
আজ ২৮ মে। যুক্তরাষ্ট্রে এ দিনটি বার্গার দিবস হিসেবে পালন করা হয়। বিশ শতকের একেবারে শুরুর দিকের কথা। প্রচলিত আছে যে সে সময়েই নাকি খাবার হিসেবে ‘বার্গারের উৎপত্তি’। কথিত আছে, ব্যস্ত সময়ে দুপুরের খাবার খেতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি হোটেলে যান এক ব্যক্তি। চলতি পথেই খাওয়া যায় এমন কোনো একটি খাবার তিনি নিতে চাচ্ছিলেন। হোটেলের মালিক তখন দুই টুকরা রুটির মধ্যে একটি স্টেক বসিয়ে নতুন এক খাবার তৈরি করলেন। এভাবেই সহজে দুপুরের খাবারের খোঁজ থেকেই নাকি আবিষ্কার হয়ে যায় হ্যামবার্গার। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বার্গার সুদূর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে কবে নাগাদ বার্গার জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে আন্দাজ করা যায় দেশে রেস্তোরাঁ ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বার্গারেরও প্রসার হয়েছে। নিশ্চিতভাবে ঢাকাতেই সবার আগে হালের খাবার হিসেবে যোগ হয়েছে বার্গার। দুই ফালি রুটির মধ্যে চিজ, মেয়োনিজের মিশ্রণ আর সঙ্গে বিফ বা চিকেন পেটি এবং টমেটো, লেটুস ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি বার্গারের স্বাদ ঢাকার বাইরে এখন ছোট-বড় শহরসহ মফস্বলেও জনপ্রিয়। এমনকি রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার পাশাপাশি ঢাকার বাইরের মানুষেরা অনলাইনেও প্রচুর পরিমাণে বার্গার অর্ডার করেন বলে শোনা যায়। তথ্যসমেত এ কথার প্রমাণও মিলেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপ্যান্ডার দেওয়া তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলা শহরে অনলাইনে বার্গার বিক্রির প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। এমনকি অনেক রেস্তোরাঁ স্বাদের ভিন্নতা আনতে নানা উপাদান যোগ করে নানা নামের বৈচিত্র্যময় সব বার্গার যোগ করছে তাদের মেনুতে
চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ বার্গারিটা। তাদের নামেই বার্গারের প্রাধান্য। তিন বন্ধুর এ রেস্তোরাঁর শুরুর পুঁজি ছিল ৩ লাখ। শুরুর দিনেই বিক্রি করেন ৯ হাজার টাকার বার্গার। সেই শুরু। এরপর পরিধি ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। যুক্ত হয়েছেন অনলাইনেও। রেস্তোরাঁ আর ফুডপ্যান্ডা মিলে প্রতিদিন এখন শুধু বার্গারই বিক্রি হয় ৩০০ পিস। বার্গারের জন্য প্রতিদিন ৪৫ কেজি মাংসের প্রয়োজন হয় তাদের।

চট্টগ্রামের আরেক রেস্তোরাঁ মিলানো এক্সপ্রেস। সাশ্রয়ী দামে তারা বার্গার বিক্রি করছে। রেস্তোরাঁটির মালিক বোরহান উদ্দিন জানান, অনলাইনে বার্গারের চাহিদা বাড়ছে। ফুডপ্যান্ডায় যুক্ত হয়ে তাদের বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। এখন প্রতিদিন ফুডপ্যান্ডার অর্ডারসহ মিলানো এক্সপ্রেস থেকে ৪০০টির মতো বার্গার বিক্রি হয়।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পেরিয়ে যদি উত্তরবঙ্গেও খোঁজ নেওয়া যায়, তবে সেখানেও বার্গারের জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। রংপুর ও দিনাজপুরে ট্যাক্সি বার্গার নামে আউটলেট চালান সালেহ আহমেদ। তিনি জানান, চাহিদা দিনকে দিন বাড়ছেই। সমানতালে বাড়ছে অনলাইনের ব্যবসাও। ফুডপ্যান্ডা অ্যাপে গত মাসের তুলনায় বিক্রি বেড়েছে ২৭ শতাংশ। তাঁর রেস্তোরাঁয় চিকেন বার্গার, বিবিকিউ চিকেন বার্গার, ক্রিস্পি চিকেন বার্গার, মিনি বিফ বার্গার জনপ্রিয়। রংপুরের আরেক রেস্তোরাঁ দ্য সিটি প্যালেস। জুসবার দিয়ে ব্যবসার শুরু এ রেস্তোরাঁর মালিক মোহাম্মদ তামজিদের। করোনা মহামারির সময় ব্যবসায় ধস নামে। তবে ফুডপ্যান্ডার মাধ্যমে খাবার সরবরাহ অব্যাহত রাখেন দ্য সিটি প্যালেসের মালিক। তখন থেকেই জনপ্রিয়তা পেতে থাকে এ রেস্তোরাঁর। প্রচলিত বার্গারের পাশাপাশি এনেছেন স্থানীয় স্বাদের ফিউশন দ্য রংপুরিয়ান বার্গার।

