আন্তর্জাতিক ট্রাফিক লাইট দিবস: লাল, হলুদ, সবুজ কীভাবে বদলে দিল পৃথিবীর পথচলা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার পথে, স্কুল বাসের অপেক্ষায় কিংবা দীর্ঘ যানজটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই কখনো না কখনো ট্রাফিক লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকি। লাল বাতি জ্বললেই বিরক্ত হই, সবুজ বাতিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস। আর যদি টানা কয়েকটি সবুজ সংকেত পেয়ে যান, মনে হয় দিনটা যেন বেশ ভালোই শুরু হলো।

আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে ট্রাফিক লাইট এতটাই স্বাভাবিক একটি বিষয় যে এর গুরুত্ব নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। অথচ মাত্র এক শতাব্দী আগে পৃথিবীতে এমন কোনো বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যালই ছিল না। ব্যস্ত মোড়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতেন পুলিশ বা সংকেতদাতা। দুর্ঘটনা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছিল মাত্র তিনটি রঙ লাল, হলুদ আর সবুজ।

পৃথিবীর প্রথম ট্রাফিক লাইট কোথায় বসানো হয়েছিল?

অনেকেই মনে করেন, প্রথম ট্রাফিক লাইটের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, পৃথিবীর প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়েছিল ১৮৬৮ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদের সামনে, পার্লামেন্ট স্কোয়ারে। এটি অবশ্য আজকের মতো বৈদ্যুতিক ট্রাফিক লাইট ছিল না। রেলওয়ে প্রকৌশলী জন পিক নাইট রেলপথের সংকেতব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই নকশা করেছিলেন। দিনের বেলায় দুটি যান্ত্রিক বাহু ওপরে-নিচে তুলে সংকেত দেওয়া হতো। আর রাতের বেলায় ব্যবহার করা হতো গ্যাসচালিত লাল ও সবুজ আলো। কিন্তু প্রযুক্তিটি খুব বেশি দিন টেকেনি। মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর গ্যাস ল্যাম্প বিস্ফোরিত হয়ে দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য আহত হন। নিরাপত্তাজনিত কারণে ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয় এবং দীর্ঘ কয়েক দশক আর নতুন কোনো ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়নি।

আধুনিক বৈদ্যুতিক ট্রাফিক লাইটের সূচনা

মোটরগাড়ির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করলে আবারও নিরাপদ যানবাহন নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দেয়। অবশেষে ১৯১৪ সালের ৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড শহরে বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাফিক লাইট চালু করা হয়। এই দিনটিকেই স্মরণ করে বর্তমানে আন্তর্জাতিক ট্রাফিক লাইট দিবস পালন করা হয়। সেই সিগন্যালে ছিল মাত্র দুটি রঙ লাল ও সবুজ। পাশাপাশি শব্দের মাধ্যমেও চালকদের সতর্ক করা হতো। এই ব্যবস্থার নকশা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মার্কিন পুলিশ কর্মকর্তা লেস্টার ওয়্যার। মাত্র এক দশকের মধ্যেই ইউরোপেও বৈদ্যুতিক ট্রাফিক লাইটের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯২৪ সালে জার্মানির বার্লিনে বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

হলুদ বাতি এল কীভাবে?

শুরুর ট্রাফিক লাইটে ছিল শুধু লাল ও সবুজ। কিন্তু চালকদের সতর্ক করার জন্য মাঝখানে একটি সংকেতের প্রয়োজন ছিল। ১৯২৩ সালে তিন রঙের ট্রাফিক সিগন্যাল চালু হয়। যোগ হয় হলুদ বা অ্যাম্বার আলো, যা চালকদের প্রস্তুত হওয়ার বার্তা দেয়। এরপর থেকেই লাল মানে থামুন, হলুদ মানে সতর্ক হোন এবং সবুজ মানে চলুন এই ভাষা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই একই অর্থ বহন করে। ভাষা ভিন্ন হতে পারে, সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এই তিনটি রঙের ভাষা সবার কাছেই এক।

একটি ট্রাফিক লাইট কত জীবন বাঁচায়?

প্রতিদিন লাখো মানুষ কর্মস্থলে যান, শিশুরা স্কুলে যায়, অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলে হাসপাতালের পথে। এই পুরো ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখতে নীরবে কাজ করে চলেছে ট্রাফিক সিগন্যাল।ট্রাফিক লাইট শুধু গাড়ি থামায় না।এটি পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার হতে সাহায্য করে।

জরুরি সেবার যানবাহনের চলাচল সহজ করে।

যানজট কমাতে ভূমিকা রাখে।

সবচেয়ে বড় কথা, অসংখ্য দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করে।

লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে থাকতে আমাদের বিরক্ত লাগে। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষাই কারও জীবন বাঁচাতে পারে।

আমরা প্রায়ই প্রযুক্তির বড় বড় আবিষ্কার নিয়ে কথা বলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশযান কিংবা স্মার্টফোন। কিন্তু এমন কিছু আবিষ্কারও আছে, যেগুলো প্রতিদিন আমাদের জীবনকে নিরাপদ করে তুললেও খুব কমই আলোচনায় আসে।

ট্রাফিক লাইট ঠিক তেমনই একটি উদ্ভাবন যা আমাদের জীবনকে করেছে সহজ। লাল, হলুদ আর সবুজ মাত্র তিনটি রঙ। কিন্তু এই তিনটি রঙই প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের পথচলাকে আরও নিরাপদ, আরও সুশৃঙ্খল আর আরও মানবিক করে তুলছে। হয়তো তাই পরেরবার লাল বাতিতে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হওয়ার আগে একবার মনে করা যেতে পারে এই ছোট্ট অপেক্ষাই হয়তো কারও নিরাপদে বাড়ি ফেরার কারণ।

ছবি: পেকজেলসডটকম

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন