
কফির সুবাসে তিরামিসুর ওপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে কোকোর গুঁড়া। চারপাশে কফির ঘ্রাণ, মাসকারপোনের মোলায়েম সুবাস আর সদ্য সাজানো ইতালীয় খাবারের গন্ধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম আবহ। ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রেনেসন্স ঢাকার বাহার রেস্তোরাঁয় এভাবেই শুরু হলো ইতালীয় উইকেন্ড থিম নাইট ‘বুয়োন আপেতিতো’।

ইতালীয় ভাষায় বুয়োন আপেতিতো অর্থ ‘সুন্দর ভোজের শুভেচ্ছা’—আমাদের ‘আহার শুভ হোক’-এর মতোই। ৩ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার বাহার হয়ে উঠছে ইতালির নানা অঞ্চলের খাবারের এক ছোট্ট ভ্রমণ।
ইতালিতে খাবার শুধু খাবার নয়, এটি সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার, আড্ডা, দীর্ঘ সময় ধরে একসঙ্গে টেবিলে বসে থাকা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা রান্নার রেসিপি—সব মিলেই তৈরি হয়েছে দেশটির সমৃদ্ধ খাদ্য ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে ঢাকার ভোজনরসিকদের সামনে তুলে ধরতেই লাল ফিতা কেটে নয়, বরং তিরামিসুর ওপর কফি ডাস্টিংয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হলো এই আয়োজন।
তিরামিসু ইতালির অন্যতম জনপ্রিয় ডেজার্ট। কফি, মাসকারপোন, লেডিফিঙ্গার বিস্কুট ও কোকোর স্তরে তৈরি এই মিষ্টান্নের বর্তমান রূপ অবশ্য খুব পুরোনো নয়। এর উৎপত্তি নিয়ে নানা মত থাকলেও বিংশ শতাব্দীতে ইতালীয় খাবারের সংস্কৃতিতে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ইতালির সীমানা পেরিয়ে তিরামিসু হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ডেজার্ট।
এই আয়োজনেও তিরামিসু কেবল খাবারের শেষ পদ নয়; বরং পুরো ইতালীয় অভিজ্ঞতার সূচনাপর্বেই তাকে রাখা হয়েছে। বিশাল তিরামিসুর ওপর কফি ডাস্টিংয়ের ছোট্ট এই রিচুয়ালটি সন্ধ্যার শুরুটাকেই করে তুলেছে বেশ আকর্ষণীয়।
ইতালীয় খাবারের সৌন্দর্যের একটি বড় জায়গা তার সরলতায়। ভালো উপকরণকে অতিরিক্ত সাজসজ্জার আড়ালে না রেখে তার নিজস্ব স্বাদকে সামনে রাখাই এই রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাহারের বুফেতেও সেই দর্শনের ছাপ পাওয়া যায়।

শুরুতেই ছিল সদ্য বেক করা আর্টিজান ব্রেড। সঙ্গে দুই ধরনের বাটার—সল্টেড ও অরিগানো মিক্স। এরপর একে একে আসতে থাকে নানা ধরনের অ্যান্টিপাস্তি বা স্টার্টার। ছোট ছোট প্লেটে সাজানো এসব পদ মূল খাবারের আগে ক্ষুধাকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলে। পনির, সবজি, মাংস ও নানা উপকরণের বৈচিত্র্য ইতালির আঞ্চলিক খাবারের গল্পও মনে করিয়ে দেয়।
এরপর আসে পাস্তা। ইতালীয় খাবারের কথা বললে পাস্তা বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। বাহারের লাইভ কুকিং স্টেশনে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পাস্তা তৈরি করিয়ে নেওয়ার সুযোগটি এখানে বাড়তি আনন্দ যোগ করেছে। নিজের চোখের সামনে রান্না হচ্ছে, রান্নার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, আর কয়েক মুহূর্ত পর সেই গরম পাস্তাই এসে পৌঁছাচ্ছে প্লেটে—বুফে অভিজ্ঞতার মধ্যে এই অপেক্ষাটুকু খাবারকে যেন আরও ব্যক্তিগত করে তোলে।

