
টাকা আর সুখের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক অনেক পুরোনো। কেউ বলেন, টাকা দিয়ে সুখ কেনা যায় না। আবার কেউ বলেন ভিন্ন কথা। মাসের শেষে ভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে চিন্তা থাকলে, সুখের কথা ভাবাই তখন কঠিন হয়ে যায়।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে, বিষয়টি এত সরল নয়। টাকা দিয়ে হয়তো ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব কেনা যায় না। জীবনের অর্থও কেনা যায় না। কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা প্রতিদিনের জীবনকে অনেকটাই স্বস্তির করে তুলতে পারে। আর সেই স্বস্তির সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে সুখের অনুভূতি।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ কিলিংসওয়ার্থ একটি বহুল আলোচিত গবেষণা করেছেন। এতে অংশ নিয়েছিলেন ৩৩ হাজার ৩৯১ জন কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্ক। তাঁদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় প্রায় ১৭ লাখ ২৬ হাজার মুহূর্তভিত্তিক অনুভূতির তথ্য। গবেষণাটি দেখায়, আয় বাড়ার সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন ভালো থাকার অনুভূতিও বাড়ছিল। জীবন নিয়ে সন্তুষ্টিও বাড়ছিল সমান তালে। আগে অনেকে ভাবতেন, নির্দিষ্ট একটি আয়ের পর সুখ থেমে যায়। কিন্তু এই গবেষণায় তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে সুখের গল্পটা শুধু সংখ্যার গল্প নয়।

ভাবুন তো, মাসের শেষ সপ্তাহে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা আছে। সন্তানের হঠাৎ চিকিৎসা লাগলে চিন্তা করতে হচ্ছে না। বাসার ভাড়া নিয়ে প্রতিদিন হিসাব কষতে হচ্ছে না। বহুদিনের পরিকল্পনা করা একটা ছোট ভ্রমণেও যাওয়া যাচ্ছে। এসব বিষয় সরাসরি সুখ কিনে দেয় না। কিন্তু দুশ্চিন্তা কমিয়ে দেয়। আর সুখের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো দুঃখ নয়। সেটা হতে পারে অনিশ্চয়তা।
আর্থিক নিরাপত্তা মানুষকে নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়। কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, সন্তানকে কোথায় পড়াবেন। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বেড়ে যায়। তাই টাকা অনেক সময় আনন্দের চেয়ে বেশি কিনে দেয় নিরাপত্তা। কিনে দেয় বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগও।

এই গবেষণা নিয়ে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যম বার্ষিক পারিবারিক আয় ছিল ৮৫ হাজার ডলার। কিন্তু এটাকে কোনো সীমারেখা ভাবার সুযোগ নেই। এমন নয় যে, এর নিচে আয় করলেই মানুষ অসুখী। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের আয়ের পরিসর ছিল অনেক বিস্তৃত। আয় আর ভালো থাকার সম্পর্কটাও বদলেছে ধাপে ধাপে।
সুখের জন্য ঠিক কত টাকা লাগে, তারও কোনো একক উত্তর নেই।
ঢাকায় থাকা একটি পরিবারের প্রয়োজন আর নিউইয়র্কে থাকা পরিবারের প্রয়োজন এক নয়। একজনের জন্য যে আয় স্বস্তির, অন্যজনের জন্য সেটা হয়তো নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই যথেষ্ট নয়। তাই আয়ের সঙ্গে সুখের সম্পর্ক বুঝতে শুধু টাকার অঙ্ক দেখলেই চলে না। জীবনযাত্রার খরচ, পারিবারিক দায়িত্ব, ঋণ, স্বাস্থ্য, কর্মপরিবেশ, সামাজিক সম্পর্ক, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই বিষয়টা একটু জটিল হয়ে যায়। ২০২৩ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা যৌথভাবে একটি গবেষণা করেন। তাতে দেখা যায়, গড়ে আয় বাড়ার সঙ্গে সুখও বাড়তে পারে। তবে যাঁরা তুলনামূলক বেশি অসুখী, তাঁদের ক্ষেত্রে একটা পর্যায়ের পর আয়ের প্রভাব কমে যেতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে তা স্থিরও হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ টাকা আর সুখের সম্পর্ক সবার জন্য এক রকম নয়।
আরও একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। বেশি আয় সব সমস্যার সমাধান নয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অনেক টাকা থাকতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে গেলে, কাজের পরিবেশ অসহনীয় হলে, কিংবা একাকিত্ব ঘিরে ধরলে, সেই অর্থের ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়।
২০২৬ সালে প্রকাশিত পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি বিশ্লেষণেও একটা কথা উঠে এসেছে। বেশি আয়ের মানুষ সাধারণভাবে বেশি সুখী হন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে থাকার সময় সেই পার্থক্য সবসময় একইভাবে দেখা যায় না। তাই ভালো বেতন থাকলেই যে প্রতিদিন সকালে অফিসে যেতে ভালো লাগবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এই কথাটাই হয়তো সবচেয়ে বাস্তব। টাকা সত্যিকারের বন্ধু এনে দিতে পারে না। হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কও ফিরিয়ে দিতে পারে না। ভালোবাসা তৈরি করতে পারে না। প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো সময়ও কিনে দিতে পারে না। কিন্তু টাকা অনেক বাস্তব দুশ্চিন্তা কমাতে পারে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারে। নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। সন্তানকে শিক্ষার সুযোগ দিতে পারে। জরুরি মুহূর্তে বিকল্প তৈরি করতে পারে। এমনকি অপছন্দের চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু শুরু করার সাহসও দিতে পারে।
তাই "টাকা সুখ কিনতে পারে না" কথাটা যতটা সত্য, "টাকার কোনো ভূমিকা নেই" কথাটাও ততটাই অসম্পূর্ণ।

একজন মানুষের ভালো থাকার জন্য শুধু আয় যথেষ্ট নয়। দরকার প্রিয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক। দরকার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। দরকার নিজের জন্য কিছুটা সময়। দরকার নিরাপদ পরিবেশ, কাজের সন্তুষ্টি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা। একই আয়ের দুজন মানুষের সুখও ভিন্ন হতে পারে। একজন হয়তো পছন্দের কাজ করেন। পরিবার আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন। অন্যজন হয়তো বেশি আয় করেন। কিন্তু প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন। নিজের জীবন উপভোগ করার সময়ই তাঁর হাতে থাকে না।

সুখের হিসাব তাই শুধু মাসিক বেতনের অঙ্কে মেলে না। তবু আর্থিক স্বচ্ছলতাকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। কারণ পকেটে টাকা না থাকলে জীবনের ছোট ছোট আনন্দও অনেক সময় দুশ্চিন্তার নিচে চাপা পড়ে যায়।
হয়তো সুখের সবচেয়ে সঠিক সংজ্ঞা এমন একটা জীবন, যেখানে প্রয়োজন মেটানোর পরও মানুষ নিজের পছন্দ, প্রিয়জন আর নিজের জন্য কিছু জায়গা রাখতে পারেন। টাকা সেই জায়গাটা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেই জায়গাকে সত্যিকারের সুখে ভরে তোলার কাজটা শেষ পর্যন্ত মানুষকেই করতে হয়।
তথ্যসূত্র: পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি জার্নাল
ছবি: পেকজেলসডটকম