তুরস্কের ৫ পদ: বেড়াতে গেলে অবশ্যই চেখে দেখতে ভুলবেন না
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইউরোপ ও এশিয়ার সংগমস্থলে অবস্থিত এক প্রাচীন ও গৌরবময় রাষ্ট্র তুরস্ক। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে এই দেশকে ঘিরে অপার কৌতূহল ও আগ্রহ। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ঋদ্ধ এই দেশের রন্ধনশিল্প বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে। অনেকেই বলেন, তুর্কি রান্নাঘর পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ রন্ধন ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে, যেমন চীনা, ভারতীয় বা ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি তুর্কি খাবারের রেস্তোরাঁও বিভিন্ন স্থানে আলো ছড়াচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের কাছে তুর্কি খাবারের প্রসঙ্গ উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উত্তপ্ত কয়লার আঁচে শিকে গাঁথা নানাবিধ কাবাব ও ডোনারের মোহনীয় ছবি। ডোনার বললেই মনে হয়, এক জাদুময় ঘূর্ণনে, উল্লম্ব রোটিসারির মাঝে মসলায় দীর্ঘক্ষণ মাখানো সুস্বাদু মাংস রন্ধন চলে। তারপর সেই মাংস, বিভিন্ন প্রকারের সালাদের সঙ্গে সাদা দই-রসুনের সস কিংবা ঝাঁজালো লাল মরিচের সস মাখিয়ে নরম পাতলা পিটা ব্রেডে জড়িয়ে পরিবেশন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আমাদের রসনায় তুর্কি ভোজনের তীব্র ঝাল সে রকম গভীরভাবে স্পর্শ না–ও করতে পারে। আমরা তাদের তুলনায় অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ও মসলাদার খাবারের সঙ্গে সুপরিচিত, সে স্বাদে আমাদের জিব অভ্যস্ত হয়ে আছে।

তুরস্কে লেখক (বাঁ থেকে দ্বিতীয়
তুরস্কে লেখক (বাঁ থেকে দ্বিতীয়

আমাদের দেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার শর্মার সঙ্গে ডোনারের মাংস প্রস্তুতির পদ্ধতিতে কিছুটা মিল লক্ষ করা যায়। শর্মার সঙ্গে ডোনার কাবাবের কিঞ্চিৎ সাদৃশ্য অনেকেই হয়তো খুঁজে পেতে পারেন; তবে ডোনার তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বলতে গেলে ডোনার আজ বিশ্বে তুর্কি খাবারের অন্যতম প্রধান পরিচায়ক হয়ে উঠেছে।
বললে অত্যুক্তি হবে না, তুরস্কের সমৃদ্ধ হেঁসেলে ডোনার মামুলি একটি বিন্দুমাত্র। তুরস্কের প্রতিটি অঞ্চল নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ। এখানে এমন পাঁচটি পদ নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলোর সঙ্গে পরিচয় বাইরের দুনিয়ায় হয়তো সেভাবে নেই। অথচ তুরস্ক ভ্রমণে এই পঞ্চপদ না খেলে জীবন বোধকরি ষোলোআনাই মিছে হয়ে যাবে বলেই মনে হয়।

বিজ্ঞাপন

কাল্লা পাচা

কাল্লা পাচা মনে করিয়ে দেয় তুরস্কের রন্ধনশিল্পের বৈচিত্র। একে এক ধরনের স্যুপ বলা যেতে পারে; পুষ্টিকর ও উপাদেয়। ভেড়া বা ছাগলের মাথা ও পা দিয়ে তৈরি করা হয়। অনন্য স্বাদের। কনকনে শীতের সকালে দেবে উষ্ণতা। আবার অসুস্থতার ক্লান্তিকর সময়ে কাল্লা পাচা প্রাণে আনবে নতুন উচ্ছ্বাস। কারণ, এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে প্রচুর কোলাজেন ও প্রোটিনের ভান্ডার। এই খাবারটি আমাদের দেশের নেহারির দূর–সম্পর্কের এক আত্মীয়ের মতো; তবে নেহারির তীক্ষ্ণ মসলার ঝাঁজ এতে নেই। নেহারিতে বড় বড় নল্লি, রগ, ক্ষুর বা গিঁটের দেখা মেলে; কেল্লা পাচায় সেটা নয়; বরং মাংস, রগ কিংবা মগজের ছোট ছোট টুকরাগুলো ঝোলের মাঝে খেলা করে।

কাল্লা পাচা একপ্রকার স্যুপ
কাল্লা পাচা একপ্রকার স্যুপ

আমাদের দেশে নেহারি তৈরিতে গরু বা ছাগলের মাথার মাংস ব্যবহৃত হয় না, কিন্তু উত্তর ভারত ও পাকিস্তানে নেহারি রান্নায় পায়ের সঙ্গে মাথা ও মগজের ব্যবহার দেখা যায়।
কাল্লা পাচা তৈরির প্রক্রিয়া যেন এক ধৈর্যের পরীক্ষা। প্রথমে ভেড়া বা ছাগলের মাথা ও পা অতি যত্নে পরিষ্কার করা হয়। এরপর লবণ, রসুন আর কখনো কখনো পেঁয়াজের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সেদ্ধ করা হয়। ফলে তৈরি হয় এক গাঢ়, জেলির মতো ঝোল, যা জিহ্বায় স্পর্শ করলেই স্বাদের স্ফুরণ ঘটায়। কখনো ঝোলের ঘনত্ব বাড়াতে ডিমের কুসুম বা ময়দা দেওয়া হয়, যা স্বাদে আনে আরও গভীরতা। পরিবেশনের সময় দেওয়া হয় লেবুর রস। সেই অম্লতা সঙ্গে রসুনের সসের ঘ্রাণ আর শুকনা মরিচ মিলে স্বাদের এক অন্য রকম মেলবন্ধন তৈরি করে।

উত্তর ভারতের আওয়াধে নেহারি ছিল শ্রমজীবী মানুষের প্রাণের খোরাক। ফজরের নামাজের পর ভোরের আলোয় যখন নেহারির সৌরভ রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত, তখন শরীরে চনমনে হয়ে উঠত। কেননা, ফজরের নামাজের পর এক পাত্র নেহারি শ্রমিকদের দিনের লম্বা একটা সময় কঠোর পরিশ্রমের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাত, যাতে তারা নির্দ্বিধায় কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন। আশ্চর্যের বিষয়, কেল্লা পাচাও তুরস্কের শ্রমজীবী সমাজে নেহারির মতোই সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নেহারির মতো এটাও দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে জ্বাল দিয়ে রান্না করা হয়। যেটাকে পরিভাষায় বলা যায় স্লো কুকিং পদ্ধতি। সকালের নাশতায় অনেকের স্বাদকোরক উদ্বেল করে থাকে এই স্যুপ, যেটা কিনা এখন শ্রমজীবীদের পাত ছাড়িয়ে অভিজাতদের পাতে জায়গা করে নিয়েছে। এর স্বাদে আছে শ্রমের গৌরব আর সরল জীবনের এক অনন্য মিশেল।
ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৫, ১৪: ৩০
বিজ্ঞাপন