
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব দেশগুলোর তালিকায় নরওয়ের নাম সব সময়ই শীর্ষে থাকে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার, নির্মল ফিয়র, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব নীতির কারণে দেশটিকে অনেকেই ‘সবুজ স্বর্গ’ বলে অভিহিত করেন।

কিন্তু এই সবুজ স্বর্গের একটি বিস্ময়কর গল্প আছে। সারা বিশ্ব যখন বর্জ্যের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নরওয়েতে উল্টো পোড়ানোর মতো আবর্জনার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সে কারণেই দেশটি যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার টন বর্জ্য আমদানি করে।
শুনতে অবাক লাগলেও এটি কোনো পরিবেশগত সংকট নয়; বরং জ্বালানি উৎপাদনের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

নরওয়েতে গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার একটি বড় অংশের বর্জ্য অত্যাধুনিক ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্টে পাঠানো হয়। সেখানে উচ্চ তাপমাত্রায় বর্জ্য পুড়িয়ে উৎপাদন করা হয় বিদ্যুৎ ও তাপশক্তি। সেই তাপ ব্যবহার করে ডিস্ট্রিক্ট হিটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার বাড়িতে শীতের সময় গরম পানি ও উষ্ণতা সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু গত কয়েক দশকে পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য কমানোর নীতি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার কারণে নরওয়েতে পোড়ানোর উপযোগী বর্জ্যের পরিমাণ কমে গেছে। ফলে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত প্ল্যান্টগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই বিদেশ থেকে বর্জ্য আমদানি শুরু করে দেশটি।

যুক্তরাজ্যের মতো অনেক দেশে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ফেলা ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই সেই বর্জ্যের একটি অংশ জাহাজে করে পাঠানো হয় নরওয়েতে।
নরওয়ে সেই বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদন করে। অর্থাৎ এক দেশের বর্জ্য অন্য দেশের জ্বালানিতে রূপান্তরিত হয়। এই ব্যবস্থায় বর্জ্য আর শুধু ফেলে দেওয়ার বস্তু নয়; এটি অর্থনৈতিক সম্পদ এবং জ্বালানির কাঁচামাল।

নরওয়ের আরেকটি বৈপরীত্যও কম বিস্ময়কর নয়।
বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে দেশটি শীর্ষস্থানীয়। নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির প্রায় ৯০ শতাংশই বৈদ্যুতিক। ফলে শহরগুলোতে বায়ুদূষণ তুলনামূলক কম।
কিন্তু একই সঙ্গে নরওয়ে ইউরোপের অন্যতম বড় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। দেশের অভ্যন্তরে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।
সবুজ প্রযুক্তিরও একটি বৈশ্বিক মূল্য রয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি, বায়ুচালিত টারবাইন কিংবা আধুনিক নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজন লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও তামার মতো খনিজ। এসবের বড় অংশ আসে চিলি, কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে, যেখানে খনিশিল্পের কারণে পরিবেশদূষণ, পানিসংকট এবং শ্রমিকদের কঠিন বাস্তবতার মতো সমস্যা দেখা যায়।
অর্থাৎ উন্নত বিশ্বের সবুজ প্রযুক্তির সুবিধার একটি অংশের পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য পরিশোধ করতে হয় অন্য দেশের মানুষকে।
নরওয়ে নিঃসন্দেহে পরিবেশবান্ধব নীতিতে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশ। তবে তাদের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, টেকসই উন্নয়ন কখনোই একমাত্রিক নয়।
একদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন শহর; অন্যদিকে তেল রপ্তানি, বিদেশি বর্জ্য আমদানি এবং বৈশ্বিক খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরতা—এ দুই বাস্তবতাই একই সঙ্গে বহন করছে দেশটি।
এ কারণেই অনেক গবেষক নরওয়েকে ‘গ্রিন প্যারাডক্স’ বা সবুজ বৈপরীত্যের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সবুজ প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের পথ দেখায়। তবে সেই ভবিষ্যৎকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে শুধু কার্বন নিঃসরণ কমালেই হবে না; প্রযুক্তির পুরো জীবনচক্র, সম্পদ আহরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত প্রভাব—সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
তবেই সবুজ উন্নয়ন হবে সত্যিকার অর্থেই টেকসই।
তথ্যসূত্র: স্ট্যাটিস্টিকস অব নরওয়ে
ছবি: ইন্সটাগ্রাম/ উইকিপিডিয়া