কথা হয় খুলনার রেস্তোরাঁ পিজ্জালজির সঙ্গে । পিৎজা আর বার্গারের জন্য বেশ নাম কুড়িয়েছে খুলনার এই রেস্তোরাঁ। প্রথমে তাদের ব্যবসা ছিল ঢাকায়। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে ঢাকার রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দিতে হয়। পিজ্জালজির মালিক বেলাল হোসেন জানালেন, ঢাকায় কিছু সমস্যার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে খুলনায় ফেরেন। সেখানেই নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন। ফুডপ্যান্ডায় যুক্ত হয়ে আউটলেটের সংখ্যাও বাড়াতে থাকেন। এমনকি খুলনার পাশের জেলা সাতক্ষীরা ও যশোরেও আউটলেট দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, কোভিড মহামারির সময় ব্যবসা সচল রেখে এ প্রবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে ফুডপ্যান্ডা। প্ল্যাটফর্মটিতে তাঁর ব্যবসা বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। ভবিষ্যতে বগুড়া, রাজশাহী, রংপুরসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চেইন রেস্তোরাঁ হিসেবে আউটলেট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
একই চিত্র দেখা গেছে রাজশাহী, বরিশাল আর ময়মনসিংহের রেস্তোরাঁগুলোতেও। রাজশাহীর নর্থ বার্গ রেস্তোরাঁর মালিক মাহফুজুর রহমান জানালেন, ‘খুবই ছোট পরিসর থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। আমরা চিরচেনা বার্গারের স্বাদে নতুনত্ব এনে কাজ শুরু করি। গ্রাহকেরাও এটাকে ভালোভাবেই গ্রহণ করে। ব্যবসার পরিসর বাড়ানোর জন্য ফুডপ্যান্ডাতেও যোগ দিই।’

সশরীর গিয়ে খাওয়া যায় এমন আউটলেট নেই স্লয়ের। ফুডপ্যান্ডায় হোমশেফ হিসেবে যুক্ত রয়েছে তারা। কথা হলো তাদের সঙ্গে। চাহিদা বাড়ায় মেনুতে স্ম্যাশবার্গারের প্রাধান্য রেখে কার্যক্রম শুরু করেন স্লর সহপ্রতিষ্ঠাতা রাইয়ান ইবনে শোয়েব। তিনি বলেন, ‘আমাদের করপোরেট শেফ আরব আমিরাতের মারওয়ান সারদোক আমাদের মেনু তৈরিতে কাজ করেছেন। শুধু ফুডপ্যান্ডা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বার্গার বিক্রি করছি। আমরা এখন গুলশান, বনানী ও বারিধারায় কাজ করছি। গ্রাহকদের চাহিদা মাথায় রেখে ধানমন্ডিতেও আমাদের কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
বার্গারের জনপ্রিয়তা রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কেমন—এমন জিজ্ঞাসার উত্তর মেলে ফুডপ্যান্ডার হেড অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস জাহেদুল ইসলামের কথায়। তিনি বললেন, ফুডপ্যান্ডায় যেসব খাবার সবচেয়ে বেশি অর্ডার হয়, তার মধ্যে বার্গার একটি। এই চিত্র সারা দেশের। আর ঢাকার বাইরেও বার্গারের চাহিদা বেশ বাড়ছে। এমনকি শুধু বার্গার কেন্দ্র করেই অনেক রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। তাদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধিও উল্লেখ করার মতো।
দেশে এখন অনলাইনে ফুড ডেলিভারি করছে ফুডপ্যান্ডা, পাঠাও ফুড, ফুডিসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। ঢাকার বাইরে অন্যান্য বড় শহর ছাড়াও জেলা শহরেও এসব খাবার সরবরাহকারী অ্যাপ তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। গত ১৩ বছরে দেড় লাখের বেশি হোটেল ও রেস্তোরাঁ হয়েছে। বিবিএসের জরিপ বলছে, উপজেলা পর্যায়েও রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ছে। খাত বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্বল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করা যায় বলে রেস্তোরাঁ ব্যবসা বাড়ছে। একই সঙ্গে চাহিদাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ খাতের এমন প্রসারে দেশের জিডিপিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
ছবি: পেকজেলসডটকম