
বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন। সেই স্বপ্ন ভেঙেছে নরওয়ের কাছে হেরে। কিন্তু ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) কার্লো আনচেলত্তিকে বিদায় বলেনি। বরং ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত দায়িত্ব দিয়ে জানিয়েছে, আনচেলত্তির প্রকৃত কাজ এখন শুরু। ট্রফি নয়, এবার তাঁকে গড়ে তুলতে হবে নতুন ব্রাজিল।

আধুনিক ফুটবলে বেশির ভাগ কোচই নিজেদের পছন্দের ফর্মেশন (যেমন ৪-৩-৩ বা ৩-৪-৩) খেলোয়াড়দের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেন। কিন্তু আনচেলত্তি এখানে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তাঁর দর্শনের মূল কথাই হলো—‘আমার কাছে কী কৌশল আছে তা বড় নয়, আমার হাতে কী ধরনের খেলোয়াড় আছে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
এই নমনীয়তার কারণেই তিনি ইতিহাসের একমাত্র কোচ হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগেই (ইতালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেন) চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছেন।
মাঠের বাইরে, অর্থাৎ ড্রেসিংরুমে তাঁর এই স্টাইলকে বলা হয় ‘কোয়ায়েট লিডারশিপ’ বা শান্ত নেতৃত্ব। যেখানে অন্য কোচরা ড্রেসিংরুমে নিজেদের একনায়কতন্ত্র চালাতে পছন্দ করেন, সেখানে আনচেলত্তি একজন অভিভাবক। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো একবার তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি একটি বড় ভালুকের মতো, ভীষণ শান্ত আর সংবেদনশীল।’ জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, যাঁর ঔদ্ধত্যের গল্প ফুটবল বিশ্বে সুপরিচিত, তিনিও আনচেলত্তির সামনে এসে শান্ত হয়ে যেতেন।

ট্যাকটিক্যাল কঠোরতা অনেক সময় খেলোয়াড়দের সহজাত প্রতিভাকে মেরে ফেলে। ডিফেন্স বা রক্ষণভাগের ক্ষেত্রে কঠোর শৃঙ্খলা পছন্দ করলেও, ফাইনাল থার্ডে খেলোয়াড়দের অনেকটাই স্বাধীনতা দেন তিনি। আনচেলত্তি খেলোয়াড়দের রোবট বানাতে চান না, তিনি চান তারা মাঠে স্বাধীন শিল্পীর মতো ফুটবলকে উপভোগ করুক।
তাঁর দল প্রয়োজনের সময় নিশ্ছিদ্র রক্ষণ দুর্গ গড়ে তোলে, আর প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণে উঠে এসে পেছনে জায়গা খালি করে ফেলে, ঠিক তখনই মেতে ওঠে তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর মারণাস্ত্র—দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে।
বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-এ বিদায় নিলেও, ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন দল পুনর্গঠনে তাঁর ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখছে। ২০৩০ বিশ্বকাপ সামনে রেখে আনচেলত্তি এবার ব্রাজিলের ফুটবলকে একেবারে নতুন করে ঢেলে সাজাতে যাচ্ছেন। সামনে মূলত যে ধরনের বড় বদলগুলো আসতে চলেছে:
নেইমার, কাসিমেরো ও ফাবিনহোর মতো অভিজ্ঞ তারকারা আন্তর্জাতিক ফুটবলের চেনা মঞ্চ থেকে এবার সরে দাঁড়াচ্ছেন। আনচেলত্তির প্রধান লক্ষ্য এখন ব্রাজিলের মাঝমাঠে হাই-লেভেল পারফর্ম করা নতুন ও তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করে মাঝমাঠকে একদম তরুণ ও গতিময় করে তোলা।
নেইমারের প্রস্থানের পর ব্রাজিলের আইকনিক ‘১০ নম্বর’ জার্সি সম্ভবত এবার উঠতে যাচ্ছে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গায়ে। দলের প্রধান চালিকা শক্তি হবেন তিনিই। এনদ্রিক, রদ্রিগো, এস্তেভাও ও রায়ানের মতো ওয়ান্ডারকিডদের আগামী দিনগুলোতে ব্রাজিলের আক্রমণভাগের মূল অস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
নেইমারের বিদায়ের পর আক্রমণভাগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাঁর চারপাশে এনদ্রিক, রদ্রিগো ও এস্তেভাওদের নিয়ে আগামী চার বছরের আক্রমণভাগ গড়ে তুলতে চান আনচেলত্তি।দানিলো, মার্কিনিওস বা আলেক্স সান্দ্রোর মতো প্রবীণ ডিফেন্ডারদের বিকল্প হিসেবে কাইকি ব্রুনো, ভিতোর রেইস এবং রিয়াল বেটিসের নাথানের মতো নতুনদের ব্যাকলাইনে নিয়মিত সুযোগ দেওয়া হবে।
গোলরক্ষক আলিসন বেকারের জায়গায় নতুন প্রজন্মের গোলরক্ষকদের তৈরি করার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে।
রক্ষণাত্মক কৌশল এবং বল পজেশন ধরে রাখতে না পারার ঘাটতি দূর করতে আনচেলত্তি নতুন ট্যাকটিক্যাল আইডিয়া নিয়ে কাজ করবেন। তবে ব্যাকরুম স্টাফেও বড় পরিবর্তন আসছে। তাঁর সহকারী কোচ ও ছেলে দাভিদে আনচেলত্তি ফ্রান্সের ক্লাব লিলের প্রধান কোচ হিসেবে যোগ দেওয়ায় এবং গোলকিপিং কোচ তাফারেলের সম্ভাব্য পদত্যাগের কারণে নতুন কোচিং প্যানেল দেখা যাবে ব্রাজিলের ডাগআউটে।

