
সন্ধ্যার কিছু আগে চেনেতদর্জের স্ত্রী গরুর দুধ সংগ্রহ করতে গেলেন। উট ও ঘোড়ার জন্য শেল্টার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু গরু, ছাগল আর ভেড়ার জন্য শেল্টার দরকার হয়। মাঠের মাঝে ছাদখোলা একটি শেল্টার দেখলাম। গের–এর ছাদে দেখলাম গোল গোল গামলায় কী যেন রয়েছে। তুসিনতুর বললেন, ড্রাই ইয়োগার্ট! শুকনা দই। রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছিল।

সন্ধ্যা সাতটায় রাতের খাবার দেওয়া হলো। গরুর মাংসের মোমো, চাটনি আর দুধ–চা (লবণ দেওয়া)। ঘরের চারদিকে দুধ আর দই। বিভিন্ন ধরনের চিজ বানিয়েও রাখা হয়েছে। যতটুকু বুঝলাম, দুধজাতীয় খাবারের ওপরই নোমাড পরিবারগুলোকে নির্ভর করতে হয়। বাইরে এখনো আলো রয়েছে। আমি চারপাশটা ঘুরে দেখছি, দিনের আলো থাকতে থাকতে। এখানে তিনটি গের রয়েছে। একটিতে হোস্ট পরিবার ও আমাদের খাবার পরিবেশন করা হলো, অন্যটি দেওয়া হলো গাইড ও ড্রাইভারকে। আর তৃতীয় গেরটি রাতে আমাদের থাকার জন্য।
সুর্য অস্ত গেল রাত ৯টায়। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল রাত পৌনে ১০টা নাগাদ। এই সময়ে দই দিয়ে আমাদের একটি পানীয় বানিয়ে দেখানো হলো। ফায়ারপ্লেসই তাদের উনুন। সেখানেই দই থেকে বাষ্প তৈরি হলো, সেই বাষ্পই তরল পানীয়। অবাক বিষয়, ১২ কেজি দই থেকে ২০০ লিটার তরল তৈরি হতে মাত্র ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগল। এই পানীয় তাদের শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচায়। গ্রীষ্মে অল্প অল্প করে বানিয়ে রাখে। আমাদের অল্প করে স্বাদ গ্রহণ করতে দেওয়া হলো। সঙ্গে একটু মাখনও মিশিয়ে দেওয়া হলো। সেটাও গরুর দুধ থেকে তৈরি। তারা নাকি চা–ও পান করে বাটার দিয়ে। হয়তো শীতের সময়। কিন্তু আমাদের চায়ের সঙ্গে বাটার মেশানো হয়নি। আরও একটি কারণ হয়তো রয়েছে। অনেক অভ্যাস, অনেক নিয়ম বদল হয়েছে পরিবেশ-পরিস্থিতি ও বাস্তবতার কারণে।

আমি আর ফাইয়াজ নিজেদের গেরে গেলাম। রাতে বাতির একমাত্র উৎস সোলার প্যানেল। একবিংশ শতাব্দীর সমস্ত আধুনিকতা থেকে একেবারেই আলাদা। আমাদের গেরের আশপাশে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বসতি চোখে পড়েনি। প্রাণীর দল, নোমাড পরিবার আর আমরা ছাড়া ত্রিসীমানায় কেউ নেই। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, বিশ্বরাজনীতি, অর্থনীতি, মহাকাশ, পারমাণবিক বোমা, ক্ষমতার লড়াই—কোনো কিছুই তাদের স্পর্শ করে না। নিজের কাজ করেই ফুরসত নেই তাদের। দিনাতিপাতই মুখ্য তাদের কাছে। খাদ্যসংস্থান আর বছরে চারবার বসত বদলাতেই চলে যায় সময়। কোন রাজ্যে কী হলো, তাতে তাদের কিছুই যায়–আসে না। প্রাণী আর মানুষের সহাবস্থান এই ভূখণ্ডে। প্রাণীরা তাদের পরম বন্ধু। ঘোড়া ও উটকে ভীষণ শ্রদ্ধার চোখে দেখে মঙ্গোলীয়রা। এখনো শহরের বাইরে মূল বাহন ঘোড়া ও উট।
রাতে ভালোই ঘুমিয়েছি। আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা ছিল। শীত অনুভূত হয়েছে। আমাদের গেরে ছোট একটি কাঠের টুলের ওপর একটি বেসিন আছে। বেসিনের ওপরে আধা লিটার পানি ধরবে—এ রকম একটি জলাধার। সেখানে একটি আয়নাও আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করলাম, মুখ ধুলাম সেখানে। প্রতিটি গেরে একটি করে প্রার্থনার স্থান রয়েছে। কাঠের একটি ছোট আলমারির মতো স্থানে বিভিন্ন দেবতার মুখাবয়ব তৈরি করা হয়েছে। ছোট ছোট বাটিতে পাথর রাখা হয়েছে। এই পরিবার ঠিক কোন ধর্মের অনুসারী বুঝিনি। মঙ্গোলিয়ার কিছু অংশে তিব্বতি বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করা হয়। তুসিনতুরের ভাষ্যমতে, মঙ্গোলিয়ার ৬০ শতাংশ মানুষ নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম অনুসরণ করে না।

