
মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ার রান্নাঘরে যখন কিশোয়ার চৌধুরী পান্তা ভাত, বেগুনভর্তা কিংবা কোরমার মতো খাবার পরিবেশন করছিলেন, তখন তিনি একটি বিষয় খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন—পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে এসব খাবারের কোনো ‘রেফারেন্স পয়েন্ট’ নেই। খাবারের স্বাদ বোঝার আগে তাঁরা জানতেন না এর পেছনের ইতিহাস, সংস্কৃতি কিংবা মানুষের গল্প।

সেই উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ে রূপ নিয়েছে ‘স্মোক, রাইস ওয়াটার: রেসিপিস অ্যান্ড স্টোরিজ ফ্রম আ বেঙ্গলি হোম’ বইয়ে। বহুল প্রতীক্ষিত বইটি প্রকাশের দুই সপ্তাহ আগে শুক্রবার ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেগো রেস্তোরাঁয় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে তিনি শুনিয়েছেন এই বই লেখার গল্প; আর যাঁদের নিয়ে তিনি কাজ করেছেন, তাঁদের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিনি। রেসিপির পাশাপাশি বইটিতে উঠে এসেছে বাঙালির ইতিহাস, স্মৃতি, অভিবাসী জীবন, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গল্প।
অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা কিশোয়ারের কাছে এই বই শুধু একটি কুকবুক নয়; বরং বহুদিনের একটি অপূর্ণতার উত্তর। তাঁর ভাষায়, তিনি সব সময় অনুভব করেছেন যে বিশ্বের বিভিন্ন বুকশপের তাকজুড়ে নানা দেশের রান্না নিয়ে অসংখ্য বই থাকলেও বাঙালি তথা বাংলাদেশি খাবার নিয়ে এমন কোনো বই নেই, যা পাঠককে এই অঞ্চলের মানুষ, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রা সম্পর্ক অবগত করতে পারে।
২০২১ সালে মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়ায় তৃতীয় স্থান অর্জনের মাধ্যমে কিশোয়ার আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান। কিন্তু জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সেই সাফল্য ছিল তাঁর যাত্রার শুরু মাত্র। এরপর তিনি বিভিন্ন পপ-আপ ডিনারের আয়োজন করেছেন, মেলবোর্নের খ্যাতনামা রেস্তোরাঁ ইশিজুকায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, আন্তর্জাতিক নানা প্রকল্পে কাজ করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে বাঙালি খাবারের গল্প ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ‘স্মোক, রাইস ওয়াটার’ সেই দীর্ঘ মিশনেরই নতুন অধ্যায়।
ওয়ার্ল্ড ভিশন অস্ট্রেলিয়ার একটি অ্যাসাইনমেন্টে এক ঝটিতি সফরে ঢাকায় অবস্থানের সুযোগকে হাতছাড়া করতে চাননি তিনি বইটির কথা বাংলাদেশের মানুষদের জানাতে। উল্লেখ্য, এর আগে তিনি ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
রন্ধনশিল্পী পরিচয়ের বাইরেও কিশোয়ার চৌধুরীর পথচলা ছড়িয়ে আছে মানুষের গল্পে। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি কুড়িগ্রামের দুর্যোগপ্রবণ জনপদে দেখেছেন প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। নতুন দক্ষতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে তাঁরা কীভাবে নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনছেন, সেই গল্পই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। অনুষ্ঠানে তাঁর সেই অভিজ্ঞতার ঝলক তুলে ধরা হয় ‘কিশোয়ার’স টাচ অব গোল্ড’ শিরোনামের একটি পর্বে।

ঢাকার প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কিশোয়ার বলেন, বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি বাঙালি থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত। দক্ষিণ এশীয় খাবার বলতে এখনো অনেকের কাছে উত্তর ভারতীয় খাবার, বাটার চিকেন কিংবা বলিউড-প্রভাবিত সংস্কৃতিই বেশি পরিচিত। অথচ বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতি স্বতন্ত্র, বৈচিত্র্যময় এবং ইতিহাসে সমৃদ্ধ।
মাস্টারশেফে অংশ নেওয়ার সময় এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল একটি রেসিপি পরিবেশন করলেই হবে না; খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পও বলতে হবে। কারণ, খাবার কখনোই শুধু খাবার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি, অভিবাসনের অভিজ্ঞতা, ভূগোল, ইতিহাস এবং পরিচয়। এ উপলব্ধিই বইটির মূল শক্তি। ‘স্মোক, রাইস ওয়াটার’ তাই শুধু রান্নার নির্দেশনার সংকলন নয়; এটি এক অর্থে স্মৃতিকথা, সাংস্কৃতিক দলিল এবং অভিবাসী জীবনের বর্ণনা। বইটিতে স্থান পেয়েছে খাবারের উৎপত্তির ইতিহাস, পারিবারিক গল্প, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাদ্য–ঐতিহ্য এবং অস্ট্রেলিয়ান-বাঙালি জীবনের অভিজ্ঞতা।
কিশোয়ারের নিজের জীবনও সেই গল্পের অংশ। অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর মা–বাবা বাংলাদেশের নানা শাকসবজি নিজেরাই চাষ করতেন। কারণ, সেগুলো সহজে পাওয়া যেত না। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েও তাঁরা বাঙালি রান্নার ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন। ফলে খাবারের টেবিল হয়ে উঠেছিল পরিচয় ধরে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বইটিতে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও রয়েছে।

