ভ্রমণে ভোজনে: মঙ্গোলিয়ায় তৃণভূমির আঘ্রাণ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

রাজধানী শহর উলানবাটর থেকে স্তেপ অঞ্চলের দিকে যেতে যেতে বুঝলাম, এখানে খাবার মানে শুধু স্বাদ নয়, বেঁচে থাকার কৌশল। মঙ্গোলিয়ার খাবারের মূল উপাদান খুবই সাদামাটা; মাংস, দুধ, আটা আর আগুন। কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা যাযাবর। চাষাবাদের সুযোগ কম, তাই পশুপালনই ভরসা। আর সেই পশু থেকেই আসে খাবারের সবকিছু।

পথের পাশে সকালের নাস্তা
পথের পাশে সকালের নাস্তা

দুগ্ধজাত খাবারের ভান্ডার! মঙ্গোলিয়া আসলে দুধের দেশ। শুকনো দই আরুল, ঘোড়ার দুধের ফারমেন্টেড পানীয় আইরাগ, পনির, মাখন, দুধ ইত্যাদি খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। এগুলো যাযাবর জীবনের জন্য একদম উপযুক্ত।

অল্প কদিনের ভ্রমণে একটি ভূখণ্ডের খাদ্যসংস্কৃতির বিষয়ে খুব কমই জানা হয়। ভ্রমণ করতে করতে জানা-অজানা ও নিজস্ব অনুভূতির আলগোছে যেসব খাবার সামনে এসেছে, সেসব অভিজ্ঞতা মিলিয়েই ভ্রমণে-ভোজনের মঙ্গোলিয়া পর্ব।

বিজ্ঞাপন

নাম তার হরহগ

প্রথম দিন দুপুরে খাবারের টেবিলে হরহগের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে গাইড তুসিনতুর। রেস্তোরাঁটা বেশ সুন্দর। নাম মডার্ন নোমাডস। তুসিনতুর বলল, এটি মঙ্গোলিয়ান খাবারের জন্য বিখ্যাত। সাজসজ্জাও দারুণ। ড্রাগন, বুদ্ধমূর্তি, মঙ্গোল পৌরাণিক গল্পের চরিত্রগুলোর শিল্পকর্ম দিয়ে সাজানো হয়েছে। প্রথমে সালাদ ও স্যুপ এল টেবিলে। সবজির স্যুপ, তাতে পাকা পাম দেওয়া রয়েছে। কিছুটা তালের মতো দারুণ সুবাস পাওয়া যাচ্ছে, খেতে বেশ মিষ্টি। স্যুপে পাম প্রথম খেলাম। মূল খাবার এল দুটি পাত্রে। একটিতে রাইস, অনেকটা ফ্রায়েড রাইসের মতো। অন্যটিতে মাংস।

হরহগ আসলে সবজির স্যুপ
হরহগ আসলে সবজির স্যুপ

রেস্তোরাঁয় সাহায্যকারী চলে যাওয়ার পর তুসিনতুর মাংসের পাত্রটি খুলে কয়েকটি বড় কালো পাথর বের করলেন। আমি অবাক হব, না কী করব, বুঝতে পারছি না। নিজেকে অনুভূতিহীন মনে হচ্ছে। তারপরের কথাগুলো আরও বিস্মিত হওয়ার মতো। মাংস রান্না হয় গরম পাথরসহযোগে। মানে উনুনে রান্না হয় না। পাথর আগুনে গরম করে সেই গরম পাথর মাংস, আলু, সবজি মিশিয়ে তেল ছাড়া পাত্রের মুখ ঢেকে রান্না করা হয় স্টিমে। এক কেজি মাংস রান্না করতে সময় লাগে ৪০ মিনিটের মতো। পাথরের সাহায্যে তেলবিহীন এই মাংসের নাম হরহগ। শীতের সময় এসব পাথর হাতে নিয়ে শরীরে উত্তাপ নেয় স্থানীয় মানুষেরা। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে শীতের সন্ধ্যায় যেমন খড়কুটো জ্বালুয়ে আগুন তাপায়, ঠিক তেমনি গরম পাথর হাতে নিয়ে শীতের প্রকোপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার একটি উপায়।

