
২০১৮ সাল থেকে আয়োজিত মালয়েশিয়া ইউটিএমবি পৃথিবীর অন্যতম কঠিন ট্রেইল রেস হিসেবে পরিচিত। এবারের আসরে ৬৪টি দেশের প্রায় ২,৯০০ জন প্রতিযোগী অংশ নেন। এর মধ্যে ১০০ কিলোমিটার ক্যাটাগরিতে অংশ নেয় ২৫৭ জন। আর সেই কঠিন যাত্রা সম্পন্ন করেছেন মাত্র ১৯৮ জন। ডা. প্রতীক তাঁদেরই একজন।

ম্যারাথনটি অনুষ্ঠিত হয় তাইপিং শহরে, যা মালয়েশিয়ার পেরাক প্রদেশে অবস্থিত। পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর হ্রদবেষ্টিত এই জায়গাটিকে বলা হয় ‘রেইন টাউন অব মালয়েশিয়া’। কারণ এখানে প্রায়ই বৃষ্টি হয়। ফলে ট্রেইল ছিল ভেজা, কাদামাখা এবং ভয়ংকর চ্যালেঞ্জিং।

ডা. সাহা প্রতীক প্রসাদ পেশায় একজন চিকিৎসক। ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন আত্মিক শান্তি। প্রকৃতির মাঝে, নিজের সীমা জয় করার মধ্যমে। ম্যারাথনের প্রতি তাঁর আগ্রহ শুরু ২০১৯ সালে, যখন তিনি ‘রোপ ফোর’ নামের একটি পর্বতারোহণ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর ভারতে মাউন্টেনিয়ারিং কোর্স করেন। ধীরে ধীরে দৌড় তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। ১০ কিলোমিটার দিয়ে শুরু, এরপর ২১, ৪২, ৫০। আর এবার ১০০ কিলোমিটারের আল্ট্রাম্যারাথন!

ম্যারাথনটি শুরু হয় রাত ৩টায়। সঙ্গে ছিল বাধ্যতামূলক কিছু সরঞ্জাম। যেমন ব্যাকপ্যাক, রেইনকোট, মেডিকেল কিট, পানির বোতল, ইমার্জেন্সি ব্ল্যাঙ্কেট ইত্যাদি। পুরো ট্রেইলে ছিল ৪,৫০০ থেকে ৬,০০০ মিটার উঁচু-নিচু ওঠানামা। “শেষের বড় ক্লাইম্বটা ছিল ভয়াবহ কঠিন,” বললেন প্রতীক। “একপর্যায়ে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে মনে হয়েছিল এখনই থেমে যাই। কিন্তু অন্য রানারদের উৎসাহ আমাকে নতুন শক্তি দিয়েছিল।”

রাস্তায় হঠাৎ বুনো পোকা-মাকড়, এমনকি একটি বিশাল সাপও দেখতে পান তিনি। প্রতি ৫-৬ কিলোমিটার পরপর হাইড্রেশন পয়েন্ট ছিল। যেখানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য পানি, কোক, চকলেট, স্যুপ, নুডলস, এমনকি স্থানীয় খাবারও পরিবেশন করা হয়। প্রতিটি চেকপয়েন্ট যেন ছোট্ট এক বুফে।

ডা. প্রতীক বলেন, “স্বেচ্ছাসেবকেরা শুধু পানি বা খাবার দেননি, নিজেরা এসে উৎসাহ দিয়েছে, সরঞ্জাম হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। তাঁদের আন্তরিকতা সত্যিই মন ছুঁয়ে গেছে।” এমনকি স্থানীয় অধিবাসীরাও রানারদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন প্রতিটি ধাপে।

৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে যখন তিনি ফিনিশ লাইন স্পর্শ করেন, তখন ক্লান্তি ও আনন্দ মিলেমিশে একাকার। ফিনিশ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর স্ত্রী, ডা. অনিন্দিতা বণিক। ডা. প্রতীক বলেন, “শরীর তখন ভীষণ ক্লান্ত, কিন্তু মনে হয়েছিল আমি অসম্ভব কিছু জয় করেছি।”
ডা. সাহা প্রতীক প্রসাদের এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং বাংলাদেশের নামও নতুনভাবে যুক্ত হলো আন্তর্জাতিক আল্ট্রাম্যারাথন অঙ্গনে। তাঁর এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে দেশের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে প্রকৃতি, অভিযান আর চ্যালেঞ্জকে ভালোবাসতে শেখাবে।
ছবি: ডা. সাহা প্রতীক প্রসাদ