
ফরাসিরা নিজেদের বহু মজার স্বাদের পনির ছাড়াও অন্য দেশের পনিরও খুব পছন্দ করে এবং প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করে না। এমনই আরও চারটি পনির নিয়ে এ লেখার ১৩তম পর্বটি প্রিয় পাঠকদের জন্য সাজাবার চেষ্টা করেছি।

ভেড়ার দুধ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পনির ‘মানচেগো’ স্পেনের খাদ্যসংস্কৃতিতে একটি বেশ আকর্ষণীয় সংযোজন। স্পেনের মধ্যাঞ্চলে লা মাঞ্চা-তে সমভূমি, উচ্চ সমভূমি, পাহাড়, নদী আর হ্রদ মিলে প্রকৃতি তার সৌন্দর্যের সবটুকু ফুটিয়ে তুলেছে।
ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে দিগন্ত বিস্তৃত তৃণভূমিতে সেই প্রাচীনকাল থেকেই কৃষকদের ভেড়ার পাল ছিল। বাঁধন ছাড়া ভেড়ার পাল পাহাড়ি ফুল-ফল, তৃণ, লতাপাতা খেয়ে দুধ উৎপাদন করত। চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি দুধ সংরক্ষণের তাগিদেই সৃষ্ট হয় মানচেগো। মিগুয়েল দে সের্ভান্তেসের ডন কিহোতে উপন্যাসে লা মাঞ্চার খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হিসেবে এই পনিরের উল্লেখ করেছেন।
মানচেগো বর্তমানে একটি সুরক্ষিত পনির। ১৯৮২ সালে এটি স্পেনে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুরক্ষা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘মানচেগো’ নাম নাম ব্যবহার করতে হলে পনিরটি অবশ্যই লা মাঞ্চা অঞ্চলে উৎপাদিত হতে হবে এবং নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
বেঁধে দেওয়া আইন অনুযায়ী, এটি তৈরি হয় শুধু ভেড়ার দুধ থেকে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিপক্ব করা হয়। সাধারণত কমপক্ষে ৩০ দিন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত পরিপক্ক করা হয়। এই নিয়মগুলো পনিরটির স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণমান বজায় রাখে। মানচেগো পনিরের স্বাদ পরিপক্ব করার সময়ের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হয়।

৩০ থেকে ৯০ দিনের মানচেগো নরম, মাখনের মতো মোলায়েম এবং হালকা মিষ্টি স্বাদের হয়, আর পুরোনো বাদামি মানচেগো শক্ত, দানাদার ও তীব্র স্বাদের হয়ে ওঠে। লা মাঞ্চার জলবায়ু ও মাটি মানচেগো ভেড়ার দুধে এমন বৈশিষ্ট্য তৈরি করে, যা অন্য কোনো অঞ্চলে পুরোপুরি অনুকরণ করা মোটেই সম্ভব নয়। স্পেনের গর্ব বিপুল জনপ্রিয় পনিরটির আরেকটি নাম আছে, তা হলো ‘ভেড়ার দুধের স্বর্ণ’।

ইতালির মিলান নগরীতে বেড়াতে এলে পূর্ব দিকে ঘণ্টাখানেকের পথ, লোম্বার্দিয়া অঞ্চলের শান্ত শহর গরগনজোলায় পৌঁছালে প্রথমেই চোখে পড়ে সরু রাস্তা, পুরোনো স্থাপত্য আর স্থানীয় বাজারের কোলাহল। পর্যটকেরা এখানে আসেন শতাব্দীপ্রাচীন বিখ্যাত পনির গরগনজোলার স্বাদ নিতে।
ছোট্ট শহর গরগনজোলার নামেই পরিচিত বিখ্যাত এই নরম পনিরে ছড়িয়ে আছে নীল ছত্রাকের আস্তনা। প্রথম দেখাতে অনেকে মনে করতে পারেন যে পচে যাচ্ছে ঘন দুধের এই খাদ্যটি। আসলে তা নয়। এই ছত্রাকই হচ্ছে এই মজার পনিরের স্বাদ ও ঘ্রাণের উৎস।
এই পনিরটির জন্ম নিয়ে বেশ মজার একটি জনশ্রুতি আছে, সে অনেক দিন আগে এক পনির কারিগর তরুণ প্রেমিক রাত জেগে দুধ ঘন করছিল। হঠাৎ তার প্রেমিকার কথা মনে পড়ে গেল, তাই সে খুব তাড়াহুড়া করে অসমাপ্ত দুধের জমাট অংশ রেখে চলে যায় তার মনের মানুষের সঙ্গে দেখা করতে।
কয়েক দিন পরে সে ফিরে এসে নতুন দুধের সঙ্গে সেই জমাট দুধ মিশিয়ে রেখে দেয়। কয়েক সপ্তাহ পর দেখা যায়, তার ভেতর জেগে উঠেছে নীল-সবুজ শিরার মতো ছত্রাক। সেই জন্ম নিল একটি কিংবদন্তি পনির—গরগনজোলা।

