
প্রতিটি ফরাসি পনিরের পেছনে রয়েছে অনেক বিস্ময়কর গল্প, উপকথা এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস। মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যোগ হয়েছে শিল্পসৃষ্টির অবাধ্য উল্লাস, অনন্ত স্পৃহা। যুগে যুগে পরিবেশ–প্রকৃতি মানুষের সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনের আকাঙ্ক্ষা ও অনুপ্রেরণাকে প্রভাবিত করেছে।
ফ্রান্সের বাজারে বেশ বড় আকারের পনিরের দেখা মেলে। এই পনিরগুলোর মধ্যে কমতে, কান্তাল ও ইমেন্তাল আকারে–আয়তনে বেশ বড় হয়ে থাকে। ইমেন্তাল পনিরকে শুধু ফরাসি পনির বলা যাবে না। এই পনিরের ওপর সুইসদেরও দাবি আছে। তবে সেই প্রাচীনকাল থেকে আজও সমানভাবে কমতে ও কান্তাল—এই দুটি পনিরই ভীষণ জনাদৃত।
পুরু আস্তরণের বেশ বড় গোলাকৃতির পনির, নাম ‘কমতে’। পনিরের প্রসঙ্গ এলে বহু প্রাচীন ফরাসিদের খুব পছন্দের এই পনিরকে মোটেই বাদ দেওয়া যাবে না। প্রতিবছর ফরাসিরা ৩০ হাজার টনের বেশি কমতে পনির খেয়ে থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, প্রায় ৭ কোটি ফরাসি বছরে জনপ্রতি প্রায় আধা কেজি কমতে সাবাড় করে থাকে। পৃথিবীর জনপ্রিয় শীর্ষ ১০টি পনিরের মধ্যে সুস্বাদু এই পনিরকে পাওয়া যাবে।

পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্ত বরাবর ৩৬০ কিলোমিটার বা ২২৫ মাইলের বেশি অঞ্চলজুড়ে জুরা পর্বতমালা। আকাশছোঁয়া পাহাড়ের রাজ্য, নিসর্গের স্বর্গভূমি। জুরাসিক ভূতাত্ত্বিক যুগ থেকেই এই অঞ্চলের অস্তিত্ব বলেই এমন নামকরণ। সভ্যতার আদিকাল থেকেই মানুষ পাহাড়ের আকর্ষণ এড়াতে পারেনি। পশু পালনের জন্য চমৎকার উঁচু মালভূমি খুব কমই দেখা যায়। সে কারণেই একদল মানুষ পাহাড়ে আবাস গড়েছিল সুদূর অতীতে। তবে এ অঞ্চলে শীত অনেকটাই তীব্র এবং শীতকালে তুষার আর বরফে ঢেকে যায় সব, রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে এই এলাকায় শীতের সময়টাতে মানুষ ঘরে থাকতেই পছন্দ করত।
সেই দ্বাদশ শতাব্দী থেকে কৃষকেরা বসন্ত আর গ্রীষ্মের সংগ্রহ করা অতিরিক্ত গরুর দুধকে এমন একটি পণ্যে রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল, যা সহজেই সংরক্ষণ করা যায় এবং সবার পছন্দের হয়। গ্রামের সবাই মিলে শীতের সময় খাবার জন্য সমবায় পদ্ধতিতে দুধ সংরক্ষণ করত। একেকটি সংরক্ষণ পাত্রে জমা করতে হতো ৪০০ থেকে ৫০০ লিটার গরুর দুধ। একজন কৃষকের পক্ষে এই পরিমাণ দুধ সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না। তাই অনেকে মিলে পর্যাপ্ত দুধের সরবরাহ নিশ্চিত করত। সে সময়ে দুধ সংরক্ষণের কোনো কার্যকর পদ্ধতি মানুষের জানা ছিল না।

