
পেশাদার শেফ হিসেবে জসীম উদ্দিনের যাত্রা ২০০৫ সালে। হোটেল ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড হসপিটালিটি বিষয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যে। কোর্স শেষ করে প্রায় তিন বছর সেখানে বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর পেশাগত জীবনের ভিতকে আরও শক্ত করেছে। পরে দেশে ফিরে কাজ করেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন নামকরা হোটেলে। বর্তমানে তিনি কর্মরত আছেন হায়াত প্লেস ঢাকা উত্তরা’য় হেড শেফ হিসেবে। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের বাইরের ও ভেতরের বিভিন্ন জায়গায় কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে রান্নার জগতে আরও পরিণত করেছে।

তবে রান্নার প্রতি ভালোবাসাটা একেবারে ছোটবেলা থেকে তৈরি হয়নি। প্রয়োজনের তাগিদে টুকটাক রান্না করলেও পেশাদার জীবনে আসার পর ধীরে ধীরে রান্নাই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়, ভালোবাসা।

কোরবানির ঈদের কথা উঠতেই যেন ফিরে গেলেন শৈশবের দিনগুলোতে। শরীয়তপুরে কেটেছে তাঁর ছেলেবেলার দিনগুলো।বড় পরিবার, বাড়িভর্তি মানুষ আর ঈদের ব্যস্ততা - সব মিলিয়ে অন্যরকম এক আনন্দ ছিল সেই সময়। বাবা প্রতি ঈদেই কোরবানি দিতেন। গ্রামবাংলার পরিবেশে তখন সবচেয়ে বেশি রান্না হতো আলু দিয়ে গরুর মাংসের কারি। তবে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল গরুর কলিজা। গরম পরোটা কিংবা রুটির সঙ্গে সেই কলিজার স্বাদ এখনও তাঁর মনে গেঁথে আছে।
তবে কথা বলতে বলতেই শোনালেন এক বিশেষ স্মৃতির গল্প। ছোটবেলায় এক বন্ধুর বাড়িতে কোরবানির মাংস খেতে গিয়ে প্রথমবার খেয়েছিলেন ঝুরা মাংস, সঙ্গে লাল আটার রুটি। সেই স্বাদ ছিল একেবারেই আলাদা। কৌতূহল থেকে বন্ধুর মায়ের কাছে জানতে চান রান্নার পদ্ধতি। তখনই জানতে পারেন, মাংস আগে মশলা দিয়ে সেদ্ধ করা হয়, পরে শুকিয়ে কাঁচের বয়ামে সংরক্ষণ করা হয়।

সেই সংরক্ষিত মাংস দিয়েই তৈরি করা যায় বালাচাও । শেফ বলেন, একসময় মানুষের ঘরে ফ্রিজ ছিল না। তাই কোরবানির মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই প্রয়োজন থেকেই মানুষ মাংস জ্বাল দিয়ে শুকিয়ে শুঁটকির মতো সংরক্ষণের উপায় বের করেছিল। কেউ কাঁচের বয়ামে রাখতেন, কেউ আবার মাটির হাঁড়িতে মুখ বন্ধ করে মাটির নিচে পুঁতে রাখতেন, যেন ছয় মাস পরও সেই মাংস খাওয়া যায়। আজও তিনি ভুলতে পারেননি তাঁর বন্ধুর মায়ের হাতের বালাচাও আর ঝুরা মাংসের কারির স্বাদ। পরে পেশাদার শেফ হিসেবে কাজ শুরু করার পর এই রেসিপির প্রতিই তাঁর আলাদা টান তৈরি হয়। শিখে নেন বালাচাও তৈরির কৌশল। এখনো এই পদ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় খাবারগুলোর একটি।
তাই কোরবানির বিশেষ পদ বলতে শেফ জসীম উদ্দিন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন গরুর মাংসের বালাচাওকে। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু একটি খাবার নয়, বরং পুরোনো দিনের সংরক্ষণ কৌশল আর শৈশবের স্মৃতিও । শেফ নিজ হাতে রান্না করে দেখালেন এই পদ। বালাচাও তৈরি করা আসলে খুব কঠিন কিছু নয়। এরজন্য প্রথমে চর্বি ছাড়া গরুর মাংস নিতে হয়।


