ঢাকাস বেস্ট ব্রেড: রুটির ঘ্রাণে ঐতিহ্য, স্বাদে নতুনত্ব
শেয়ার করুন
ফলো করুন

রুটির গল্প শুধু ময়দা, পানি আর খামিরের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সময়, ধৈর্য, কারুশিল্প আর নানা সংস্কৃতির খাদ্যঐতিহ্য। সেই গল্পকে নতুনভাবে তুলে ধরতে ঢাকায় যাত্রা শুরু করেছে ‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’। আধুনিক বেকিং কৌশলের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী প্রস্তুতপ্রণালির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের উদ্বোধন হয়েছে ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব রুটি দিবসে। রাজধানীর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টের ‘কানেকশনস’ রেস্তোরাঁয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে অতিথিরা চেখে দেখেন বিভিন্ন ধরনের রুটি।

বিজ্ঞাপন

সময় নিয়ে তৈরি, স্বাদে স্বতন্ত্র

‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’-এর মূল আকর্ষণ হ্যান্ডক্র্যাফটেড রুটি। সাওয়ারডো, ব্যাগেটসহ বিভিন্ন ধরনের রুটি তৈরিতে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উপকরণের মান, প্রাকৃতিক গাঁজন, প্রস্তুতপ্রণালির সূক্ষ্মতা এবং স্বতন্ত্র স্বাদের ওপর। প্রতিটি রুটির রয়েছে নিজস্ব গঠন, ঘ্রাণ ও স্বাদের বৈশিষ্ট্য।

এখানে সব রুটিই হ্যান্ডক্র্যাফটেড
এখানে সব রুটিই হ্যান্ডক্র্যাফটেড

এই উদ্যোগের নেতৃত্বে আছেন প্রধান বেকার ও পেস্ট্রি শেফ ফিলিপ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি রুটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহ্যবাহী বেকিং পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, প্রতিটি রুটির নিজস্ব চরিত্র আছে। সেই বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে প্রকৃত স্বাদের অভিজ্ঞতা তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য।

অতিথিদের বিভিন্ন রুটির স্বাদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে শেফ ফিলিপ বলেন, ‘কানেকশনস’ এমন একটি জায়গা, যেখানে প্রতিটি রুটি নিজের গল্প বলে। অতিথির সঙ্গে স্বাদের সংযোগস গড়ে তোলে।

বিজ্ঞাপন

খামিরের যত্নে ধৈর্যের পরীক্ষা

কারুশিল্পনির্ভর রুটি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সময়। বিশেষ করে সাওয়ারডো তৈরিতে প্রাকৃতিক গাঁজনের জন্য ব্যবহৃত আদি খামির বা ‘মাদার ডো’-এর পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খামিরের গুণমান, পরিচর্যা ও গাঁজনের প্রক্রিয়া রুটির স্বাদ, ঘ্রাণ ও গঠনে প্রভাব ফেলে।

অনুষ্ঠানে অতিথিরা
অনুষ্ঠানে অতিথিরা

আইএইচজি হোটেলসের ক্লাস্টার জেনারেল ম্যানেজার অশ্বিনী নায়ার জানান, ‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’-এর প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। বেকারির কার্যক্রম শুরুর প্রথম দিন থেকেই শেফ ফিলিপ প্রাকৃতিক গাঁজনের জন্য ব্যবহৃত আদি খামিরের পরিচর্যা করে আসছেন।

অশ্বিনী নায়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, খামিরকে যথোপযুক্ত করে তুলতে শেফ ফিলিপ ছয় থেকে আট মাস সময় দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তাড়াহুড়া করে ব্যবহার না করে দীর্ঘ সময় ধরে এর পরিচর্যা করার পরিকল্পনা ছিল ফিলিপের। এই আদি খামিরের ব্যবহার ও পরিচর্যা আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর, এমনকি তারও বেশি সময় ধরে চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে তাঁদের।

এই দীর্ঘ প্রস্তুতির ভাবনাই উদ্যোগটির বিশেষত্বকে প্রতীয়মান করে। এখানে দ্রুত উৎপাদনের চেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রক্রিয়ার প্রতি যত্ন, ধারাবাহিকতা এবং রুটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলা।

‘ইওর ব্রেড, ইওর ওয়ে’: পছন্দ যখন নিজের

রুটির অভিজ্ঞতাকে আরও ব্যক্তিগত করে তুলতে ‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’ নিয়ে এসেছে ‘ইওর ব্রেড, ইওর ওয়ে’ ধারণা। এর মাধ্যমে ক্রেতারা নিজেদের রুচি অনুযায়ী রুটির ধরন, গঠন ও উপকরণ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

কারও পছন্দ নরম রুটি, কেউ পছন্দ করেন মচমচে উপরিভাগ ও ঘন গঠনের রুটি। আবার কারও আগ্রহ মাল্টিগ্রেইন দিয়ে তৈরি রুটিতে। ব্যক্তিগত পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে এই বৈচিত্র্য তৈরির পরিকল্পনা রুটির অভিজ্ঞতায় যোগ করবে নতুন মাত্রা, জানালেন অশ্বিনী নায়ার।

তৈরি করিয়ে নেওয়া যাবে নিজের মতো করে
তৈরি করিয়ে নেওয়া যাবে নিজের মতো করে

সঙ্গে আরও যোগ করলেন, ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী তৈরি প্রাকৃতিক খামির সংরক্ষণ এবং তার আলাদা নাম রাখার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে রুটি তৈরির ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রেতাদের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ এখানে রুটি কেনা শুধু একটি খাদ্যপণ্য বেছে নেওয়ার বিষয় নয়; বরং রুটি তৈরির প্রক্রিয়া, স্বাদ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ।

আট শস্যের রুটিতে বাংলার মধুর ছোঁয়া

‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’-এর বিশেষ পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বেঙ্গল এইট-গ্রেইন হানি হারভেস্ট’। আট ধরনের শস্যের সমন্বয়ে তৈরি এই রুটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ওটস, তিসিবীজ, সূর্যমুখীর বীজ, কুমড়ার বীজ, মিলেট, চিয়াসিড, যব ও তিল।
এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে স্থানীয় মধু, যা রুটিতে এনে দেয় মৃদু মিষ্টতা এবং বাদাম ও মল্টের মতো স্বাদের আভাস। বিভিন্ন শস্যের কারণে এই রুটির গঠনেও রয়েছে বৈচিত্র্য।

এখানে আছে ৮ ধরণের শস্য দিয়ে তৈরি ব্রেড
এখানে আছে ৮ ধরণের শস্য দিয়ে তৈরি ব্রেড

বিভিন্ন ধরনের শস্য ও বীজের সমন্বয় রুটিকে স্বাদ ও টেক্সচারের দিক থেকে আলাদা করে তুলেছে। যারা প্রচলিত সাদা পাউরুটির বাইরে নতুন কিছু খুঁজছেন, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে আকর্ষণীয় বিকল্প।
স্থানীয় মধু ও বিভিন্ন শস্যের ব্যবহারের উদ্যোগটির আরেকটি দিক তুলে ধরে—আন্তর্জাতিক বেকিংয়ের কৌশলের সঙ্গে স্থানীয় উপাদানকে যুক্ত করে নিজস্ব স্বাদ তৈরি করা।

বিনিয়োগ, দক্ষতা ও সহযোগিতার বার্তা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনের উপহাইকমিশনার ও উন্নয়নবিষয়ক পরিচালক জেমস গোল্ডম্যান। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক পরিচালক শাকিব এরশাদ।

বক্তব্যে জেমস গোল্ডম্যান বাংলাদেশে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব, জ্ঞান বিনিময় ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশেও অবদান রাখতে পারে।

বক্তব্য দিচ্ছেন জেমস গোল্ডম্যান; সঙ্গে আছেন অশ্বিনী নায়ার
বক্তব্য দিচ্ছেন জেমস গোল্ডম্যান; সঙ্গে আছেন অশ্বিনী নায়ার

জেমস গোল্ডম্যান ‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’-এর সাফল্য কামনা করেন এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের পারস্পরিক সহযোগিতার একটি উদাহরণ হিসেবে এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিরা বিভিন্ন ধরনের রুটির স্বাদ গ্রহণ করেন। বিশ্ব রুটি দিবসকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উদ্বোধনী আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঢাকার বেকারি সংস্কৃতিতে নতুন একটি সংযোজন হলো।

রুটির স্বাদে নতুন অভিজ্ঞতার সম্ভাবনা

দৈনন্দিন খাবারের অংশ হলেও রুটির রয়েছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। একেক অঞ্চলের রুটি তৈরির কৌশল, উপকরণ, গাঁজনের পদ্ধতি ও পরিবেশনের ধরন একেক রকম। সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে রুটির স্বতন্ত্র পরিচয়।

‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’ সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এখানে গুরুত্ব পাচ্ছে কারুশিল্প, প্রাকৃতিক গাঁজন, বিভিন্ন শস্যের ব্যবহার এবং ক্রেতার ব্যক্তিগত পছন্দ।

ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতিতে নতুন স্বাদের পাশাপাশি রুটি তৈরির প্রক্রিয়া ও কারুশিল্পের প্রতি আগ্রহও বাড়াতে পারে এই উদ্যোগ। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে পণ্যের গুণমান, স্বাদের ধারাবাহিকতা এবং ক্রেতাদের কাছে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলার ওপর।

বিশ্ব রুটি দিবসে যাত্রা শুরু করা ‘ঢাকাস বেস্ট ব্রেড’ তাই শুধু নতুন একটি বেকারির নাম নয়; এটি রুটিকে ঘিরে সময়, ঐতিহ্য ও সৃজনশীলতার গল্প বলার একটি উদ্যোগও।

ছবি: হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০: ৩২
বিজ্ঞাপন