্রহযোগ্য বিরল প্রজাতির গাছ—সবই মিলছে একই ঠিকানায়। নজর কাড়ছে ফলে ভরা চারা গাছ। ডালে ঝুলছে কাঁচা-পাকা আম। দেশি জাতের পাশাপাশি রয়েছে চিয়াংমাই, কিং অব চাকাপাত, মিয়াজাকি ও আমেরিকান রেড পালমারের মতো বিদেশি আমের চারা।

আছে রাম্বুটান, অ্যাভোকাডো, পার্সিমন, কিউই, ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম, মিসরীয় ডুমুর, ভিয়েতনামি কাঁঠাল, অ্যাবিউ, হলুদ সফেদা, বিলাতি গাব, লটকন, ডেউয়া, আতা, শরিফা, লিচু, জাম, পেয়ারা, ডালিম, কামরাঙা, লেবুসহ অসংখ্য দেশি-বিদেশি ফলের গাছ।

বিজ্ঞাপন

শহুরে ঘরের জন্য সবুজ

ছোট ফ্ল্যাট, অফিস কিংবা বারান্দা সাজাতে এখন ইনডোর প্ল্যান্টের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। মেলাজুড়েও তার ছাপ স্পষ্ট। সানসেভেরিয়া, মনস্টেরা, অ্যাগলোনিমা, অ্যানথুরিয়াম, লাকি ব্যাম্বো, এয়ার প্ল্যান্ট, হুপারজিয়া, অর্কিড, বাগানবিলাস, ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট—বৈচিত্র্যে ভরা এসব গাছের সামনে ভিড় করছেন তরুণ ক্রেতারা।

রিকল গ্রিনের স্টলে দেখা মিলল থাইল্যান্ড থেকে আনা বিভিন্ন অর্নামেন্টাল গাছের। সেলফ-ওয়াটারিং টবে লাগানো মানি ট্রি, মনস্টেরা, অ্যানথুরিয়াম কিংবা এয়ার প্ল্যান্ট সহজেই রাখা যায় ঘর বা অফিসে।

আছে দৃষ্টিনন্দন সব টেরারিয়ামও। স্টলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, টেরারিয়ামের পরিচর্যা বেশ সহজ। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা আলো পেলেই যথেষ্ট। আর মাসে দু-তিনবার হালকা করে পানি স্প্রে করলেই গাছ ভালো থাকে।

মেলা উপলক্ষে ১ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট, টেরারিয়াম ও অর্নামেন্টাল গাছ বিক্রি হচ্ছে এখানে।

বিজ্ঞাপন

বাঁশের ভুবনে এক অনন্য অভিজ্ঞতা

কোয়ান্টাম ব্যাম্বুরিয়ামের স্টলে পা রাখলেই বোঝা যায়, বাঁশের জগৎ কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে। স্টল বললে বরং কমই বলা হয়—চারদিকে সারি সারি বাঁশ, বিরল গাছপালা আর সবুজের আবহে জায়গাটি যেন ছোট্ট একটি অভয়ারণ্য।

বাংলাদেশে যেখানে স্বাভাবিকভাবে প্রায় ৩০ প্রজাতির বাঁশ পাওয়া যায়, সেখানে এই স্টলে রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রায় ৬০ প্রজাতির বাঁশের সংগ্রহ। পাশাপাশি আছে ১১০ প্রজাতির বনজ গাছ, যার অনেকগুলোই এখন দেশে বিরল।

এ ছাড়া ফুল, ফল, ঔষধি ও মসলাজাতীয় নানা গাছও রয়েছে। শুধু গাছ দেখেই নয়, কিছুক্ষণ বসেও উপভোগ করা যায় এই সবুজ পরিবেশ। দর্শনার্থীদের জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক বসার জায়গা।

আর ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হিসেবে রয়েছে বাঁশপাতার চা, যা চাইলে চেখেও দেখা যায়। পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে তৈরি নানা ব্যবহার্য ও শৌখিন সামগ্রীও পাওয়া যাচ্ছে এখানে।

বনকুটিরে গ্রামের ছোঁয়া

বৃক্ষমেলার ভেতরে একটু এগোতেই চোখে পড়ে ছোট্ট একটি বনকুটির। কাঠের তৈরি উঁচু কুটিরটির সামনে রয়েছে পদ্মপাতায় সাজানো সরু জলাধার। সেই পানিতে সাঁতার কাটছে রঙিন মাছ। পাশে বাঁশের তৈরি পানির ঝরনা, সবুজ ঘাসের লন, পাথরের হাঁটার পথ আর চারপাশজুড়ে গাছপালা—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন শহরের মাঝখানে গ্রামবাংলার এক টুকরা ছোঁয়া। সেখানে দাঁড়ালে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে যেতে ইচ্ছা হবে শহরের কংক্রিট, যানজট আর ধুলোময় পরিবেশ।

কেউ হাঁটছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ শুধু সবুজের শান্ত পরিবেশটুকু উপভোগ করছেন। এই বনকুটির গড়ে তুলেছেন গার্ডেনিং বাংলাদেশের উদ্যোক্তা রকিবুল আমিন। প্রকৃতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার স্বপ্ন থেকেই তাঁর এ উদ্যোগ।

তাঁর বিশ্বাস, ছাদ, বারান্দা, অফিস কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের কোণ—যেখানে সামান্য জায়গা আছে, সেখানেই সবুজের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। সে ভাবনাকেই দর্শনার্থীদের সামনে বাস্তব রূপ দিয়েছে এই বনকুটির, যা মেলায় আসা শিশু থেকে শুরু করে বড়দেরও সমানভাবে আকৃষ্ট করছে।

শুধু গাছ নয়, আছে প্রয়োজনীয় সব আয়োজন

গাছ কেনার পাশাপাশি মেলায় পাওয়া যাচ্ছে টব, জৈব সার, বাগানের বিভিন্ন সরঞ্জাম, পানি দেওয়ার ঝাঁঝরি, গ্লাভস, নিড়ানি, কাস্তে ও শাবল। ছাদবাগান কিংবা গাছের পরিচর্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে পরামর্শ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে। ফলে নতুন কিংবা অভিজ্ঞ—সব ধরনের বাগানপ্রেমীর জন্যই মেলাটি হয়ে উঠেছে এক ছাদের নিচে পূর্ণাঙ্গ আয়োজন।

সবুজের প্রতি বাড়ছে মানুষের টান

প্রতিদিনই পরিবার, বন্ধু কিংবা শিশুদের নিয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলায় ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। কেউ খুঁজছেন ফলের গাছ, কেউ শোভাবর্ধনকারী বা ইনডোর প্ল্যান্ট, আবার কেউ এসেছেন শুধু সবুজের সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে।

বিক্রেতাদের ভাষ্য, বয়স্কদের আগ্রহ দেশি ফলের গাছের দিকে বেশি হলেও তরুণদের আকর্ষণ বিদেশি প্রজাতির গাছ ও ইনডোর প্ল্যান্টের প্রতি।

গাছ কেনাবেচার আয়োজনের বাইরে মেলাটি যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককেও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। শহুরে ব্যস্ততার ফাঁকে একটুখানি সবুজ যে কতটা স্বস্তি এনে দিতে পারে, মেলার প্রতিটি কোণ ঘুরে দেখলেই তার আভাস মেলে। তাই গাছপ্রেমী হোন বা শুধু প্রকৃতির টানে আসুন, জাতীয় বৃক্ষমেলা হয়ে উঠতে পারে বর্ষার দিনে সবুজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর একটি সুন্দর ঠিকানা।

ছবি: হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ০২
বিজ্ঞাপন