হোয়াইট সস, রসুন, অরিগানো, বাটার ও মাশরুমের সমন্বয়ে তৈরি পাস্তাটির স্বাদ ছিল বেশ মোলায়েম ও প্রশান্তিদায়ক। তবে পাস্তার সঙ্গে চিজের পর্যাপ্ত উপস্থিতি না থাকাটা কিছুটা চোখে পড়েছে।
ইতালীয় ফিস্টে রিসোত্তোও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। ধীরে ধীরে রান্না করা ভাতের মতো দেখতে এই খাবারের ক্রিমি টেক্সচার ও গভীর স্বাদ ইতালীয় রান্নার ধৈর্যের গল্প বলে। কিন্তু আয়োজনের প্রথম দিন রিসোত্তোর অনুপস্থিতি রিসোত্তোপ্রেমীদের কিছুটা হতাশ করেছে।
অন্যদিকে কাঠের আগুনে তৈরি ইতালীয় ক্লাসিক, গ্রিল করা সি-ফুড ও মাংসের বিভিন্ন পদ বেশ ভালো ছিল। ইলেকট্রিক ওভেনে তৈরি কিছু পদও স্বাদে হতাশ করেনি।
স্যুপে চমক
ইতালীয় খাবারের বৈচিত্র্য সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় এর আঞ্চলিক পদগুলোতে। উত্তরের ক্রিমি রিসোত্তো থেকে দক্ষিণের টমেটোভিত্তিক রান্না, উপকূলের সামুদ্রিক খাবার থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের পনির—প্রতিটি খাবারের পেছনে রয়েছে আলাদা ভূগোল, ইতিহাস ও জীবনযাপন।
এই বৈচিত্র্যের মধ্যে জুপ্পা দি আরাগোস্তা; এটা ইতালির ট্র্যাডিশানাল লবস্টার সুপ। যদিও এখানে অন্যান্য সামুদ্রিক উপকরণ যোগ হয়েছে। এছাড়া মিনেস্ত্রোন ছিল উল্লেখ করার মতো। দুটিই ছিল উষ্ণ, সুস্বাদু এবং ইতালীয় স্বাদের চমৎকার প্রতিফলন।

মূল খাবারের তালিকায় আরও ছিল ব্রেইজড শর্ট রিবস, মিনি চিকেন রুলাডো, পোমোদোরো কুলির সঙ্গে গ্রিল করা পুরভরা ক্যালামারি, ইতালিয়ান লেমন হার্ব রাইস, এগপ্লান্ট পারমাজিন, চিজ ক্যালজোনি, ফ্রিতো মিস্টো, আরানচিনি—পনির ও আলুর বল—এবং বিভিন্ন ধরনের পিজা।

তবে পুরো আয়োজনের সঙ্গে একটি লাইভ পিজা স্টেশন থাকলে অভিজ্ঞতাটি আরও পূর্ণতা পেত বলেই মনে হয়েছে। ইতালীয় খাবারের এমন একটি আয়োজনে অতিথির সামনে পিজা তৈরি ও বেক হওয়ার দৃশ্য নিঃসন্দেহে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করতে পারত।

তিরামিসুর পাশাপাশি ডেজার্ট স্টেশনে ছিল প্যানা কোটা, তোর্তা কাপ্রেসে, পিস্তাশিও ক্যানোলি এবং ইতালিয়ান ক্রেম ব্রুলে। প্রতিটির স্বাদ আলাদা, কিন্তু খাবারের শেষে তৈরি হওয়া তৃপ্তিটা একই।
বিশেষ করে কফির সুবাসে শুরু হওয়া সন্ধ্যা যখন আবার তিরামিসুর কাছে ফিরে আসে, তখন পুরো খাবারের অভিজ্ঞতাটি যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে।
পানীয়ের তালিকায় থাকা দুটি ইতালীয় পানীয়—ফোগোলা ক্রিস্প ও ব্লু এম্পলিফ সানরাইজ—ছিল বেশ উপভোগ্য।

শুধু বুফে নয়, ইতালির এক টুকরো অভিজ্ঞতা
ইতালীয় রান্নার শিকড় প্রাচীন রোমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। শস্য, জলপাই, আঙুর, পনির, মাছ এবং নানা সুগন্ধি হার্ব দেশটির খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সময়ের সঙ্গে রান্নার ধরন বদলেছে, অঞ্চলভেদে পেয়েছে আলাদা স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খাবারকে ঘিরে আনন্দ, আড্ডা এবং একসঙ্গে বসে খাওয়ার সংস্কৃতিটি রয়ে গেছে।
‘বুয়োন আপেতিতো’ তাই শুধু একটি বুফে আয়োজন নয়; খাবারের মাধ্যমে ইতালিকে একটু কাছে থেকে চেনার সুযোগও। পরিবার নিয়ে দীর্ঘ সময় টেবিলে বসা, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে একের পর এক পদ চেখে দেখা কিংবা অফিসের ব্যস্ততার বাইরে সহকর্মীদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো—সবকিছুর জন্যই আয়োজনটি বেশ উপযোগী।
প্রতি বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার রাতের এই আয়োজনের মূল্য ৩,৯৫০ টাকা নেট জনপ্রতি। নির্বাচিত ব্যাংক কার্ডধারী, জিপি স্টার সদস্য, বাংলালিংক অরেঞ্জ ক্লাব গ্রাহক এবং দলগত বুকিংয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়; অর্থাৎ, ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও যদি কয়েক ঘণ্টার জন্য ইতালির টেবিলে বসার মতো একটি অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাহলে ‘বুয়োন আপেতিতো’ হতে পারে সেই ছোট্ট ভ্রমণের একটি বেশ উপভোগ্য ঠিকানা।
ছবি: রেনেসন্স ঢাকা গুলশান হোটেল ও হাল ফ্যাশন