
‘দেবতাদের খামখেয়ালি’ ফরাসিতে ‘ক্যাপ্রিস দে দিউ’ একটি চমক দেওয়া নাম, এখানে দেবতাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এটা ফ্রান্সের পনিরশিল্পী জ্যঁ-নোয়েল বঁগ্রেঁর (১৯২৪-২০১৯) সৃষ্টি বিশ্বজুড়ে খুব জনপ্রিয় একটা পনির। মধ্য ফ্রান্সের খানিকটা পূর্ব দিকে বুর্গইন অঞ্চলে খুব সাধারণ দুগ্ধজাত পণ্যের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘স্যাভেন্সিয়া ফ্রোমাজ অ্যান্ড ডেইরি’র স্বত্বাধিকারী ছিলেন জ্যঁ-নোয়েল বঁগ্রেঁ।

জ্যঁ-নোয়েল বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করতে হলে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। বাজারে চাহিদার দিকে খেয়াল রেখে সেই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যগুলোর উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে যত্নবান হতে হবে। সর্বোপরি পণ্যের খবর ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ভোক্তাদের আস্থা ধরে রাখতে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সব পথ খোলা রাখতে হবে।
অনেকগুলো উদ্ভাবনের মধ্যে পাস্তুরায়িত গরুর দুধের দেবতাদের খামখেয়ালি নামের ক্রিমসমৃদ্ধ সফেদ রঙের পনিরটি বেশ সাড়া ফেলল, দেবতাদের আনুকূল্য অর্থাৎ ভোক্তাদের মন জয় করল। আর সেই থেকে সাত দশক ধরে আজও তা অব্যাহত রয়েছে। জ্যঁ-নোয়েল মোটেই খেয়ালি ছিলেন না। তিনি খেয়াল করলেন, জনপ্রিয় পনির ব্রি একটুখানি কড়া বা কষা, ঘ্রাণ একটু তীব্র আর তাতে মোলায়েম ভাব খানিকটা কম আছে। স্বাদের গভীরতায় পৌঁছাতে মুখে নিয়ে বেশ খানিক্ষণ নাড়াচাড়া করতে হয়। জগৎ বদলে গেছে, রসনাপ্রিয় মানুষের তর সইতে চায় না, তাঁদের তাৎক্ষণিক আনন্দ আরাধ্যে। ফলে এই স্বাদের পনির ব্রিকে তাই ভোক্তাদের অনেকেই খানিকটা এড়িয়ে চলেন। তিনি দেখলেন, ‘এড়িয়ে চলা’ ক্রেতা ও ভোক্তাদের সংখ্যা খুব একটা কম নয়।
জ্যঁ-নোয়েল এই ব্রির অপূর্ণতার সুযোগ নিলেন। আর ব্রিতে থাকা সব ত্রুটি দূর করতে উদ্যোগী হলেন। তিনি ব্রির থেকে বেশি মোলায়েম, পুষ্পিত আস্তরণের মজার স্বাদের পনির উদ্ভাবনে সক্ষমও হলেন। এ কাজের জন্য তাঁকে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে জীবন থেকে খরচ করতে হয়েছে পাঁচ পাঁচটি বছর। শুধু তা–ই নয়, তিনি লক্ষ করলেন, বাজারে প্রচলিত সব পনির চ্যাপটা গোলাকার, না হয় চার কোনা কিউবিক, অর্থাৎ ঘনাকৃতি। তিনি আকৃতিতেও একটু ভিন্নতা আনলেন।

তাজা মাখন ঘ্রাণের পনিরকে চ্যাপটা ডিম্বাকার আকৃতি দিলেন। ২০০ গ্রামের একটুকরা লম্বায় ১৪, প্রস্থে ৬ এবং উচ্চতায় ৩ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। সেই সঙ্গে একটু বড় সাইজ ৩১০ গ্রাম এবং মাত্র ৫০ গ্রাম ওজনের মিনি পনির ‘ক্যাপ্রিস দে দিউ’ বাজারজাত করলেন। নীল রঙের মোড়কে অন্য সব পনিরের চেয়ে আলাদা করতে ভোক্তাদের বেগ পেতে হয় না। এবার এই নতুন স্বাদ, ঘ্রাণ আর নতুন আকৃতির পণ্যটির একটি জুতসই নাম দিতে হবে। সে কাজও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে নামকরণকে অবহেলা করা চলে না।
জ্যঁ-নোয়েল নামকরণ করতে গিয়ে দেখলেন, সে সময়ের বাজার দাপিয়ে বেড়ানো পনিরের মধ্যে অন্যতম ছিল ‘যে গরু হাসে’; অদ্ভুত নামের পনিরটি ছিল শীর্ষে। তাই তিনি ভাবলেন, গতানুগতিক নয়—এ রকমই একটা নাম বেছে নেবেন। তবে নামটা হতে হবে পরিশীলিত, আকর্ষণীয় এবং খুব সহজেই মনে রাখা যায়। সেই ভাবনা থেকে ‘ঈশ্বর’ শব্দটি মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। ঈশ্বর বা দেবতা হচ্ছে পবিত্রতা, শুদ্ধতা আর নান্দনিকতার প্রতীক।

‘খামখেয়ালিপনা’ হচ্ছে অসম্ভব বা অপার্থিব আনন্দের আকস্মিক আকাঙ্ক্ষা, যে ইচ্ছা বা অভিপ্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। তাই তিনি তাঁর কঠোর শ্রম, নিষ্ঠা আর প্রজ্ঞার ফসল এই নতুন পনিরের নাম রাখলেন, ‘ক্যাপ্রিস দে দিউ’, বাংলায় ভাষান্তর করলে হয় ‘দেবতাদের খামখেয়ালি’। ১৯৫৬ সালে ফরাসি স্বাদসাম্রাজ্যে যুক্ত হয় ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই পনির।

তারপর শুরু হয় আসল লড়াই। জাতীয় পর্যায়ে এমন চমৎকার দুগ্ধজাত খাদ্যটি তেমন পরিচিতি পাচ্ছে না। স্থানীয় খবরের কাগজে ফলাও করে বিজ্ঞাপন দিয়েও ভোক্তাদের আকর্ষণ করা যাচ্ছিল না।
১৯৬৮ সাল। ফ্রান্সজুড়ে তীব্র সামাজিক অসন্তোষ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা প্রচলিত সমাজকাঠামো, অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা এবং প্রাচীনদের বেঁধে দেওয়া নৈতিকতার সীমানা মেনে নিতে তীব্র অনীহা প্রকাশ করে। সে সময়ে অনেক দেশেই চিরাচরিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণসমাজের বিদ্রোহী কণ্ঠ সোচ্চার হতে শুরু করে।

ফ্রান্সের তরুণেরাও ফুঁসে উঠেছিল পুঁজিবাদী সরকারি ক্ষমতা টুকরা করে উড়িয়ে দিয়ে ভবিষ্যতে নতুন এক মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্নে। গতানুগতিক ব্যবস্থা উল্টে দিয়ে স্বাধীন চিন্তা এবং বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থায় তৈরি হবে সমগ্র জীবনের প্রতি দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ নাগরিক। স্বপ্নপূরণের সেই আকুতিতে আন্দোলনের ঘূর্ণিঝড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল দেশের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন অধ্যাপকেরাও। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। ছাত্র-শিক্ষকদের পাশে এসে দাঁড়াল সাধারণ শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষেরা।
রাস্তায় খণ্ডযুদ্ধ, ব্যারিকেড। রাতের অন্ধকারে অগ্নিশিখা। রায়ট পুলিশের লাঠির আঘাতে দোফিন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী মালিক উসকিন প্রাণ হারায়। ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমে নতুন সংযোজন ছিল টেলিভিশন। যারা এত দিন নিশ্চুপ ছিল, সেই নাগরিকদের কাছেও পৌঁছে গেল পুলিশের কাঁধে ভর করে ক্ষমতাসীনেরা তাদেরই সন্তানদের ওপর নির্যাতনের পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছে। ফলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসে তাদের বাবা–মায়েরা। একটি তরুণের মৃত্যুতে পাঁচ লাখ ছাত্রের শৃঙ্খলাবদ্ধ পদযাত্রা ছিল এক সৌন্দর্যময় যৌবনের শোভাযাত্রা। যৌবনের তেজদীপ্ত বিদ্রোহের আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গেল পুরোনো ব্যবস্থা, প্রাচীন নীতি-নৈতিকতার অসার সব নিয়ম-কানুন।
জ্যঁ-নোয়েল দেখলেন, নতুন দিনের তরুণেরা তাদের কথাবার্তায় ভদ্রলোকি মুখোশ ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। তারা যেমন করে কথা বলতে পছন্দ করে, তিনি তেমন করেই তাঁর উদ্ভাবিত পণ্যের বিজ্ঞাপনের ভাষা ঠিক করলেন এবং প্রচারমাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনকে প্রাধান্য দিলেন। আর তাতেই দেবতাদের খামখেয়ালি তুঙ্গে উঠল। তরুণদের হাত ধরে প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠল পনির ক্যাপ্রিস দে দিউ। কিংবদন্তিসম খ্যাতি ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল।

সেই থেকে শুরু হয়েছে এই খাদ্যপণ্যের স্বাদসাম্রাজ্য বিস্তারের অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা। পৃথিবীতে দুগ্ধজাত পণ্যপ্রতিষ্ঠানের শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়ে জ্যঁ-নোয়েল বঁগ্রেঁর প্রতিষ্ঠান স্যাভেন্সিয়া ফ্রোমাজ অ্যান্ড ডেইরি আজ বিশ্বের ১৮তম এবং ফ্রান্সে এর স্থান চতুর্থ।
বর্তমানে ১২০টি দেশে এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শাখায় কাজ করছেন ২২ হাজারের বেশি সুদক্ষ কর্মী।


প্যারিস থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার বা ২০০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে ইলো শহরে দেখা মিলবে ক্যাপ্রিস দে দিউ পনিরের জাদুঘর, ‘ল্য ডিভিন ফ্রোমাজেরি’।
জ্যঁ-নোয়েল বঁগ্রেঁর সাধারণ একটি পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীপ্তি ছড়াচ্ছে। আর এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে দেবতাদের খামখেয়ালির জন্য।
মইনুল হাসান: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক।