
দাওয়ায় ধানের গুঁড়া চালা হয়, নতুন চালের গন্ধে ভরে যায় বাতাস। পাশের রান্নাঘরে খেজুরগাছের রস ফোটে, নলেন গুড়ের গন্ধ মিশে যায় শীতের কুয়াশার সঙ্গে। ছোট্ট মাটির চুলায় কাঠের আগুন জ্বলে, তার ওপর ভাপা পিঠার হাঁড়ি বসে। চারদিকে বুলিয়ে যায় নরম ধোঁয়ার চাদর। হাতে হাতে কাজ। কেউ গোলা পাকাচ্ছে, কেউ পিঠার ছাঁচে নকশা কাটছে, কেউ আবার গুড়ের পুর ভরছে। বাইরে শীতের হাওয়া কনকন করছে, কিন্তু চুলার আঁচ আর মিষ্টি গন্ধে ঘরটা গরম।
এটা আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির এক রূপ।

ঘরে ঘরে পিঠার হাঁড়ি চড়ে। পাড়া-প্রতিবেশীকে পিঠা পাঠানো হয়। যে ঘরে মেয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে পিঠার থালা যায় বাবার বাড়ি থেকে। মেয়ে চুপি চুপি মাকে বলে, ‘মা, আরেকটা দুধপুলি দাও না। ছোটবেলার স্বাদটা ফিরে পাই।’
শহরের ফ্ল্যাটে এখনো সেই গন্ধটা আসে। মা ফোন করে বলেন, ‘আয় রে, পিঠা বানিয়েছি। তোর প্রিয় পাটিসাপটা।’
এই উৎসব কোনো ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়। এ হলো বাঙালির রক্তে মেশানো একটা মিষ্টি স্মৃতি। যত দিন খেজুরগাছ রস দেবে, তত দিন পিঠা খাওয়া চলবে। আর চলবে আমাদের এই ছোট্ট, গরম, মিষ্টি শীতের গল্প।

পৌষ-মাঘে পিঠা খাওয়ার উল্লেখ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে (১৪-১৫ শতক) পাওয়া যায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণ, মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে (১৫৮৯) ‘পৌষ পার্বণে পিঠাপুলি’র কথা আছে। পৌষসংক্রান্তির সঙ্গে পিঠার সম্পর্ক ১৭০০ সালের আগে থেকেই। ভারতবর্ষের কৃষি-আলমানাক–এ লেখা থাকত ‘পৌষে পিঠা, মাঘে মাংস’। নতুন ধান ওঠা ও খেজুরের রস পাওয়ার সঙ্গে যুক্ত এই সংস্কৃতি সম্ভবত ৮০০ থেকে ১০০০ বছরের পুরোনো।

ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য পিঠা (খুবই স্বাস্থ্যসম্মত, এমনকি উপকারী) যে উপাদান দিয়ে বানানো হতো তা আধুনিক বিজ্ঞানও স্বাস্থ্যকর বলে স্বীকৃতি দেয়। যেমন:
• নতুন চালের গুঁড়া (ধান কাটার পরের চাল) উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কিন্তু ফাইবার বেশি হওয়ায় এটা স্বাস্থ্যকর, এতে ভিটামিন বি১, বি৬ থাকায় এনার্জি বাড়িয়ে দেয়।
• খেজুরের নলেন গুড় বা পাটালিতে প্রাকৃতিক গ্লিসারিনের সঙ্গে আয়রন ও পটাশিয়াম থাকায় শরীর হাইড্রেট থাকে, পানি শোষণ কম হয়, এর সঙ্গে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যোগ হয়ে ত্বকের শুষ্কতা কমে।
• নারকেলে (তাজা কোরানো) থাকে মিডিয়াম চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড, যা শীতে তাড়াতাড়ি শক্তি দেয়, শরীরে তাপ সৃষ্টি হয়, যার কারণে শরীর গরম রাখে
• তিল, মুগ ডাল, ছোলা ডাল এগুলো উচ্চ প্রোটিন, সঙ্গে জিঙ্ক ও ম্যাগনেশিয়াম থাকায় শরীরে তেলের জোগান দেয়, যা শীতে চমৎকার কম্বিনেশন।
• দুধ বা খেজুরের রসে প্রাকৃতিক ক্যালসিয়াম ও প্রাকৃতিক শর্করা থাকায় শরীর চাঙা রাখে, মন চনমনে থাকে।

• উচ্চ ক্যালরি (৩০০ থেকে ৪০০ ক্যালরি/১০০ গ্রাম) শীতে শরীরের থার্মোজেনেসিস বাড়াতে দরকার।
• নারকেলের ফ্যাটের সঙ্গে গুড়ের কার্ব দ্রুত শক্তি দেয়, কিন্তু গ্লাইসমিক এনডেক্স কম হওয়ায় তা ধীরে ধীরে রক্তে শর্করা স্থিতিশীল ধরে রাখে।
• পিঠায় তাজা উপাদান থাকে যাতে কোনো প্রিজারভেটিভ নেই, ফাইবার বেশি থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়।
• গরম গরম খাওয়ার কারণে শরীরের কোর টেম্পারেচার বাড়ায়।
• ফলে গ্রামের মানুষ শীতে দিনে ৪-৫টা পিঠা খেলেও ডায়াবেটিস বা ওবেসিটি হতো না, কারণ তাঁরা শারীরিক পরিশ্রম করতেন।
আজকের শহুরে পিঠা কিংবা বাজারের পিঠা অধিকাংশই অস্বাস্থ্যকর
যা বদলে গেছে:
• সাদা ময়দা/পুরোনো চালের গুঁড়া ফাইবারশূন্য
• চিনি কৃত্রিম এসেন্স গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ৮০ থেকে ৯০
• পাম অয়েল/ডালডা/হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাট ট্রান্স ফ্যাট
• অতিরিক্ত তেলে ভাজা (বারবার গরম করা তেল) কার্সিনোজেনিক
এগুলো খেলে শীতেও ওজন বাড়ে, ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
তারপরেও মায়ের হাতের দুধ-চালের পাটিসাপটা বা গুড়-নারকেলের ভাপা পিঠা শীতে দিব্যি খাওয়া যায়, কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু দোকানের ‘ক্রিম পিঠা’ বা ‘চিনির পুলি’ দেখলে পাশ কাটিয়ে চলে যান।
ছবি: হাল ফ্যাশন
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র