বাবার রেখে যাওয়া ঐতিহ্য
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সময়টা তখন ১৯৬০ বা ’৬২! বুড়িগঙ্গা নদী থেকে বেশ খানিকটা সামনে অবস্থিত মৌলভীবাজারে জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন হরেক রকম মানুষের আনাগোনা চলত। তাদের মধ্যে শ্রমিকশ্রেণির মানুষকে এক বেলা ভালো খাওয়ানো ও নিজের জীবিকার জন্য বাজারের এক কোণে মাদুর বা চাটাই বিছিয়ে মোরগ–পোলাও বিক্রি শুরু করলেন নান্না মিয়া।

প্রয়াত হাজি নান্না মিয়ার ও তাঁর ছেলে হাজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ
প্রয়াত হাজি নান্না মিয়ার ও তাঁর ছেলে হাজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ
ছবি: লেখক

এই গল্পের আরেকটু আগে গেলে জানা যায়, নান্না মিয়ার বাবা ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। তাই বাবাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করার জন্য শৈশবেই সংসারের হাল ধরতে হয় নান্না মিয়াকে। প্রথমে তিনি পাতার বিড়ি বানাতেন এবং এর থেকে প্রতিদিন দেড় টাকা আয় করতেন। এরপর তিনি খাবারের দোকানে কাজ নেন ও মাওলানা দ্বীন মোহাম্মদ সাহেবের খাদেম হন। দ্বীন মোহাম্মদ সাহেবই নান্নাকে বাবুর্চি হওয়ার জন্য মূলত উৎসাহ জোগান। নান্না তখনকার ঢাকার বিখ্যাত পেয়ারা বাবুর্চির অধীনে রান্না শেখা শুরু করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে নান্না বাবুর্চির কাজ শুরু করেন এবং ঢাকার মৌলভীবাজারে প্রথম মোরগ–পোলাও বিক্রি করেন।

বিজ্ঞাপন

প্রথম প্রথম তিনি বাসা থেকে এক হাঁড়ি মোরগ–পোলাও রান্না করে নিয়ে এসে বসতেন মৌলভীবাজারের ছোট্ট একটি দোকানে। এখানেই লোকজন চাটাইয়ে বসে মজা করে খেত তাঁর রান্না। প্রতি প্লেটের দাম ছিল দুই টাকা। সে সময় থেকেই মোরগ–পোলাওয়ের সঙ্গে সুস্বাদু ঝোল দেওয়ার রীতি চলে এসেছে। মৌলভীবাজারের সেই ছোট্ট জায়গা থেকে ভোজনরসিক পুরান ঢাকার মানুষের মধ্যে হাজি নান্নার রান্নার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের পরিক্রমায় নান্না মিয়া বেচারাম দেউড়িতে ১৯৭৩ বা ’৭৪ সালে দোকান দেন। আজ অব্দি সেই ঠিকানা অক্ষত। ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত নিজ হাতেই রান্না করতেন বাবুর্চি নান্না মিয়া।

বিখ্যাত মোরগ-পোলও
বিখ্যাত মোরগ-পোলও
ছবি: লেখক

বর্তমানে হাজি নান্না মিয়ার ছেলে হাজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। বাবার গড়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও আবেগ ধরে রেখে বিক্রি করে চলেছেন নান্না মিয়ার সেই বিখ্যাত মোরগ–পোলাও এবং সঙ্গে যুক্ত করেছেন গরুর তেহারি, খাসির বিরিয়ানি, খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি, খাসির রেজালা, ডিম পোলাও, বোরহানি, টিকিয়া ও ফিরনি। প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এসব ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। ঢাকায় বর্তমানে হাজি নান্না বিরিয়ানির সাতটি শাখা রয়েছে। পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ি, লালবাগ, নবাবগঞ্জ, নাজিরাবাজার, নাজিমউদ্দিন রোড, মিরপুর ও বেনারসিপল্লিতে নান্না বিরিয়ানির শাখাগুলো অবস্থিত।

বিজ্ঞাপন

পুরান ঢাকার হাজি নান্না বিরিয়ানির স্বাদ আর ঐতিহ্যের সুনাম ধরে রাখার জন্য ভীষণ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন তার পরবর্তী প্রজন্মরা। কথা প্রসঙ্গে হাজি আবদুল্লাহ জানান, ‘ছোটবেলায় পড়াশোনার পাশাপাশি আমি রান্নায় বাবাকে সাহায্য করতাম। তিনি না থাকলে আমি আজকে এই জায়গায় কখনোই আসতে পারতাম না। তাই আমি তাঁর সম্মান, ঐতিহ্য ও গৌরব বজায় রাখতে আজীবন সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।’ তিনি বাবার গৌরব ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। আর এই কারণেই হাজি নান্না মিয়ার বিরিয়ানির সুখ্যাতি ঢাকা ও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে এখানে মানুষ দূরদূরান্ত থেকে পরিবার ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে খেতে আসে।

যোগ হয়েছে খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি
যোগ হয়েছে খাসির কাচ্চি বিরিয়ানি
ছবি: লেখক

হাজি আবদুল্লাহ জানান, ‘আমাদের খাবারের স্বাদ ও মান একটুও পরিবর্তন হয়নি, যার ফলে আমরা এত বছর ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে যেতে পেরেছি।’ হাজি আবদুল্লাহ আরও যোগ করেন, হাজি নান্না যেভাবে বিরিয়ানি রান্না করতেন, সেই একই স্বাদ বজায় রেখে এবং মানুষকে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আমরা বাবার শুরু করা বিরিয়ানির সুখ্যাতি যুগের পর যুগ ধরে রাখতে চাই। হাজি নান্না বিরিয়ানির গৌরবগাথা শেষে ধন্যবাদ দিয়ে ফিরে আসার সময় দেখি আবদুল্লাহ সাহেবের চোখ ছল ছল করছে; সেই চোখের জলে তখন বাবার জন্য আবেগ, সম্মান আর শ্রদ্ধার আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল।’

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২২, ০৮: ০০
বিজ্ঞাপন