
২৬ বছর বয়সে এসে জীবনের একেবারে নতুন পরিচয় পেয়েছেন এক ইউরোপীয় গাড়ি বিক্রেতা। ডিএনএ পরীক্ষায় বংশপরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে রাজা ফিলিপের ছোট ভাই প্রিন্স লরাঁর ছেলে হিসেবে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে রাতারাতি বদলে গেছে তাঁর পরিচয়। একজন সাধারণ গাড়ি বিক্রেতা থেকে হয়ে উঠেছেন রাজপরিবারের সদস্য।

নতুন এই রাজপুত্রের নাম ক্লেমঁ ভান্দেরকেরখোভে। তাঁর মা বেলজিয়ামের গায়িকা ওয়েন্ডি ভান ওয়ান্টেন। ১৯৯০-এর দশকে দেশটির প্রিন্স লরাঁর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। তবে ক্লেমঁ ১৬ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগে তাঁর মা তাঁকে জানাননি, লরাঁই তাঁর বাবা।

সম্প্রতি জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে স্থানীয় একটি টাউন হলে ঘরোয়া এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ক্লেমঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রিন্স লরাঁর ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ডিএনএ পরীক্ষায় রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক নিশ্চিত হওয়ার পরই আসে এই আইনি স্বীকৃতি। বুধবার দ্য টেলিগ্রাফ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিন্স লরাঁ বেলজিয়ামের সিভিল রেজিস্ট্রিতে ক্লেমঁর পিতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন করেছেন।
রাজপরিবারের সম্পত্তিতে সমান অধিকার
আইনগতভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে প্রিন্স লরাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে তাঁর অন্য সন্তানদের মতোই সমান উত্তরাধিকার অধিকার পেয়েছেন ক্লেমঁ। লরাঁ ও তাঁর স্ত্রী প্রিন্সেস ক্লেয়ারের তিন সন্তান। তাঁরা হলেন ২০ বছর বয়সী প্রিন্সেস লুইজ, ২০ বছর বয়সী প্রিন্স নিকোলা এবং ১৯ বছর বয়সী প্রিন্স আয়মেরিক।

তবে রাজপরিবারের সদস্য হলেও ক্লেমঁ রাজকীয় ভাতা পাবেন না। তাঁকে কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক দায়িত্বও পালন করতে হবে না। এমনকি বেলজিয়ামের সিংহাসনেরও কোনো অধিকার থাকবে না তাঁর।
বাবার পদবি নেবেন?
বাবার পরিবারের পদবি সাক্সে-কোবুর্গ গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে ক্লেমঁর। তবে আপাতত নিজের বর্তমান পদবিই রাখতে চান তিনি। ফ্লেমিশ দৈনিক হেত নিইউসব্লাদ–কে সম্প্রতি ক্লেমঁ বলেন, ‘আমি ভান্দেরকেরখোভে পদবি নিয়ে গর্বিত। এই পারিবারিক নাম ত্যাগ করলে মায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।’


কীভাবে রাজার ছেলে হলেন ক্লেমঁ
ক্লেমঁর জন্ম ২০০০ সালের আগস্টে। তাঁর মা ওয়েন্ডি ভান ওয়ান্টেনের আসল নাম আইরিস ভান্দেরকেরখোভে। ১৯৯০-এর দশকে প্যারিসের একটি ফ্যাশন শোতে আকস্মিক পরিচয়ের পর ওয়েন্ডি ও প্রিন্স লরাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে সেই সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সে সময় গুঞ্জন ছিল, লরাঁর বাবা ও তৎকালীন রাজা তাঁদের সম্পর্ক মেনে নেননি।
১৬ বছর বয়সে জানলেন বাবার পরিচয়
গত বছরের সেপ্টেম্বরে বেলজিয়ামের টেলিভিশন চ্যানেল ভিটিএমে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে ক্লেমঁ জানান, তাঁর মা একসময় তাঁকে বলেছিলেন, প্রিন্স লরাঁই তাঁর বাবা।
এর চার বছর পর, অর্থাৎ ২০ বছর বয়সে, মায়ের কাছ থেকে শোনা কথার ভিত্তিতে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ক্লেমঁ। প্রিন্স লরাঁও তখন ডিএনএ পরীক্ষা করাতে রাজি হন।

ভিটিএমকে ক্লেমঁ বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। আমার মনে আছে, তিনি বলেছিলেন, “আমি আগে পরীক্ষা করাব, যাতে তুমি স্বস্তি বোধ করো।”’
ডিএনএ পরীক্ষায় পিতৃত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর বাবা-ছেলের সম্পর্কও ধীরে ধীরে এগিয়েছে বলে জানান ক্লেমঁ। তাঁর ভাষায়, এরপর তাঁরা ‘খোলামেলাভাবে কথা বলা’ শুরু করেন।
রাজপরিবারে এমন ঘটনা নতুন নয়
বেলজিয়ামের রাজপরিবারকে ঘিরে গোপন পিতৃত্বের ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়।
প্রিন্স লরাঁর বাবা, বর্তমানে ৯২ বছর বয়সী সাবেক রাজা, দীর্ঘদিন ধরে একটি পিতৃত্বের আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে তিনি স্বীকার করেন, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সময় তাঁর একটি কন্যাসন্তান জন্মেছিল। সেই কন্যা দেলফিন বোয়েল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ৫৮ বছর বয়সী দেলফিন তাঁর পিতৃত্বের স্বীকৃতি পান এবং রাজকুমারীর মর্যাদাও লাভ করেন।বর্তমানে তিনি দেলফিন দ্য সাক্সে-কোবুর্গ নাম ব্যবহার করেন।

ক্লেমঁর গল্প অবশ্য দেলফিনের গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবে দুটি ঘটনাই বলে, রাজপরিবারের চাকচিক্যের আড়ালেও কখনো কখনো এমন পারিবারিক গল্প থাকে, যার পরিণতি সামনে আসতে সময় লাগে। ক্লেমঁর ক্ষেত্রে সেই গল্পের শেষ অধ্যায় আপাতত একটি নতুন পরিচয়ে। আর সেটি হচ্ছে, তিনি এখন বেলজিয়ামের একজন নতুন রাজপুত্র।
সূত্র: সিএনএন
ছবি: ইন্সটাগ্রাম