বিশ্ব চকলেট দিবস: জিভে গলে, অন্যটি হৃদয়ে—বেলজিয়ামের দুই বিস্ময়
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইউরোপের ছোট্ট দেশ বেলজিয়াম। আয়তনে খুব বড় নয়, কিন্তু সংস্কৃতি, খাদ্যরুচি ও খেলাধুলায় বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ। বেলজিয়ামের নাম উঠলেই কারও মনে আসে বিশ্বখ্যাত চকলেট, কারও চোখে ভেসে ওঠে সবুজ মাঠে দুর্দান্ত ফুটবলের ছবি। আপাতদৃষ্টিতে দুটি জগত যেন সম্পূর্ণ আলাদা। অথচ একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, এ দুটির ভিত্তি একই—নিখুঁত কারিগরি, ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং উৎকর্ষের প্রতি আপসহীন সাধনা।

মিষ্টি নয়, জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
মিষ্টি নয়, জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

বেলজিয়ামে চকলেট কেবল একটি মিষ্টান্ন নয়; এটি শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। উনিশ শতক থেকেই বেলজিয়ান চকলেট বিশ্বজুড়ে আলাদা মর্যাদা পেতে শুরু করে। বিশেষ করে ভেতরে নরম পুরভরা প্রালিন-এর জন্ম বেলজিয়ামেই, যা আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত চকলেটধারার একটি। যদিও ‘বেলজিয়ান চকলেট’ এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পায়নি, তবু এর গুণমান ও উৎপাদনমান রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। ফলে ‘বেলজিয়ান চকলেট’ আজও বিশ্বজুড়ে আস্থার প্রতীক।

বিজ্ঞাপন

দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য চকলেট বুটিক ও কারিগরি কর্মশালা। প্রতিটি চকলেট যেন শিল্পীর হাতে গড়া একটি ক্ষুদ্র শিল্পকর্ম। উৎসব, উপহার, পারিবারিক আয়োজন কিংবা বিশেষ মুহূর্ত—সব ক্ষেত্রেই চকলেট বেলজিয়ান জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাতে তৈরি চকলেট তৈরির ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

প্রালিনের মোহ উপেক্ষা করা দায়
প্রালিনের মোহ উপেক্ষা করা দায়
গুইলিয়ান
গুইলিয়ান

বেলজিয়ান চকোলেটের কথা উঠলেই কয়েকটি কিংবদন্তি প্রতিষ্ঠানের নাম অনিবার্যভাবে চলে আসে। নিউহাউস (Neuhaus), গোডাইভা (Godiva), লিওনিদাস (Leonidas), গুইলিয়ান (Guylian), কোত দ'অর (Côte d'Or) ও  পিয়ের মারকোলিনি (Pierre Marcolini) শুধু বেলজিয়ামের গর্বই নয়, বিশ্বজুড়ে প্রিমিয়াম চকোলেটের প্রতীক। ১৯১২ সালে নিউহাউস প্রথম প্রালিন তৈরি করে চকলেটশিল্পে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। পরে গোডাইভা বিলাসবহুল চকোলেটের বিশ্বমানদণ্ড স্থাপন করে। গুইলিয়ানের সি-শেল আকৃতির হ্যাজেলনাট প্রালিন, লিওনিদাসের তাজা প্রালিন, কোত দ'অরের শতবর্ষের ঐতিহ্য এবং পিয়ের মারকোলিনির হাতে তৈরি শিল্পমানের চকলেট আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।

বিজ্ঞাপন

তবে বেলজিয়ামের পরিচয় শুধু মিষ্টতায় সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবলও দেশটির জাতীয় আবেগের আরেক নাম। ছোটবেলা থেকেই অসংখ্য শিশু বল পায়ে বড় হয়। পাড়ার মাঠ, বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ কিংবা নগরের উন্মুক্ত চত্বর—সবখানেই ফুটবল জীবনের অংশ হয়ে আছে। এখানে ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি স্বপ্ন, গর্ব এবং আত্মপরিচয়ের ভাষা।

বিশ্বকাপে বেলজিয়াম
বিশ্বকাপে বেলজিয়াম

গত এক দশকে বেলজিয়াম বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে। কেভিন ডি ব্রুইনার নিখুঁত পাস, খেলা গড়ার অসাধারণ ক্ষমতা এবং দূরপাল্লার শট যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি রোমেলু লুকাকুর শক্তি, গতি ও গোল করার দক্ষতা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য হয়ে উঠেছে বড় হুমকি। তাঁদের মতো ফুটবলাররা শুধু সাফল্যই এনে দেননি; বিশ্বমঞ্চে বেলজিয়ামের পরিচয়ও আরও উজ্জ্বল করেছেন।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ছোটবেলা থেকেই খেলোয়াড়দের কারিগরি দক্ষতা, কৌশলগত বোধ, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ছোট দেশ হয়েও বেলজিয়াম নিয়মিত বিশ্বের সেরা ফুটবল প্রতিভাদের জন্ম দিচ্ছে।

ফুটবল মিশে আছে তাদের সংস্কৃতিতে, ঠিক চকলেটের মতই
ফুটবল মিশে আছে তাদের সংস্কৃতিতে, ঠিক চকলেটের মতই

একটি উৎকৃষ্ট চকলেট তৈরির জন্য যেমন প্রয়োজন সেরা উপাদান, নিখুঁত তাপমাত্রা, ধৈর্য আর সূক্ষ্ম ভারসাম্য; তেমনি সুন্দর ফুটবলের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, ছন্দ, গতি এবং দলগত বোঝাপড়া। সামান্য ভুলেই যেমন নষ্ট হয়ে যেতে পারে একটি চকোলেটের স্বাদ, তেমনি একটি ভুল পাস বদলে দিতে পারে পুরো ম্যাচের ভাগ্য।

হয়তো এ কারণেই বেলজিয়ামের ফুটবলও অনেকটা তাদের চকোলেটের মতো। বাইরে মসৃণ, ভেতরে স্তরে স্তরে গভীরতা। ধীর লয়ে আক্রমণ গড়ে তোলা, নিখুঁত পাসের জাল বোনা, তারপর হঠাৎ বজ্রগতির আঘাত—এ যেন মুখে গলে যাওয়া এক টুকরো চকোলেটের মতো ধীরে ধীরে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া। মাঠে কেভিন ডি ব্রুইনার এক অনবদ্য পাস কিংবা লুকাকুর শক্তিশালী ফিনিশিং যেমন দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করে, তেমনি বেলজিয়ান চকোলেটের একটি ছোট্ট কামড়ও এনে দেয় অনন্য তৃপ্তি।

বেলজিয়াম দল
বেলজিয়াম দল

হয়তো এ কারণেই বেলজিয়ামকে জানতে চাইলে শুধু তার শহর, স্থাপত্য কিংবা ইতিহাস জানলেই হয় না। জানতে হয় তার স্বাদ, তার কারিগরি, তার খেলার ভাষা। কারণ পৃথিবীকে বেলজিয়াম দুটি অনন্য উপহার দিয়েছে—একটি জিভে গলে, অন্যটি হৃদয়ে। একটি চকলেট, অন্যটি ফুটবল।

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১১: ০৯
বিজ্ঞাপন