মঙ্গোলীয়রা যেহেতু ছোট ছোট আদি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত, তাই তাদের দেবতাও আলাদা। গেরের এক কোনায় কিছু পারিবারিক ছবি রয়েছে। চেনেতদর্জের ছেলেমেয়ে সবাই শহরে থাকে। তারা কেউই নোমাড–জীবন বেছে নেয়নি। তুসিনতুর বলছিলেন, মঙ্গোলিয়ায় নোমাড পরিবারের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবাই আধুনিক জীবনযাপনে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হচ্ছে। কিছু পর্যটক আগ্রহী হয় নোমাড পরিবারের সঙ্গে থাকতে, তাই হয়তো কিছু কিছু পরিবার এখনো টিকে রয়েছে।
সকালের নাশতার জন্য চেনেতদর্জের গেরে গেলাম আমরা। হাতে বানানো ভিন্ন ধরনের রুটি, চিজ, একধরনের স্যুপ (নুডুলস ও শুকনা মাংস দেওয়া), দুধের সরের পিঠা আর অবশ্যই সঙ্গে লবণ দেওয়া দুধ–চা। মাংস শুঁটকির মতো তৈরি করে তারা। সংরক্ষণের একটি ভিন্ন ধরন। দুধের সরের পিঠা বলছিলাম যে খাবারকে, সেটির নাম উরুম। বিদায়ের সময় হলো। মঙ্গোলিয়ার ভুখণ্ডে অন্য রকম অভিজ্ঞতা নিয়ে রওনা হলাম। পরের গন্তব্য সিল্করোডের বিখ্যাত শহর কারাকোরাম।
কারাকোরাম শহরে বিকেলের নাশতায় চেখে দেখলাম খুশুর। দেখতে আমাদের শিঙাড়া বা সমুচার মতো; তবে ভেতরে গরু বা খাসির মাংসের কিমা। গরম তেলে ভাজা, বাইরে কড়কড়ে, ভেতরে রসালো। ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে খুশুরের প্রথম কামড়—সত্যিই অবিস্মরণীয়। রাস্তার পাশে ছোট স্টলগুলোতেই এর আসল স্বাদ পাওয়া যায়।

বুজ শীতের খাবার। কিন্তু গোবি মরুর পাশে গ্রীষ্মে মেলা বসে। সেই মেলায় খেলাম বুজ। গাইড বলল, শীতের সকালে বুজ ছাড়া যেন দিনই শুরু হয় না। এটা অনেকটা স্টিমড মোমোর মতো। মাংস, পেঁয়াজ আর মসলার মিশ্রণ ভরে ভাপানো হয়। গরম ধোঁয়া ওঠা বুজ মুখে দিলেই মাংসের রস ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় এক ব্যক্তি হেসে বললেন, ‘শীতে বুজ না খেলে শক্তি পাবেন কীভাবে?’

সকাল ও রাতে প্রায় প্রতিদিনই খেয়েছি। সুতেই চাই বা লবণ দেওয়া দুধ–চা! প্রথম চুমুকে অদ্ভুত লাগলেও ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যায়। ঠান্ডার দেশে শরীর গরম রাখতে এটা দারুণ কার্যকর। চায়ের সঙ্গে ছোট শুকনা পনির বা বিস্কুট দেওয়া হয়।
খোলা আকাশের নিচে আহার...!

আজ সকাল শুরু হয়েছে ছয়টায়। অবশ্য প্রতিদিনই তা–ই হচ্ছে। এখানে সকাল ছয়টায় একেবারে চকচকে রোদ। স্থানীয় মানুষের সকাল শুরু হয় ভোর চারটায়। কাজেই সকাল ছয়টা খুব বেশি উল্লেখ করর মতো সময় নয় মঙ্গোলিয়ার শহরতলিতে।
আর খোলা আকাশের নিচে আহার, সে রকম কোনো উল্লেখযোগ্য বিষয়ও নয়; কিন্তু পরিকল্পনাবিহীন যেকোনো কাজ মজার। নির্জন উপত্যকায়, খোলা আকাশের নিচে, স্তেপ অঞ্চল, সবুজ ঘাস আর প্রাণিকুলের মাঝে বসে কফি বানানো, প্যাকেট করে আনা খাবার খাওয়া একেবারে গুরুত্বহীন নয় ভ্রমণে। গাড়ির পেছনের ডালা খুলে পুরো একটি কিচেন দেখলাম। কফি মগ, রান্নার চুলা, ছুরি, কাঁচি, প্লেট, ফোল্ডিং চেয়ার, ফ্লোর ম্যাট—সবই রয়েছে। মনে হচ্ছিল আরও সময় কাটাই সবুজ ঘাস আর প্রাণীদের সঙ্গে। ভ্যালির ওপর থেকে মূল সড়ক দেখা যাচ্ছে। তুসিনতুর তাড়া দিল।

পাঁচ দিনের রোড ট্রিপ প্রায় শেষ হওয়ার পথে। উলানবাটরের দিকে যাচ্ছি। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করার জন্যই খোলা আকাশের নিচে খাবার আয়োজন। হুস্তাই এলাকায় ডাইনিং টেবিলে বসে নাশতা করতে চাইলে আরও এক ঘণ্টা দেরি হতো, তাই এ ব্যবস্থা।
পরিচিত স্বাদের বাইরে যে অনুভূতি, সেটাও তো আরেক অভিজ্ঞতা! মঙ্গোলিয়ার খাবার হয়তো মসলাদার নয়, রঙিনও নয়; অথচ প্রতিটি পদে আছে প্রকৃতির ছোঁয়া, টিকে থাকার গল্প আর আতিথেয়তার পরম উষ্ণতা। (শেষ)
ছবি: লেখক