
একসময় একদম প্রান্তিক কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের প্রধান খাবার ছিল এই কালাইয়ের রুটি। জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিয়াড় নামক এলাকায় প্রথম কালাই রুটি তৈরি শুরু হয়। পরে এটি উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের অনেক অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।
একবার খেলে অনেকক্ষণ ক্ষুধা থেকে দূরে থাকা যায় বলে একসময় কৃষকের দিন শুরু হতো কালাই রুটি দিয়ে। ভোর হতেই খালি পেটে কাজে চলে যাওয়া কৃষকদের স্ত্রীরা এই কালাই রুটি তৈরি করে নিয়ে যেতেন মাঠে। তৃপ্তি সহকারে একসঙ্গে খেতেন মরিচ বা ভর্তা দিয়ে। এভাবেই কালাই রুটির বিস্তৃতি বলে জনশ্রুতি।

মজার ব্যাপার হলো এটি একপ্রকার রুটি হলেও অন্যান্য রুটির মতো এটা বানাতে বেলন–পিঁড়ির প্রয়োজন নেই। কালাইয়ের রুটি বানাতে শুরুতে মাষকালাই ও আতপ চাল একসঙ্গে পিষে আটা বানানো হয়। এর সঙ্গে প্রয়োজনমতো লবণ ও পানি মিশিয়ে তৈরি খামির থেকে ছোট ছোট বলের মতো করা হয়। তারপর দুই হাতের তালু দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বড় রুটি বানানো হয়। রুটিকে তাওয়াতে সেঁকে গরম করা হয় আর রং বাদামি হয়ে গেলে নামিয়ে নেওয়া হয় চুলা থেকে। অভিজ্ঞ হাত ছাড়া কালাই রুটিতে আসল স্বাদ আনাটা একটু কষ্টসাধ্যই বটে।

কালাই রুটি দিয়ে শুধু ক্ষুধাই মেটে না, বরং এটি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি খাবার। কালাই রুটির মূল উপাদান কালাইয়ের ডালে রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন বি, আয়রন। এ ছাড়া প্রচুর ফাইবার থাকায় হজম ভালো হয়।
ঘরোয়া খাবার থেকে কালাই রুটি হয়ে উঠেছে সকাল-সন্ধ্যার গল্প-আড্ডার অনুষঙ্গ। কালাই রুটিকে কেন্দ্র করে চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে কর্মসংস্থান। রাজশাহী শহরের উপশহরে এ রকমই এক দোকানে কালাই রুটি খেতে খেতে কথা হচ্ছিল দোকানের এক কর্মচারীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, দিনে ৫০-৬০ কেজি আটার প্রয়োজন হয়।

রাজশাহী শহরের প্রায় সব হোটেলেই একটি কালাই রুটির দাম ২০-৩০ টাকা। রুটির সঙ্গে কাঁচা মরিচের ভর্তা ও ধনেপাতার চাটনি একদমই ফ্রি! বেগুনভর্তার দাম ১০ টাকা। হাঁসের মাংস ১০০ টাকা, হাফ ৬০ টাকা। গরুর মাংস ফুল ১২০ টাকা, হাফ ৭০ টাকা। এক বাটি বটের দাম ৮০ টাকা, হাফ ৫০ টাকা।

কালাই রুটিপ্রেমীদের জন্য ভালো খবর হচ্ছে এখন আপনি রাজশাহী বা উত্তরবঙ্গে না গিয়েও এই রুটির স্বাদ নিতে পারেন। এখন ঢাকাতেও কিছু জায়গায় কালাইয়ের রুটি পাওয়া যায়। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে আছে ‘কালাই ঘর’, শ্যামলী শাহী মসজিদের সামনে ও মিরপুর স্টেডিয়ামের পাশে, নিকুঞ্জ–২–এর ১৬ নম্বর রোডের ‘চাপাই’, উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরেও কালাই রুটি পাওয়া যায়। এগুলোতে হাঁসের মাংস ভুনাসহ অন্য সব ভর্তা দিয়ে কালাইয়ের রুটি খাওয়া যাবে।
ছবি: লেখক