
বলিউড সুপারস্টার আমির খান-এর বিখ্যাত সিনেমা ‘তারে জামিন পার’ দেখেছেন? সিনেমার সেই বিশেষ দৃশ্যের কথা মনে আছে নিশ্চই? যেখানে আমির খান, ঈষানের বড় ভাইকে বলছেন, ঈষানের দিকে ছুটে আসা একটা বল ঠিক কত দূর থেকে কত জোরে তার দিকে আসছে সেটা বুঝতে বুঝতেই সব শেষ!
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে গোলরক্ষকদের অবস্থাও এমন হচ্ছে কিনা তা নিয়ে চলছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। বিশেষ করে কাঁধের উচ্চতায় আসা বলগুলোতে গোলরক্ষকরা বারবার কেন পরাস্ত হচ্ছেন তা নিয়ে ঝড় উঠছে চায়ের কাপে।
সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষক জো হার্ট বলেছেন, ট্রিওন্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অননুমেয় গতিপথ। কোনো খেলোয়াড় যখন খুব জোরে শট নেন, বিশেষ করে স্পিন ছাড়াই, তখন বলটি বাতাসে এমনভাবে দিক পরিবর্তন করে যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে সেটি ঠিক কোথায় যাবে। বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে গোলরক্ষকরা বলের গতিপথ অনুমান করার যে দক্ষতা তৈরি করেন, ট্রিওন্ডা অনেক সময় সেই অভিজ্ঞতাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে, কাঁধ বরাবর ধেয়ে আসা শট। জো হার্টের মতে, এই উচ্চতায় আসা বল সামলানো এখন সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক সময় গোলরক্ষক বল স্পর্শ করতে পারলেও তার গতি এবং শেষ মুহূর্তের অদ্ভুত পরিবর্তনের কারণে সেটিকে জালে ঢোকা থেকে আটকাতে পারছেন না। এমন ঘটনা এক-দুবার নয়, পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই বারবার দেখা যাচ্ছে।
ট্রিওন্ডার নকশাও আগের বিশ্বকাপের বলগুলোর তুলনায় আলাদা। বলটি তৈরি হয়েছে মাত্র চারটি প্যানেল দিয়ে এবং এর সেলাই বাইরের পরিবর্তে ভেতরের দিকে রাখা হয়েছে। ফলে বলের বাইরের অংশ অনেক বেশি মসৃণ।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাসের দাবি, এই প্রযুক্তি বলকে আরও স্থিতিশীল করে। তবে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক এবং বিজ্ঞানীর মতে, এই মসৃণ গঠন ও অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তির কারণে উচ্চগতিতে বলের আচরণ আগের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে দূরপাল্লার শটে বলটি গোলরক্ষকের প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এবং ভিন্ন গতিপথে এগিয়ে আসে।
বিশ্বকাপের বল নিয়ে বিতর্ক মানেই ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ‘জাবুলানি’র কথা মনে পড়ে যায়। সেই বলও গোলরক্ষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।

অনেকের মতে, ট্রিওন্ডার আচরণও কিছুটা সেই জাবুলানির মতোই রহস্যময়। ডেনমার্কের সাবেক গোলরক্ষক ক্যাসপার শ্মাইকেল পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, এমন বল যেন গোলের সংখ্যা বাড়ানোর কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরাও মনে করছেন, ট্রিওন্ডার বাতাস কেটে এগিয়ে যাওয়ার ধরন প্রচলিত বলগুলোর থেকে কিছুটা আলাদা। ফলে দ্রুতগতির শটের ক্ষেত্রে বলের শেষ মুহূর্তের গতিপথ অনুমান করা গোলরক্ষকদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
আর ঠিক এই কারণেই এবারের বিশ্বকাপে দূরপাল্লার শট কিংবা কাঁধের উচ্চতায় আসা বলগুলোতে গোলরক্ষকদের বারবার অসহায় দেখাচ্ছে।

বিশ্বকাপে গোলের বন্যা দর্শকদের বিনোদন বাড়ালেও গোলরক্ষকদের জন্য এটি যেন এক কঠিন পরীক্ষার নাম। ম্যাচের ফল বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এখন শুধু ফুটবলারদের পায়েই নয়, অনেকটাই যেন নির্ভর করছে রহস্যময় আচরণ করা এই বলটির ওপরও।
বিশ্বকাপ যত এগোবে, ট্রিওন্ডা আরও কত গোল, কত নাটক আর কত বিতর্কের জন্ম দেয়–এখন সেটিই দেখার অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা।
ছবি: রয়টার্স, সামাজিক মাধ্যম ও উইকিপিডিয়া