এরপর আদা-রসুন বাটা, গরমমসলা, হলুদ, মরিচ, ধনে ও জিরার গুঁড়া দিয়ে মাংস ভালোভাবে মাখিয়ে অন্তত দুই ঘণ্টা ম্যারিনেট করে রাখতে হয়। তারপর ম্যারিনেট করা মাংস চুলায় বসিয়ে পরিমাণমতো পানি দিয়ে জ্বাল দিতে হয়, যেন মাংস একেবারে নরম হয়ে যায়।



মাংস সেদ্ধ হয়ে গেলে সেটি শুকিয়ে নেওয়ার পালা। এই শুকানোরও রয়েছে দুটি পদ্ধতি। প্যানে অল্প তেলে ভেজে নিতে পারেন , আবার কেউ রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে নেন। এরপর সেই শুকনো মাংস কাঁচের বয়ামে সংরক্ষণ করলে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত ভালো থাকে।


খাওয়ার সময় মাংস ঝুরা করে নিয়ে ভাজা পেঁয়াজ, আদা কুচি, ভাজা রসুন, ধনেপাতা, চিলি ফ্লেক্স, লবণ আর সামান্য শর্ষের তেল মিশিয়ে তৈরি করা হয় বালাচাও। ভাত কিংবা রুটির সঙ্গে এই পদ খেতে দারুণ লাগে। আবার হঠাৎ অতিথি এলেও খুব দ্রুত পরিবেশন করা যায়।

তবে দীর্ঘদিন মাংস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথাও মনে করিয়ে দেন শেফ । মাংস অবশ্যই ভালোভাবে শুকিয়ে তবেই এয়ারটাইট বয়ামে রাখতে হবে, যেন বাতাস ঢুকতে না পারে। বর্তমানে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে ফাঙ্গাস বা সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেক কমে যায়।
রান্না আর গল্পের এক ফাঁকে শেফ জানালেন , ছোটবেলার ঈদের আরেকটি বড় স্মৃতি জুড়ে আছে তাঁর মায়ের রান্নাঘর। কোরবানির সময় শুধু মাংস নয়, মায়ের হাতের কাউনের চালের পায়েসও ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয়। ঈদে তো বটেই, বছরের নানা সময় মা এই পায়েস রান্না করতেন।

সময় বদলেছে, জীবনও এগিয়েছে, কিন্তু সেই স্বাদ এখনো তাঁর স্মৃতিতে অমলিন। কোরবানির মাংসের ভারী আয়োজনের পর শেফ জসীম উদ্দিন তাই বিশেষভাবে কাউনের পায়েস খাওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, মসলাদার খাবারের পর এই পায়েস যেন স্বস্তি এনে দেয়।

একসময় গ্রামবাংলার খুব পরিচিত শস্য ছিল কাউন। এখন বিভিন্ন সুপারশপেও পাওয়া যায় এটা। কৃষকেরা মাঠে কাজের শক্তি পেতে নিয়মিত এই চাল খেতেন। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার। সাধারণ পোলাও চাল বা সুজির পায়েসের তুলনায় কাউনের পায়েসের দানাদার টেক্সচার ও স্বাদ একেবারেই আলাদা। গুড়, নারিকেল আর ঘির মিশ্রণে তৈরি এই পায়েসে থাকে গ্রামীণ রান্নার চিরচেনা ঘ্রাণ। শেফ নিজ হাতে তৈরি করেও খাওয়ালেন কাউনের পায়েস।

প্রথমে কাউনের চাল কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে হালকা লবণ দেওয়া পানিতে সেদ্ধ করতে হয়। অন্যদিকে অল্প আঁচে দুধের মধ্যে দারচিনি, এলাচ ও তেজপাতা দিয়ে জ্বাল দিতে হয়।


এরপর সিদ্ধ কাউন চাল দুধে মিশিয়ে কিছুক্ষণ নাড়ার পর গুড় যোগ করা হয়। সবশেষে ঘি, কোরানো নারিকেল, কিসমিস কিংবা বাদাম ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয় এই পায়েস।


কোরবানির মাংসের ভারী আয়োজনের পর এই পায়েস যেন এনে দেয় অন্যরকম এক প্রশান্তি।
ছবি: হাল ফ্যাশন