ব্যক্তিগতভাবে বইটি কিশোয়ারের জন্য আরও আবেগঘন। মায়ের মৃত্যুর মাত্র দুই মাস পর তিনি বইটির কাজ শুরু করেন। সে সময় তিনি নিজের শিকড়, পরিবার এবং উত্তরাধিকারের দিকে নতুন করে ফিরে তাকান। তাঁর ভাষায়, বইটি লেখা ছিল অনেকটা ‘ঘরে ফেরা’র মতো—এমন কিছু তৈরি করা, যা তাঁর সন্তানদের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও একটি খাঁটি বাঙালি কণ্ঠস্বর হিসেবে রয়ে যাবে।
বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা। শুরু থেকেই কিশোয়ার চেয়েছিলেন বাংলাদেশের গল্প বাংলাদেশিরাই বলুক। তাই ফটোগ্রাফি থেকে অলংকরণ—সব ক্ষেত্রেই তিনি বাংলাদেশি শিল্পী ও সৃজনশীল কর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছেন, যাতে বইয়ের প্রতিটি ছবি ও নকশায় দেশের বাস্তবতা ও অনুভূতি ফুটে ওঠে। বইটির প্রকাশক হার্ডি গ্রান্টকে সেটা বোঝাতে বেগ পেতে হলেও সমর্থ হয়েছেন বলেও জানান তিনি। ফলে ঢাকার আতা মোহাম্মদ আদনান ও কলকাতার রানা পান্ডের অনবদ্য সব ছবি এই বইয়ের জৌলুশ বাড়িয়েছে; খাবারের ছবিগুলো তুলেছেন আরমেলে হাবিব। তবে বলতেই হয় কুকবুকে অলংকরণে নতুন মাত্রা এনেছে ঢাকাইয়া। বইটির ডিজাইন করেছেন আকি চ্যান।

অনুষ্ঠানে বইটির বাংলা অনুবাদের সম্ভাবনা নিয়েও কথা ওঠে। কিশোয়ার জানান, বইটির স্বত্ব বর্তমানে প্রকাশকের হাতে। তবে পাঠকদের মধ্যে পর্যাপ্ত আগ্রহ ও চাহিদা তৈরি হলে বাংলা অনুবাদ প্রকাশের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে অবশ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বইটি শুধু অতীত সংরক্ষণের প্রচেষ্টা নয়, বরং পাঠকদের জন্য একটি আমন্ত্রণও। কারণ, কিশোয়ার চান পাঠকেরা রেসিপিগুলো অনুসরণ করার পাশাপাশি নিজেদের মতো করে সেগুলোকে নতুনভাবে আবিষ্কার করুক। তাঁর মতে, রান্না কোনো স্থির বিষয় নয়; বরং এটি ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকা একটি সাংস্কৃতিক ভাষা। তাই তিনি পাঠকদের উৎসাহিত করেন মসলা, উপকরণ কিংবা স্বাদের সঙ্গে নিজেদের মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে।

সবশেষে কিশোয়ারের আশা, ‘স্মোক, রাইস ওয়াটার’ পড়ার পর পাঠক শুধু নতুন কিছু রেসিপিই শিখবেন না; বরং পৃথিবীর এমন একটি অঞ্চল এবং মানুষের গল্প জানবেন, যাদের খাবার প্রতিদিন প্রায় ৩০ কোটি মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে। ধোঁয়া, ভাত আর জলের সরল উপমার ভেতর দিয়ে বইটি শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে একটি জাতির স্মৃতি, পরিচয় এবং আত্মকথার দলিল।
ছবি: রেমিনিসেন্স