উত্তর ইতালির এক সাধারণ কৃষক পরিবারে ১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া কার্লো আনচেলত্তির জীবনের শুরুটা রূপকথার মতো ছিল না। তবে মাটির কাছাকাছি বড় হওয়া এই মানুষটিই পরে ফুটবল মাঠে বুনেছেন সাফল্যের সোনা। খেলোয়াড় হিসেবে এসি মিলানের হয়ে দুবার ইউরোপিয়ান কাপ জেতার পর, ডাগআউটেও তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি প্রচণ্ড রসিক, ভোজনরসিক এবং জীবনকে সহজভাবে উপভোগ করা একজন মানুষ। আত্মজীবনী ‘কোয়ায়েট লিডারশিপ’–এ তিনি লিখেছিলেন, ফুটবল তাঁর কাছে চাপের কিছু নয়; বরং এক পরম আনন্দের উৎসব। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলার শোক কিংবা ক্লাব ফুটবলের কঠিন চাপ—সবকিছুকেই তিনি সামলেছেন তাঁর সেই চিরচেনা শান্ত স্বভাব আর একদলা চুইংগাম চিবানোর চিরসবুজ ভঙ্গিতে। মাঠের তারকা ফুটবলারদের কাছে তিনি তাই কেবল একজন কোচ নন; বরং জীবনের এক বিশ্বস্ত অভিভাবক।
ফুটবল ডাগআউটে কার্লো আনচেলত্তি মানেই যেন ইতালিয়ান ‘স্প্রেজাতুরা’। এটা এমন এক ফ্যাশন স্টাইল, যা খুব বেশি কসরত না করেই দারুণ দেখায়। আধুনিক ফ্যাশন যখন প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, আনচেলত্তি তখনো তাঁর ক্ল্যাসিক ইতালিয়ান নেভি ব্লু কিংবা চারকোল সুট, নিখুঁত সাদা শার্ট আর মানানসই টাইয়ে অবিচল। এই চিরচেনা ফরমাল পোশাকের সঙ্গে চশমা আর সেই বিখ্যাত ভ্রু কুঁচকানোর ভঙ্গিটিই তাঁর সবচেয়ে বড় ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। ম্যাচের চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও তাঁর এই নিখুঁত ও মার্জিত রূপটি ডাগআউটে এক অদ্ভুত আভিজাত্য ছড়িয়ে দেয়। হালফ্যাশনের যুগে যেখানে নতুন প্রজন্মের কোচরা ট্র্যাক সুট বা স্নিকার্স বেছে নিচ্ছেন, সেখানে ৬৬ বছর বয়সী আনচেলত্তি তাঁর চিরসবুজ সুট-টাই আর চুইংগাম চিবানোর স্টাইলেই বুঝিয়ে দেন—আভিজাত্য কখনো পুরোনো হয় না।
আধুনিক ফুটবল যখন ডেটা, হাই-প্রেসিং আর নিখুঁত জ্যামিতিক পজিশনের গোলকধাঁধায় ক্রমেই আবদ্ধ হয়ে উঠছে, কার্লো আনচেলত্তি তখন ফুটবলকে তার মানবিক রূপে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল শেষ পর্যন্ত মানুষেরই খেলা, রোবটের নয়।

সময় বদলায়, ট্রাডিশন বদলায়, ফুটবলের ট্যাকটিকসও বদলায়; কিন্তু মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আনচেলত্তির ‘ক্ল্যাসিক’ দর্শন এখনো সমান প্রাসঙ্গিক। সেই কারণেই ব্রাজিলের এই কঠিন পুনর্গঠনের পর্বেও তিনি শুধু একজন সফল কোচ নন, ফুটবলের এক চিরসবুজ চরিত্র।
ছবি: রয়টার্স/ইন্সটাগ্রাম