
বাংলাদেশিদের কাছে সৌদি এক গভীর ও অনন্য অর্থ বহন করে। প্রত্যেকেই জীবনে অন্তত একবার হলেও এই পবিত্র ভূমিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন—নবী করিম (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করতে। ভ্রমণকারীদের কাছে সৌদি মানেই আধ্যাত্মিকতার দেশ। লক্ষ্য থাকে দুটি নগরী—পবিত্র মক্কা ও মদিনা, উমরাহ ও হজের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে হজ কিংবা উমরাহ করতে গেলে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী প্রায় সবাই প্রিয়জনদের জন্য উপহার নিয়ে আসেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হজযাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে, তার চেয়েও দ্রুত বেড়েছে উমরাহকীরর সংখ্যা। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এখন বেশি করে সৌদি যাচ্ছে। তারা আধুনিক, স্মার্ট ও সমসাময়িক ভাবনায় বিশ্বাসী। তাই বোঝাই যায়, এই নতুন প্রজন্মের কারণেই আধ্যাত্মিক ভ্রমণে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা—কেনাকাটা। ঐতিহ্যবাহী সুক থেকে শুরু করে ঝলমলে বুটিক—সৌদি এখন হাজি ও পর্যটকদের দিচ্ছে শপিংয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সৌদির সুক বা ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলো বাণিজ্য ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। প্রতিটি সুকের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য—কোথাও পাওয়া যায় সোনার গয়না, কোথাওবা মসলা, আবার কোথাও মেলে সুগন্ধি বা হস্তনির্মিত সামগ্রী। এসব সুকে প্রবেশ করলেই ভেসে আসে উদ ও বাখুরের মিষ্টি ঘ্রাণ, চোখে পড়ে রঙিন কার্পেট, হাতে বানানো তসবিহ, কিংবা আকর্ষণীয় অলংকার।

রিয়াদের সুক আল জাল কিংবা মদিনার পুরোনো বাজার এখনো বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য দারুণ আকর্ষণীয়। এখান থেকে খেজুর, কনটেইনার ভর্তি জমজমের পানি বা হাতে বানানো ধর্মীয় সামগ্রী কিনে থাকেন। এটা কেবল শপিং নয়, বরং আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঐতিহ্যের পাশাপাশি সৌদি আরবের কেনাকাটার দুনিয়ায় যুক্ত হয়েছে বিশ্বমানের শপিং মল ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। জেদ্দার রেড সি মল বা রিয়াদের কিংডম সেন্টার—এসব জায়গা এখন বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য আধুনিক শপিংয়ের স্বর্গরাজ্য।
সৌদি ফ্যাশন ব্র্যান্ড যেমন ফেমিনাইন, লোমার, কিংবা নিসওয়া ফ্যাশন—মার্জিত অথচ স্টাইলিশ পোশাক তৈরি করছে, যা বাংলাদেশি নারীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।

অন্যদিকে সুগন্ধির জগতে অ্যারাবিয়ান উদ আর আবদুল সামাদ আল কুরাশি হাজি ও উমরাহযাত্রীদের প্রিয় তালিকায় বহু আগেই জায়গা করে নিয়েছে। উদ, মাস্ক বা গোলাপের সৌরভ ছড়ানো এসব আতর ও পারফিউম উপহার হিসেবে সব সময়ই স্মরণীয়। কারণ, কালজয়ী এসব উপহারের সঙ্গে থাকে ব্যক্তিগত ভালোবাসার পরশ।
বাংলাদেশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে সৌদিতে কেনাকাটা মানে কেবল ভোগ নয়, বরং ভালোবাসা আর স্মৃতির ভাগাভাগি। তাই উপহার হিসেবে জায়নামাজ, কোরআন শরিফের আয়াত খোদাই করা সোনার অলংকার কিংবা সাধারণ আতরের বোতল হয়ে ওঠে বিশেষ স্মারক।
আবার আবায়া, ওড়না বা থোবের মতো পোশাকও পরিবার-পরিজনের জন্য কাঙ্ক্ষিত পোশাক হিসেবে কেনা হয়ে থাকে। এগুলো কেবল পোশাক নয়; বরং সৌদি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আবহের ধারক। অনেক হাজির কাছে প্রিয়জনদের জন্য এসব উপহার তাঁদের আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার রেশ ধরে রাখে।
ওমরাহ সম্পন্ন করার পর তাঁরা সময় দিচ্ছেন রিয়াদের আধুনিক শপিং ডিস্ট্রিক্টগুলো ঘুরে দেখতে, জেদ্দার সাগরতীরে বিশ্রাম নিতে কিংবা মক্কার কাছাকাছি বুটিক থেকে উপহার সংগ্রহ করতে। কেউ কেউ আবার নতুন নতুন গন্তব্য ঘুরে সৌদিকে নতুন চোখে আবিষ্কার করছেন। স্বাভাবিকভাবে এই কেনাকাটা আর ভ্রমণের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা যোগ হচ্ছে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে। ফলে এই অভিযাত্রা হয়ে উঠছে আরও পূর্ণ এবং সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের কাছে সৌদি আরবের শপিং অভিজ্ঞতা বহুমাত্রিক। কখনো ঐতিহ্যবাহী সুক ভ্রমণ, কখনো আধুনিক সৌদি ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচয়, আবার কখনো প্রিয়জনদের জন্য অর্থবহ উপহার সংগ্রহ। আর উমরাহপ্লাসের নতুন ধারা এ অভিযাত্রাকে করছে আরও বৈচিত্র্যময় ও ঋদ্ধ।
বস্তুত, সৌদিতে কেনাকাটা নিছক ভোগবাদ নয়; বরং এটি আধ্যাত্মিক ভ্রমণেরই সম্প্রসারণ। যেখানে তসবিহর দানা কিংবা আতরের বোতলে ভরে থাকে পবিত্র ভূমির স্মৃতি আর ঐতিহ্য। এর সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে ভ্রমণ হয়ে ওঠে আরও অর্থবহ ও স্মরণীয়।
বাংলাদেশি নাগরিকদের এই ভ্রমণকে ঝামেলামুক্ত করতে ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করেছে সৌদি। ওমরাহপ্লাসের আওতায় দ্রুত মিলছে ভিসার অনুমোদন। সৌদিতে বন্ধু কিংবা পরিবার–পরিজনের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা যাঁরা করছেন, তাঁদের জন্য ভিসা সহায়তা দিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আছে তিনটি তাশির সেন্টার। এই সুবিধা সফরে আগ্রহীদের দিচ্ছে সৌদি অন্বেষণের সুযোগ; তা সে ধর্মীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার আগে হোক বা পরে। এতে এই ভ্রমণ হয়ে ওঠে আত্মিক ও স্মরণীয়। ভ্রমণকারীদের যাত্রাকে সহজ ও স্বচ্ছন্দ করতে বাংলাদেশ এবং সৌদির মধ্যে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে সপ্তাহে ৫০টির বেশি ফ্লাইট।
লেখক: পরামর্শক হাল ফ্যাশন, ফিচার রাইটার, লাইফস্টাইল জার্নালিস্ট