
৫৩ বছরের বেশি সময় পর আবারও চাঁদের গেলেন মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের চার নভোচারী কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলে চড়ে এ ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেন। সর্বশেষ চাঁদে নভোচারী গিয়েছিলেন ১৯৭২ সালে। ওই সময় নাসার অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এবার প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের পথে রওনা হলেন। ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের চার নভোচারী হলেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। ১০ দিনের এই মিশনে তাঁরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। এখন সবার মনে প্রশ্ন জাগছে, এই ১০ দিনে তাঁরা খাবেন কী? স্পেসফুড নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা গবেষণা হচ্ছে। অনেক অগ্রগতিও হয়েছে। তবে বলা হচ্ছে, এবারের আর্টেমিস ২–এর খাবারের মেনু হারিয়ে দেবে আগের সব কটিকে। চলুন এ নিয়ে বিস্তারিত জেনে নিই।


আর্টেমিস–২ মিশনে মহাকাশচারীদের সুস্থতা ও কাজের দক্ষতা বজায় রাখার জন্য খাবারগুলো বিশেষভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। চাঁদের চারপাশে এই যাত্রায় কোনো পুনরায় সরবরাহ, ফ্রিজে সংরক্ষণ বা শেষ মুহূর্তে খাবার যোগ করার সুযোগ নেই। তাই প্রতিটি খাবার এমনভাবে বাছাই করা হয়, যাতে তা দীর্ঘদিন ভালো থাকে, নিরাপদ থাকে এবং নাসার ওরিয়ন মহাকাশযানে সহজে তৈরি করা ও খাওয়া যায়। মহাকাশ খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও মহাকাশচারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে খাবারের তালিকা তৈরি করা হয়, যাতে ক্যালরি, পানি গ্রহণ ও পুষ্টির ভারসাম্য ঠিক থাকে এবং ব্যক্তিগত পছন্দও বিবেচনায় আসে।
নিচে আর্টেমিস–২ মিশনের খাবার–পরিকল্পনা নিয়ে কিছু মজার তথ্য ও সহজ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
মিশনের জন্য খাবার বাছাই ও প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনা করা হয়
খাবার নির্বাচন করার সময় এর সংরক্ষণক্ষমতা, নিরাপত্তা, পুষ্টিগুণ, মহাকাশচারীদের পছন্দ এবং ওরিয়ন মহাকাশযানের ওজন, জায়গা ও বিদ্যুৎ–ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য—সবকিছু বিবেচনা করা হয়। খাবার এমন হতে হয়, যাতে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে সহজে খাওয়া যায়, টুকরা কম পড়ে এবং পুরো মিশনে নিরাপদ থাকে। খাবার প্যাকিং করার অনেক আগেই মহাকাশচারীরা এ বিষয়ে মতামত দেন।

প্রতিদিনের খাবারের তালিকা কীভাবে সাজানো হয়
সাধারণ দিনে (লঞ্চ ও পৃথিবীতে ফেরার দিন ছাড়া) মহাকাশচারীদের জন্য সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারের নির্দিষ্ট সময় থাকে। প্রতিদিন প্রত্যেকে দুটি স্বাদযুক্ত পানীয় পায়, যার মধ্যে কফিও থাকতে পারে। তবে মহাকাশযানে কতটা খাবার ও পানীয় নেওয়া যাবে, তার সীমাবদ্ধতা থাকায় পানীয়র বিকল্পও সীমিত থাকে।
আর্টেমিস–২-তে তাজা খাবার নেওয়া হচ্ছে না, কারণ ওরিয়নে ফ্রিজ বা শেষ মুহূর্তে খাবার তোলার ব্যবস্থা নেই। তাই দীর্ঘদিন ভালো থাকে—এমন খাবার ব্যবহার করা হয়, যা নিরাপত্তা বজায় রাখে এবং শূন্য মাধ্যাকর্ষণে খাবারের কণা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমায়।
আর্টেমিস-২–এর খাবার কীভাবে আলাদা
আর্টেমিস-২-এর খাবারের পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের উন্নয়নের ফল। এর আগে অ্যাপোলো মিশনে খাবারের বৈচিত্র্য কম ছিল। পরে স্পেস শাটলে খাবারের অপশন বাড়ে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নিয়মিত সরবরাহ পাওয়ায় মাঝেমধ্যে তাজা খাবারও পাওয়া যায়। কিন্তু আর্টেমিস-২-তে কোনো পুনরায় সরবরাহ নেই, তাই আগে থেকেই নির্ধারিত খাবারের তালিকা ব্যবহার করা হয়।