মাংসগুলো খেতে বেশ সুস্বাদু আর নরম। আলাদা করে তেল না ব্যবহার করার আরও একটি কারণ হলো, মাংসের সঙ্গে প্রচুর চর্বি থাকে। মধ্য এশিয়াতেও দেখেছি মাংসের সঙ্গে চর্বির ব্যবহার।

বিজ্ঞাপন

ওয়েলকাম ডিনার

ওয়েলকাম ডিনারের স্মৃতি
ওয়েলকাম ডিনারের স্মৃতি

রাত ৯টার দিকে ডিনার করতে গেলাম। তখনো চারপাশ আলোকিত। সূর্য অস্ত গেছে আটটা বেজে ত্রিশ মিনিটে। আজ ওয়েলকাম ডিনারের আয়োজন করেছে মঙ্গোলিয়ার ট্রাভেল কোম্পানি। রেস্তোরাঁয় একটি রুম রিজার্ভ করা হয়েছে। আটজন একসঙ্গে খাবার উপভোগ করা যায়। তুসিনতুরসহ আমরা মাত্র তিনজন।

রুমটি বেশ গোছানো
রুমটি বেশ গোছানো

রুমটি বেশ গোছানো আর পরিপাটি। দেয়ালে পেইন্টিং ঝুলছে। আমরা যে মনাস্ট্রি দেখে ডিনার করতে এলাম, তার ছবি আছে। আমাদের খাবার ঘরে প্রবেশ করলে সেটাই প্রথমে চোখে পড়ে। এটা কোজিন লামা মনাস্ট্রির একটি পুরোনো ছবি। তা ছাড়াও অন্যান্য স্যুভেনির দিয়ে সাজানো রুমটি। মনে হচ্ছে, কোনো রাজকীয় বাড়ির ছোট ডাইনিং হল। খেলাম গরুর মাংসের সালাদ আর বিফ স্টেক; খুব তুলতুলে ও রসালো। ছুরি বসানোর সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যাচ্ছে মাংসের মধ্যে। শেষে এল পুডিং।

মঙ্গোলিয়ান গুলাশ

রাজধানীতে এক রাত কাটিয়ে রোড ট্রিপে বের হলাম। আজ ভেতরে ভেতরে রোমাঞ্চিত হয়ে আছি, কারণ রাত্রিযাপন হবে একটি যাযাবর পরিবারের সঙ্গে তাদের গেরে। উলানবাটর থেকে ৬ ঘণ্টার ড্রাইভ। সকাল ৮টায় রওনা দিলাম।

মঙ্গোলিয়ান
মঙ্গোলিয়ান

দুপুর ১২টার দিকে আমাদের ফোর হুইলার এসে থামল একটি মার্কেটের সামনে। এখানে লাঞ্চ করব। তুসিনতুর বলল, পথে আর ভালো কোনো মার্কেট নেই যেখানে খাবার পাওয়া যাবে। রেস্টুরেন্টের নাম পড়তে পারলাম না। তবে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে ‘রোড সাইড স্টেশন’, স্থাপনকাল ১৯৯৮ সাল। মার্কেটের সামনে অনেক গাড়ি রয়েছে। বুঝলাম পর্যটকেরা এখানেই বিরতি নেন। মার্কেটের পাশেই একটি ব্রিজ দেখলাম। একটি সরু নদী। এত পথ এলাম, এখানেই কিছুটা জলাধার দেখতে পেলাম। নদীর ধারে অনেক ঘোড়া।

ভেতরে গেলাম। মেনু দেখছি, তখন তুসিনতুর বলল, ‘মঙ্গোলিয়ান গুলাশ খেতে পারো।’গুলাশ কি মঙ্গোলিয়ান খাবার? অবাক হলাম। বিফ গুলাশ আমি খেয়েছি হাঙ্গেরি আর চেক রিপাবলিক ভ্রমণে। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলাম। খেয়ে দেখা দরকার।
বলা হয়, গুলাশ হাঙ্গেরিয়ান পদ। গুলাশের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছে কিশোর বয়সে টেলিভিশনে সুবর্ণা মুস্তাফা অভিনীত একটি নাটক দেখে।

মঙ্গোলিয়ান গুলাশ
মঙ্গোলিয়ান গুলাশ

তারিক আনাম ও সুবর্ণা মুস্তাফা অভিনীত ‘হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ’-এর মাধ্যমে জানা হয় যে গুলাশ হাঙ্গেরির খাবার। পূর্ব ইউরোপের দুপুর ও রাতের প্রধান খাবারই বিফ গুলাশ। চেক রিপাবলিক রাজধানী প্রাগ ভ্রমণেই প্রথম খেয়েছি। খাদ্য, ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান, স্থাপত্যরীতি বহমান। এক ভূখণ্ড থেকে অনায়াসই অন্য ভূখণ্ডে যায়।
মঙ্গোলিয়ান গুলাশ যখন সামনে এল, দেখলাম একটি প্লেটে ভাত (স্টিকি রাইস), ঝোল ঝোল গরুর মাংস, সঙ্গে আলু ভর্তা আর সালাদ। হাঙ্গেরিয়ান গুলাশ কিংবা চেক রিপাবলিকান গুলাশের সঙ্গে মঙ্গোলিয়ান গুলাশের মিল নেই একদম, স্বাদে কিংবা সৌরভে।

যাযাবর পরিবারের সঙ্গে বিকেলের নাশতা

মূল সড়ক থেকে আচমকা ড্রাইভার আর্থ ভিন্ন এক পথ ধরল। এক ঘণ্টা এ রকম পথ চলতে থাকবে, তারপর আসবে যাযাবর পরিবারের গের।

গাড়ি কখনো মাটির পথ দিয়ে যাচ্ছে, কখনো পাথুরে, কখনো ঘাস মাড়িয়ে। গাড়িতে বসে থাকা দায়। এত ঝাঁকুনি! কোথাও কোনো বসতি দেখছি না। ৫-১০ কিলোমিটার পরপর একটি বা দুটি গের। প্রতিটি গেরের সামনে একটি বা দুটি গাড়ি।

পথ কী করে চিনছে আর্থ! কোনো জিপিএস নেই, পথে কোনো মাইলফলক নেই। এ রকম অবাক লেগেছিল সাহারায় তাঁবুবাসের সময়। চলতে চলতে গাড়ি আচমকা বালু-কাঁকরের পথ ধরল। এখানেও একদমই সে রকম। সাহারায় কেবল বালুর ঢিবি ছিল। এখানে তো নানা ধরনের পথ।

এ রকম দেড় ঘণ্টা চলার পর এল আমাদের কাঙ্ক্ষিত গের। একজন নারী ও পুরুষ এসে আমাদের অভিবাদন জানালেন। চেনেতদর্জ আর তাঁর স্ত্রী। দুজনই মঙ্গোল পোশাক পরিধান করে আছেন। বিশাল প্রান্তর। চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে কয়েক শ একর জায়গা। সেখানে তিনটি গের। গেরগুলোর সামনে কয়েকটি ঘোড়া বাঁধা রয়েছে। আর গরু ও বাছুর রাখার একটি জায়গা।

পুরো পরিবারের সঙ্গে
পুরো পরিবারের সঙ্গে

একটি গেরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। বাটিতে দুধ চা, হাতে বানানো গোল রুটি বা পাউরুটি হবে আর বড় একটি গামলায় চিজ পরিবেশন করা হলো। লবণ দেওয়া চা, পামির হাইওয়েতে আমার ভালোই অভিজ্ঞতা হয়েছে। ড্রাইভার আর গাইড কয়েক বাটি পান করল। আমি আর ফাইয়াজ একবাটি চা শেষ করতে পারিনি। যাযাবর পরিবারের অনেক কায়দাকানুন রয়েছে। অতিথিকে সুগন্ধিসহ অভ্যর্থনা জানানো হয়। গেরে প্রবেশেরও নিয়মকানুন আছে। একটি পাথরের ছোট বোতল আমাদের হাতে দেওয়া হলো। সেখান থেকে কাঠিতে করে অল্প সুগন্ধি আমাদের গায়ে দেওয়া হলো।

গেরের দরজাটি বেশ ছোট। আমার মতো কম উচ্চতার মানুষকেও মাথা নিচু করে প্রবেশ করতে হলো। দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর বাঁ দিক দিয়ে গেরে প্রবেশ করতে হবে। গেরের ভেতরটি বেশ রঙিন।

গেরের ভেতরটি বেশ রঙিন
গেরের ভেতরটি বেশ রঙিন

মঙ্গোলীয় যাযাবরদের গের বা গোল তাঁবু, যে নামেই ডাকি না কেন, দেয়াল আর ছাদ ভেড়ার উল দিয়ে ঠাসা, শীতের সময় তাঁবু গরম রাখে। মেঝেতেও উলের কার্পেট। মেঝে, খাট সব জায়গাতেই উলের কার্পেট বিছানো। গেরের ঠিক মাঝখানে একটা উনুন বা ফায়ারপ্লেস, তার লম্বা চিমনি ছাদের মাথা ফুঁড়ে বাইরে বেরিয়ে থাকে, যাতে ধোঁয়া একেবারে বাইরে বেরিয়ে যায়। উনুনের আশপাশে রান্না, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি আর দেয়াল ঘেঁষে দু-তিনটে খাট; মোটা উলের লেপ, তোশকসমেত।

একসঙ্গে বসে গল্প করলাম অনেকক্ষণ। আমাদের মধ্যে দোভাষীর কাজ করছে তুসিনতুর। জানলাম, এই পরিবারের ঘোড়া রয়েছে ১০০টি আর গরু-ছাগল রয়েছে হাজারের বেশি। সব বাইরে খাবার খেতে গেছে। ভোরে ফিরে আসবে। এই যাযাবর পরিবারের গ্রীষ্মকালীন আবাস এটি। শীতের সময় তারা অন্যত্র চলে যায়। নোমাড পরিবারগুলো বছরে চারবার বসত পরিবর্তন করে। এসব অস্থায়ী গের বানাতে দুঘণ্টা সময় লাগে, আর উঠিয়ে নিতে সময় লাগে আধঘণ্টা। জীবন ও অবস্থার প্রয়োজনে কত কিছুই করতে হয়!

রেস্টরুম আর বাথরুম নেই। সে ক্ষেত্রে জঙ্গলই ভরসা। খাবার পানিরও সংকট আছে। গাইড আমাদের জন্য খাবার পানি নিয়ে এসেছে। বলতে ভুলে গেছিলাম, আমরা যেখানে লাঞ্চ করেছি, সেখান থেকে তুসিনতুর পাঁচ লিটারের অনেকগুলো খাবার পানির বোতল কিনেছে। এখন বুঝতে পারছি, কেন। ঘড়িতে ৫টা বাজে, কিন্তু দুপুর ১২টার মতো রোদের তাপ। এই পরিবারের দুটি শিশুও রয়েছে। চেনেতদর্জের নাতি। গ্রীষ্মের ছুটিতে দাদা-দাদির কাছে বেড়াতে এসেছে। (চলবে)

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৫: ০০
বিজ্ঞাপন