একমাত্র উপায় ছিল দুধ থেকে পানির অংশ আলাদা করে দুধ জমাট করে সংরক্ষণ করা। সমবায় সমিতির ধারণাটি এভাবেই গড়ে ওঠে। ঠিক ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার মতোই প্রতিটি পরিবার তাদের প্রতিদিনের দুধ নিয়ে আসত এবং সেই দুধ জমা রাখত একটি নির্দিষ্ট সংরক্ষণাগারে। পরে তাঁরা মিলে একেকটি চাকা আকৃতির বেশ বড় পনির তৈরি করত। সময়ের সঙ্গে মানুষ এই বড় পনিরকে স্বাদে, ঘ্রাণে এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ করে; ফলে জন্ম নেয় ফ্রান্সের আরেকটি বহু প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী পনির ‘কমতে’।
মধ্যযুগে কমতে শুধু একটি সুখাদ্যই ছিল না, এই চমৎকার পনির ছিল পণ্য বিনিময়ের কেন্দ্রে। পাহাড়ের উচ্চতায় শীতের দিনে গ্রামবাসীরা যখন অনেকটাই অবরুদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তখন এই পনির ছিল প্রচলিত মুদ্রার বিকল্প। যে কৃষকের ভান্ডারে যত বেশি কমতে পনির থাকত, সে ছিল তত বেশি সচ্ছল অর্থাৎ ধনবান কৃষক। তা ছাড়া এই পনিরকে ঘিরে সমবায় পদ্ধতির সঙ্গে উন্নত এবং সুসংগঠিত সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

একটি খাদ্য যে শুধু মানুষের ক্ষুধা নিবারণ করে তা মোটেও নয়, পাশাপাশি সবার মধ্যে সৌহার্দ্য, একতা এবং একে অন্যের বিপদে সাহায্য করার মানসিকতার শক্ত ভিত রচনা করে। পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং সামাজিক বন্ধন চমৎকার উদাহরণ সৃষ্টির কারণে কমতে নামের এই পনির ইতিহাসে আলাদা স্থান করে নিয়েছে।
১৯৫৮ সালে কমতে উৎপত্তি এবং আদি নাম নির্দেশক ‘সুরক্ষিত’ পনিরের মর্যাদা পেয়েছে। যেহেতু জুরা পর্বতমালার বিস্তীর্ণ উপত্যকা ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে পড়েছে, সে কারণে একটি চুক্তির মাধ্যমে এই দুই দেশের অভ্যন্তরে সীমান্ত বরাবর ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত গরু চরানো অনুমোদিত।

প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, খনিজ এবং খাদ্যপ্রাণের চমৎকার উৎস এই পনির প্রস্তুতিতে কোনো রকম রাসায়নিক বা কৃত্রিম রং যোগ করা যাবে না। এই পনির প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। সে কারণেই শুধু স্বাদেই নয়, স্বাস্থ্যকর এবং প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবেও সেরা একটি পনির এই কমতে। শীতের দিনগুলোতে চিমনির আগুনের পাশে খাবার টেবিলে বসে পরিবারের সবাই এক টুকরো মজার স্বাদের পনির ‘কমতে’ মুখে দিয়ে অপার আনন্দ শরীর, মনকে উষ্ণ করে। আজও সেই ধারা বহাল রয়েছে।
কান্তাল নামের এই পনির যখন পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছে, তখন ‘ফ্রান্স’ নামে কোনো দেশ ছিল না। কান্তাল সম্ভবত ইউরোপের অন্যতম প্রাচীনতম এক মুখরোচক খাবার, যা আজও স্বাদের সাম্রাজ্যের অনেকখানি দখলে রেখেছে। কান্তাল ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডের ১৫ শতাংশ জুড়েই আছে। এর একদম পেটের মধ্যে সুউচ্চ পর্বতমালা রয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে। এই পর্বতমালার অনেকগুলো শৃঙ্গের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ বছর বয়সের প্রায় ২ হাজার মিটার উঁচু মৃত আগ্নেয়গিরিটির নাম ‘কান্তাল শৃঙ্গ’। এ অঞ্চলের দুই হাজার বছরের বেশি আগে থেকেই গবাদিপশু পালন করত।

এই পনির প্রস্তুতিতে প্রথমে দুধ থেকে ছানা তৈরি করার পরে পানিনিষ্কাশনের বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় বলেই স্বাদের তারতম্য ঘটে। তা ছাড়া প্রাচীন আগ্নেয়গিরি অঞ্চলে পাহাড়ি উদ্ভিদ আর বাহারি বনফুল গরুর খাদ্যে দুধের স্বাদে আলাদা মাত্রা যোগ করে। রোমান প্রকৃতিবিদ প্লিনি দ্য এল্ডারের লেখায় এই পনিরটির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেছেন যে এককালে রোমে রাজরাজড়াদের খাবার টেবিলে সমাদৃত ছিল কান্তাল অঞ্চলের পনির। জনশ্রুতি আছে যে জুলিয়াস সিজার দেশ দখলের নেশায় এই পার্বত্য অঞ্চলে এসে হাজির হলে এই পনিরের প্রেমে পড়েছিলেন।
সেই প্রাচীনকালেই অভিযাত্রী ও বেনিয়াদের কল্যাণে জনপ্রিয় এই পনির বহু দূরের দেশে পৌঁছে গিয়েছিল। বিশেষ করে অভিযাত্রী ও সৈনিকেরা তাঁদের খাদ্যের তালিকায় কান্তাল পানিরটি রাখতে আগ্রহী ছিলেন। এর প্রধান কারণগুলো ছিল এর স্বাদ, পুষ্টিগুণ, বেশ শক্ত গঠনের কারণে সহজে বহন এবং সংরক্ষণ করা যেত। রেলগাড়ি চলতে শুরু করলে কান্তাল পনির গতি পায়।

মধ্য ফ্রান্সের পাহাড় ছেড়ে রেলগাড়ির বোঝাই হয়ে প্যারিস এবং অন্য বড় শহগুলোর রসনাবিলাসীদের খাবার টেবিলে পৌঁছে যেতে শুরু করল, স্বাদের জগতে এই পনিরের জয়যাত্রার শুভ সূচনা হয়। সে সময়ে রেলগাড়িতে চড়লে, কান্তাল পনিরের মনকাড়া ঘ্রাণ যাত্রীদের মনে করিয়ে দিত যে একটি সুখাদ্যের এক বিশাল চালান এই গাড়িতে তাঁদের যাত্রার সঙ্গী। আর আজ এই পনিরটিকে চেনে না, এমন একজন ফরাসি নাগরিক খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বহুকাল যাবৎ কান্তাল উঁচু পাহাড়ের বাসিন্দাদের খুব পছন্দের খাবার ছিল। গরুর পাল নিয়ে রাখালেরা বসন্ত এবং গ্রীষ্মকাল মিলিয়ে প্রায় পাঁচ মাস তাঁরা তাঁদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কুটিরে থাকতেন। এখানকার সুবিশাল মালভূমি, সবুজ উপত্যকা, ঘন অরণ্য এবং ছোট ছোট ঝর্ণা ধারায় জলের শব্দ মনকে সতেজ করে। এখানে বেড়াতে এসে উঁচু পাহাড়ের গায়ে পাথরে নির্মিত এমন ছোট কুটিরগুলো আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। তবে আজ আর সেখানে রাখালদের দেখা পাওয়া যায় না। মাঝেমধ্যে এমন কোনো কুটিরের চিমনি দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে দেখলে ধরে নিতে হবে পাহাড়ে বেড়াতে আসা পর্যটকেরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে রাখালেরা না থাকলেও সময়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজও স্বাদের সাম্রাজ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই কান্তাল। সে সাত দশক অর্থাৎ সেই ১৯৫৬ সাল থেকে এই পনিরটি সুরক্ষিত পনিরের মর্যাদা নিয়ে খাদ্যরসিকদের মন জয় করে আসছে।
মইনুল হাসান: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক।