‘দ্য ওডিসি’ দেখে আবার বইয়ের দোকানে ভিড়, জেন–জিদের হাতে ফিরছে গ্রিক পুরাণ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সিনেমা দেখে দর্শক শুধু হল থেকে বের হচ্ছেন না, ছুটছেন বইয়ের দোকানেও। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া গ্রিক মহাকাব্য ‘ওডিসি’ আবারও হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

যুক্তরাজ্যে নোলানের ছবি মুক্তির পর থেকেই হোমারের অমর মহাকাব্য এবং গ্রিক-রোমান পুরাণভিত্তিক বইয়ের বিক্রি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো গল্প যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছে আধুনিক পাঠক।

সিনেমা শেষ, শুরু বইয়ের খোঁজ

ছবিটি মুক্তির পর মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাজ্যে ‘দ্য ওডিসি’র মুদ্রিত সংস্করণের বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১,৪০০ শতাংশ বেড়েছে।

বিশেষ করে ব্রিটিশ-আমেরিকান গবেষক এমিলি উইলসনের ২০১৭ সালের আধুনিক অনুবাদটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দেশটির অন্যতম বড় বইয়ের দোকান চেইন ওয়াটারস্টোনস জানিয়েছে, এই সংস্করণের বিক্রি এক হাজার শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং প্রতি সপ্তাহেই চাহিদা বাড়ছে।

শুধু ‘ওডিসি’ নয়, ফিরছে পুরো পুরাণের জগৎ

নোলানের ছবির প্রভাব শুধু একটি বইতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হোমারের ‘ইলিয়াড’, ম্যাডেলিন মিলারের ‘সার্সি’, মার্গারেট অ্যাটউডের ‘দ্য পেনেলোপিয়াড’ এসব বইয়ের বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অডিওবুকের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জনপ্রিয় অডিও প্ল্যাটফর্ম স্পোটিফাই জানিয়েছে, ‘ওডিসি’র বিভিন্ন অনুবাদ খোঁজার হার বহুগুণ বেড়েছে।

দুই হাজার বছরের গল্প কেন আজও টানে?

গ্রিক পুরাণের গল্পগুলোতে আছে যুদ্ধ, প্রেম, প্রতিশোধ, বিশ্বাস, বুদ্ধিমত্তা, সাহস আর মানবিক দুর্বলতার চিরন্তন মিশেল। তাই সময় বদলালেও এসব গল্পের আবেদন ফুরায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নোলানের সিনেমা নতুন প্রজন্মকে শুধু একটি চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা দেয়নি; বরং এমন একটি সাহিত্যজগতের দরজা খুলে দিয়েছে, যেখানে হাজার বছর আগের গল্পও আজকের মানুষের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মনে করছেন, এই আগ্রহ ভবিষ্যতে গ্রিক ভাষা, লাতিন সাহিত্য এবং ধ্রুপদি সভ্যতা নিয়ে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নোলানের নতুন সাফল্য

২০২৩ সালে ‘ওপেনহাইমার’-এর অসাধারণ সাফল্যের পর ‘দ্য ওডিসি’ নোলানের আরেকটি বড় অর্জন।

ছবিতে কিংবদন্তি বীর ওডিসিউসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। তার স্ত্রী পেনেলোপের চরিত্রে রয়েছেন অ্যানা হ্যাথাওয়ে এবং তাদের ছেলে টেলিম্যাকাসের ভূমিকায় দেখা গেছে টম হল্যান্ডকে।

ছবিটি মুক্তির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসে টানা দুই সপ্তাহ শীর্ষস্থান ধরে রাখে এবং বিশ্বজুড়ে আয় করে শত শত মিলিয়ন ডলার।

প্রশংসার পাশাপাশি আছে সমালোচনাও

দর্শকের ভালোবাসা পেলেও ছবিটি সমালোচনার বাইরে থাকেনি। হোমারের ‘ওডিসি’–র বহুল প্রশংসিত আধুনিক অনুবাদক এমিলি উইলসন মনে করেন, নোলানের চিত্রনাট্যে মূল মহাকাব্যের মানসিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক গভীরতার অনেকটাই অনুপস্থিত।
একই ধরনের মত দিয়েছেন ইতিহাসবিদ মেরি বিয়ার্ডও। তার মতে, মূল কাহিনির সূক্ষ্ম আবেগ, রসিকতা এবং দার্শনিক প্রশ্নগুলো সিনেমায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

তবে দুজনেই স্বীকার করেছেন, নোলানের এই চলচ্চিত্র নতুন করে লাখো মানুষকে হোমারের জগতে ফিরিয়ে এনেছে, এটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।

সিনেমা যখন সাহিত্যের দূত

সিনেমা অনেক সময় শুধু বিনোদন দেয়। আবার কখনো একটি প্রজন্মকে নতুন বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ‘দ্য ওডিসি’ সেই বিরল উদাহরণগুলোর একটি, যেখানে একটি চলচ্চিত্র দুই হাজার বছরের পুরোনো সাহিত্যকে আবারও সমসাময়িক আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে মনোযোগের সময় ক্রমেই কমছে, সেখানে একটি সিনেমার অনুপ্রেরণায় মানুষ বই হাতে নিচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে সংস্কৃতি ও সাহিত্যের জন্য আশাব্যঞ্জক খবর।

ট্রেন্ড বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, দর্শকের রুচিও বদলায়। কিন্তু কিছু গল্প কখনো পুরোনো হয় না। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ প্রমাণ করেছে, হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যও নতুন প্রজন্মকে সমানভাবে মুগ্ধ করতে পারে; যদি সেটি নতুন ভাষায়, নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা যায়। আর সেই কারণেই গ্রিক পুরাণের এই চিরন্তন গল্পগুলো আবারও ফিরে আসছে পাঠকের বুকশেলফে, বইয়ের পাতায় এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

সূত্র: এএফপি

ছবি: ইনস্টাগ্রাম

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২: ০০
বিজ্ঞাপন