এখানে ৫ ধরনের হট সস আর ১০ ধরনের পানীয় রাখা হয়েছে নানা সুস্বাদু মিলের সঙ্গে। কফি, গ্রিন টিসহ নানা ফল ও ডেইরি বেজড স্মুদি আছে মেনুতে।


বার–বি–কিউ বিফ ব্রিস্কেট থেকে শুরু করে ক্ল্যাসিক ম্যাকারনি-চিজ আছে এই মেনুতে। সেই সঙ্গে কুসকুস আর বাদামের মতো হেলদি অপশন রাখা হয়েছে। মাঝেমধ্যে জাংক ফুডের জন্য মন কাঁদলে পাওয়া যাবে সসেজ, স্ট্রবেরি, পিনাট বাটার।
মহাকাশচারীরা নিজেদের খাবার বাছাইয়ে কতটা ভূমিকা রেখেছেন
আর্টেমিস-২-এর মহাকাশচারীরা সরাসরি খাবার বাছাইয়ে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা আগে থেকেই বিভিন্ন খাবার চেখে দেখেন, মূল্যায়ন করেন এবং মতামত দেন। এরপর পুষ্টিগত চাহিদা ও মহাকাশযানের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মিলিয়ে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়। প্রত্যেকের জন্য দু–তিন দিনের খাবার একসঙ্গে একটি প্যাকেটে রাখা হয়, যাতে তাঁরা নিজের মতো করে বেছে খেতে পারেন।


মিশনের বিভিন্ন ধাপে খাবারের তালিকা কীভাবে বদলাবে
মহাকাশযানের সক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন ধাপে খাবার নির্বাচন করা হয়। যেমন কিছু খাবার পানির সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করতে হয়, যা সব সময় সম্ভব নয়— বিশেষ করে লঞ্চ ও অবতরণের সময়। তাই ওই সময়ের জন্য প্রস্তুত খাবার রাখা হয়। পরে যখন সব ব্যবস্থা চালু থাকে, তখন বেশি বৈচিত্র্য পাওয়া যায়।
ওরিয়ন ক্যাপসুলে খাবার কীভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে
এখানে খাবার হয় সরাসরি খাওয়ার মতো, পানি দিয়ে তৈরি করার মতো, তাপে সংরক্ষিত বা বিশেষ বিকিরণে জীবাণুমুক্ত করা। মহাকাশচারীরা পানির ডিসপেনসার দিয়ে খাবার তৈরি করেন এবং ছোট একটি হিটার দিয়ে প্রয়োজন হলে গরম করেন।

মহাকাশযানের জন্য খাবার তৈরি করতে কী কী চ্যালেঞ্জ থাকে
ওরিয়নের মতো ছোট ও সীমিত জায়গার মহাকাশযানে খাবার তৈরি করতে হলে পুষ্টি, নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়। একই সঙ্গে ওজন, জায়গা ও বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতাও মানতে হয়। খাবার এমন হতে হয়, যাতে সহজে সংরক্ষণ, প্রস্তুত ও খাওয়া যায় এবং টুকরো বা বর্জ্য কম হয়। তাই বেশির ভাগ খাবারই সহজে খাওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়, যাতে মহাকাশযানের কাজেও কোনো সমস্যা না হয়।
সূত্র: নাসা ডট গভ, প্রথম আলো, বিবিসি
ছবি: ইনস্টাগ্রাম