খাদ্যের উৎপত্তি, ইতিহাস নিয়ে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা মনে করেন, ইতালীয় খাদ্যসংস্কৃতির এক সুস্বাদু প্রতীক গরগনজোলার উৎপত্তি প্রায় এক হাজার বছর আগে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ইতালির সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা দেশে পৌঁছে গেছে। ইউরোপীয়রা এই পনির খান রিসোত্তো, পাস্তা, পোলেন্তা কিংবা গরম গরম রুটি, তাজা ফল ও বাদামের সঙ্গে। কখনো কখনো এক ফোঁটা মধু বা আঙুরের মিষ্টি স্বাদও গরগনজোলার তীব্রতাকে অন্য মাত্রা দেয়।

গ্রিসের পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আজও একটি পুরোনো উপকথা শোনা যায়—দেবতাদের দূত হার্মিস নাকি মানুষকে প্রথম পনির তৈরির কৌশল শিখিয়েছিলেন। সেই গল্পের ছায়া যেন এখনো লেগে আছে ফেতা পনিরের গায়ে। সাদা, নরম আর হালকা নোনা-মিঠা স্বাদের এই পনির শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি গ্রিসের ইতিহাস, লোককথা ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। জলপাই, রুটি, সালাদ কিংবা আঙুরের সঙ্গে পরিবেশিত হালকা নোনা-মিঠা স্বাদের এই পনিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য উপাখ্যান। কোনো কোনো গ্রামে এখনো বিশ্বাস করা হয়, অতিথির সামনে ফেতা পরিবেশন করা মানে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধিকে আহ্বান জানানো। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রিসের কৃষিজীবী সমাজে ফেতা হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বীকৃত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে ফেতা কেবল গ্রিসেই নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে উৎপাদিত হয়। তবে আধুনিক বাণিজ্যের আগ্রাসনের মাঝেও গ্রিক জনপদের প্রবীণরা মনে করিয়ে দেন—ফেতার আসল স্বাদ শুধু দুধে নয়, বরং সেই সব গল্পে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাহাড়ের ঢালে, রাখালের বাঁশির সুরে এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাতাসে বেঁচে আছে, বেঁচে আছে এক ঐতিহ্য।

ফ্রান্সেও খুব জনপ্রিয়, এ দেশের পনিরের দোকানগুলোতে ফেতা থাকবে না, তা ভাবা যায় না। একটি বড় পাত্রে দুধের লোনা ঘোলে নিমজ্জিত চাকা চাকা করে কাটা পনিরটি হচ্ছে ফেতা। গ্রিসে বা ফ্রান্সে বেড়াতে এলে ফেতার স্বাদ না নিয়ে ফিরে গেলে তা হবে অনুতাপের।

পনির নিয়ে লিখতে গিয়ে সখ্য গড়ে উঠেছে এই স্বাদের খাবার নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গে। তাঁরা তাঁদের মজার মজার অভিজ্ঞতা আমাকে বলেন। আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনি। এমনই একজন হচ্ছে তরুণ ম্যাথিস। ম্যাথিস আমাকে বেশ বড় একটুকরা গাঢ় বাদামি রঙের পনির হাতে ধরিয়ে এর স্বাদ আর ঘ্রাণ অনুভব করতে বললেন এবং অধীর আগ্রহে আমার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকলেন।
আধা শক্ত পনির দানাদার, হালকা মিষ্টি এবং আনারসের ঘ্রাণের পনিরটির নাম লেতিভা। স্বাদ নিতেই আমি এই পনিরের ভক্ত হয়ে গেলাম এবং উচ্ছ্বসিত হয়ে ম্যাথিসকে ধন্যবাদ দিলাম। কারণ, তিনি আমাকে পনিরের জগতের একটি খুব চমৎকার পনিরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার সবুজ উপত্যকায় ছবির মতো সুন্দর একটি গ্রাম আছে, নাম লেতিভা। এখানেই এই কিংবদন্তিতুল্য পনিরটি সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস। বহু শতাব্দী আগে পাহাড়ের মানুষেরা বিশেষ জাতের কাঠের আগুনে তামার কড়াইতে গরুর দুধ ফুটিয়ে এই পনির তৈরি করত। আজকের দিনের পনিরশিল্পীরা সেই প্রাচীন পদ্ধতি অক্ষুণ্ন রেখেই লেতিভা তৈরি করে থাকেন। আজও তাই হাজার বছর আগের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, আল্পসের ঢালে বুনো ফুল ও ঔষধি গাছ খেয়ে বেড়ে ওঠা গরুর দুধেই লেতিভার অনন্য স্বাদ ও সুগন্ধের রহস্য লুকিয়ে আছে। খাবার আগে বা পরে একটুকরা লেতিভা ভোজনের আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্বায়নের যুগেও লেতিভা পনির সুইজারল্যান্ডের লোকঐতিহ্য, পর্বতজীবন এবং শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্পের এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। (চলবে)
লেখক: ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক