শিল্পা শেঠির বাস্তিয়ান: এক কাপ চা ৯২০, এক রাতের ব্যবসার দাবি ৩ কোটি
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মুম্বাইয়ের বিলাসী খাবার, নাইটলাইফ ও তারকাখচিত আড্ডার সঙ্গে ‘বাস্তিয়ান’-এর নাম এখন বেশ পরিচিত। বলিউড অভিনেত্রী শিল্পা শেঠির সঙ্গে রেস্তোরাঁটির সম্পর্কও এর জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। তবে শুরু থেকেই এটি কোনো তারকার রেস্তোরাঁ ছিল না।

বাস্তিয়ানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন শিল্পা শেঠি
বাস্তিয়ানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন শিল্পা শেঠি

রণজিত বিন্দ্রার হাত ধরে বাস্তিয়ান হসপিটালিটির যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে। প্রথম ‘বাস্তিয়ান’ রেস্তোরাঁ চালু হয় ২০১৬ সালে। ২০১৯ সালে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হন শিল্পা শেঠি। এরপর ধীরে ধীরে একটি রেস্তোরাঁ থেকে এটি পরিণত হয় বড় একটি হসপিটালিটি ব্র্যান্ডে।

মুম্বাইয়ের পাশাপাশি বেঙ্গালুরু, পুনে ও গোয়াতেও এখন বাস্তিয়ান হসপিটালিটির বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও কনসেপ্ট রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আকাশের কাছাকাছি অন্য মুম্বাই

আকাশের কাছে আহার বিলাস
আকাশের কাছে আহার বিলাস

এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে আলোচিত ঠিকানাগুলোর একটি ‘বাস্তিয়ান অ্যাট দ্য টপ’। মুম্বাইয়ের দাদারে কোহিনুর স্কয়ারের ৪৮ তলায় অবস্থিত এই রেস্তোরাঁ থেকে শহরের ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্য দেখা যায়। প্রায় ২১ হাজার বর্গফুটের বিশাল জায়গাটি খাবারের পাশাপাশি নাইটলাইফেরও বড় আকর্ষণ।

২০২৩ সালে চালু হওয়া এই রেস্তোরাঁয় সূর্য ডোবার পর বদলে যায় পুরো পরিবেশ। খাবারের সঙ্গে যোগ হয় মিউজিক, ডিজে, আলোকসজ্জা ও রাতের আড্ডা। ফলে এটি শুধু ডিনারের জায়গা নয়; তৈরি হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাইনিং ও এন্টারটেইনমেন্ট এক্সপেরিয়েন্স।

বিজ্ঞাপন

গুহার ভেতর বিলাস

‘বাস্তিয়ান অ্যাট দ্য টপ’-এর ইন্টেরিয়রই এর অন্যতম আকর্ষণ। রুক্ষ মাটিরঙা আবহ, পাথরের মতো দেয়াল, ট্রাভার্টিন মার্বেল ও উঁচু ছাদ—সব মিলিয়ে জায়গাটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন মুম্বাইয়ের কোলাহল থেকে হঠাৎ কোনো মরুভূমির গুহায় চলে এসেছেন।

এর ‘ফরেস্ট’ অংশে রয়েছে একটি প্লাঞ্জ পুল। পাশাপাশি রয়েছে মেইন বার, ডিজে স্পেস ও আলাদা ফাইন ডাইনিং এলাকা। বিশাল বুদ্ধমূর্তি ও আর্থি টোনের ইন্টেরিয়র পুরো জায়গাটিতে তৈরি করেছে একধরনের থিয়েট্রিক্যাল আবহ।

আর সবকিছুর ওপরে রয়েছে মুম্বাইয়ের স্কাইলাইন। দিনের আলোয় শহরটি যেমন, রাতের আলোয় তেমন নয়—এই বদলে যাওয়া দৃশ্যও বাস্তিয়ানের এক্সপেরিয়েন্সের অংশ।

এক কাপ চায়ের দামই ৯২০!

বিলাসের গল্পে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে অবশ্যই মেনুর দাম।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাস্তিয়ানের মেনুতে এক কাপ জেসমিন হার্বাল টির দাম ৯২০ রুপি এবং ইংলিশ ব্রেকফাস্ট টির দাম ৩৬০ রুপি উল্লেখ করা হয়েছে। খাবারের মধ্যে চিলি গার্লিক নুডলস ৬৭৫ রুপি, চিকেন বুরিটো ৯০০ রুপি, অ্যাভোকাডো টোস্ট ৮০০ রুপি এবং বুরাটা সালাদ ১ হাজার ৫০ রুপি।

খবর হয় খাবারের দাম
খবর হয় খাবারের দাম

সিফুডও বাস্তিয়ানের অন্যতম পরিচিত আকর্ষণ। মাছ, চিংড়ি, লবস্টার থেকে কাঁকড়া—বিভিন্ন ধরনের সিফুড রয়েছে মেনুতে। পাশাপাশি গ্লুটেন-ফ্রি খাবারেরও বেশ কিছু অপশন রাখা হয়েছে।

তবে পানীয়ের তালিকায় দাম আরও চমকপ্রদ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ফ্রান্সের দোম পেরিনিয়ঁ ব্রুট রোজে এক বোতলের দাম প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ রুপি উল্লেখ করা হয়েছে।

এক রাতে ১ হাজার ৪০০ অতিথি!

বাস্তিয়ানের আরেকটি আলোচিত বিষয় এর বিপুল অতিথি সংখ্যা।

২০২৫ সালে লেখিকা ও কলামিস্ট শোভা দে এক সাক্ষাৎকারে জানান, দাদারের ‘বাস্তিয়ান অ্যাট দ্য টপ’-এ এক রাতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ অতিথি আসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি সিটিংয়ে প্রায় ৭০০ জন করে অতিথিকে পরিবেশন করা হয়।

এক রাতে ১৪০০ অতিথির স্থান সংকুলান হতে পারে
এক রাতে ১৪০০ অতিথির স্থান সংকুলান হতে পারে

শোভা দে আরও দাবি করেছিলেন, সাধারণ রাতে রেস্তোরাঁটির টার্নওভার প্রায় ২ কোটি রুপি এবং সপ্তাহান্তে তা ৩ কোটি রুপি বা তারও বেশি হতে পারে।

এই বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শোভা দে জানিয়েছিলেন, প্রথমে তিনি এই অঙ্ক বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে নিজে রেস্তোরাঁটিতে গিয়ে এর বিশালতা ও ভিড় দেখে অভিজ্ঞতা নেন।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি যে ২–৩ কোটি রুপির অঙ্কটি বাস্তিয়ানের প্রকাশিত আর্থিক হিসাব নয়। এটি শোভা দের দেওয়া তথ্য ও তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা দাবি। ফলে অঙ্কটিকে নিশ্চিত আয় হিসেবে নয়, বরং তাঁর করা দাবি হিসেবেই দেখা উচিত।

বলিউডি তারকাদের ঠিকানা

বাস্তিয়ানের সঙ্গে বলিউডের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তারকাদের ডিনার, পার্টি কিংবা ব্যক্তিগত আয়োজন—বিভিন্ন সময়েই রেস্তোরাঁটির নাম উঠে এসেছে আলোচনায়।
শিল্পা শেঠির তারকাখ্যাতি ব্র্যান্ডটির ভিজিবিলিটি অবশ্যই বাড়িয়েছে। তবে বাস্তিয়ানের ব্যবসায়িক গল্পটি কেবল সেলিব্রিটি ব্র্যান্ডিংয়ের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় আকারের স্পেস, স্বতন্ত্র ইন্টেরিয়র, সিফুড-কেন্দ্রিক মেনু, নাইটলাইফ এবং হাই-এন্ড হসপিটালিটি।

এই কম্বিনেশনই বাস্তিয়ানকে মুম্বাইয়ের লাক্সারি ডাইনিং কালচারে একটি পরিচিত নাম করে তুলেছে।

৮০ আসন থেকে ৫০০ আসনের বিশাল পরিসর

আজকের বাস্তিয়ানের বিশালতা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে শুরুতে।
বাস্তিয়ানের প্রথম রেস্তোরাঁ ছিল মাত্র ৩ হাজার বর্গফুটের ৮০ আসনের জায়গা। রণজিত বিন্দ্রার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ব্যবসাটিকে লাভজনক পর্যায়ে নিতে প্রায় চার বছর সময় লেগেছিল। পরে শিল্পা শেঠি অংশীদার হিসেবে যুক্ত হন এবং প্রতিষ্ঠানটি বড় পরিসরে সম্প্রসারণ শুরু করে।

বলিউড তারকাদের হ্যাংআউট গন্তব্য
বলিউড তারকাদের হ্যাংআউট গন্তব্য

এরপর মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় নতুন শাখা ও নতুন ধরনের কনসেপ্ট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বাস্তিয়ান হসপিটালিটির অধীনে রয়েছে একাধিক রেস্তোরাঁ ও ভিন্নধর্মী ডাইনিং কনসেপ্ট।

অর্থাৎ গল্পটি এখন আর শুধু একটি সেলিব্রিটি রেস্তোরাঁর নয়; এটি একটি মাল্টি-কনসেপ্ট হসপিটালিটি ব্র্যান্ডের গল্প।

রেস্তোরাঁ নয়, এক্সপেরিয়েন্সের ব্যবসা

বাস্তিয়ানের সাফল্যের গল্পে ৯২০ রুপির চা বা দেড় লাখ রুপির শ্যাম্পেন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ার মতো সংখ্যা। কিন্তু ব্যবসাটির আসল গল্প সম্ভবত অন্য জায়গায়।

এখানে মানুষ শুধু খাবার খেতে যায় না। যায় একটি নির্দিষ্ট এক্সপেরিয়েন্সের জন্য—আকাশছোঁয়া স্কাইলাইন, নাটকীয় ইন্টেরিয়র, মিউজিক, নাইটলাইফ, সেলিব্রিটি অ্যাসোসিয়েশন এবং লাক্সারি ডাইনিংয়ের সমন্বিত অভিজ্ঞতা।

এখানে এক্সপেরিয়েন্সই মূলকথা।
এখানে এক্সপেরিয়েন্সই মূলকথা।

এই জায়গাটিতেই বাস্তিয়ান সমসাময়িক লাক্সারি হসপিটালিটির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এখানে খাবার একটি পণ্য, কিন্তু এক্সপেরিয়েন্সই মূল ব্র্যান্ড।

এক কাপ চা তাই শুধু চা নয়। দেড় লাখ রুপির শ্যাম্পেনও শুধু পানীয় নয়। এগুলো এমন এক লাইফস্টাইলের অংশ, যেখানে মানুষ খাবারের পাশাপাশি একটি জায়গা, একটি মুড এবং একটি সোশ্যাল এক্সপেরিয়েন্সের জন্য অর্থ খরচ করে।

আর বাস্তিয়ানের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত সেখানেই—একটি রেস্তোরাঁকে এমন এক ডেস্টিনেশনে পরিণত করা, যেখানে মানুষ শুধু খেতে যায় না; দেখতে যায়, দেখা দিতে যায় এবং একটি রাতকে এক্সপেরিয়েন্সে পরিণত করতে যায়।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন