বউখুদা-র গল্পে মিশে আছে নারীশক্তির অনন্য উদযাপন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

এ দেশের খাদ্যসংস্কৃতির আখ্যানে যেমন গেরস্তবাড়ির গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছের গল্প আছে, ঠিক তেমনি নারী-নিগ্রহের এক অপ্রীতিকর সংস্কৃতির ছাপও খুব স্পষ্ট। বাড়ির বউদের তেঁতুলপাতায় ভাত খেতে দেওয়ার গল্পগুলো অতিকথন হলেও সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর সবার খাওয়া হলে তবেই বাড়ির বউরা খেতে বসার নিয়ম ছিল। সত্যি বলতে, এখনো তা–ই আছে। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে পেট ভরে পুষ্টিকর খাবার মেলাই দুষ্কর, সেখানে উদযাপন করে একটু বিশেষ খাবারের আয়োজন অধরাই বলা যায় বাড়ির বউদের জন্য। কিন্তু আমাদের নারীরা যেন অফুরান প্রাণশক্তির ভান্ডার। শুধু পেট ভরানো নয়, এই কঠিন প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতার মধ্যেই এ দেশের নারীরা নিজেদের মতো করে বিশেষ খাবার সহযোগে আনন্দ-উৎসব আয়োজনের পথ খুঁজে নিয়েছেন।

আদিকাল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাল ঝেড়ে–বেছে জমানো ভাঙা চাল বা খুদ দিয়ে পোলাওয়ের মতো করে তৈরি হয় বউখুদা বা বউয়া। বৃহত্তর ঢাকার কাঞ্জির ভাতের গল্পের পটভূমির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, প্রতিদিন ভাতের চাল থেকে এক মুঠ তুলে নিয়ে চুলার পাশের হাঁড়িতে রেখে কয়েক দিন ধরে বিশেষ প্রক্রিয়ায় গাঁজিয়ে বানানো কাঞ্জি বা কাঁজির চাল দিয়ে তৈরি ভাত, জাউ, লোডানিও এই বউদেরই শখের খাবার।
আবার কুমিল্লা অঞ্চলে সবার জন্য ভাত রান্নার পর নতুন আউশ ধানের মাড়, বেচে যাওয়া মাছের কাঁটাকুটো আর ঝোলের সঙ্গে কাঁচা তেঁতুল আর ধনেপাতা-কাঁচা মরিচে বানানো অত্যন্ত উপাদেয় বিবির ডালের ইতিহাসটিও একই রকমের। কিছুটা ফেলনা উপকরণ দিয়ে তৈরি এই খাবারের আয়োজনগুলো একসময় শুধুই বাড়ির বউ-ঝিদের জন্য হতো। অথচ এই খাবারগুলোর প্রতিটিই এখন ডেলিকেসি বলে বিবেচিত হয়।

বিজ্ঞাপন

বউখুদার গল্পে ফিরে আসা যাক। খুদের এই ভাত রান্না করতে প্রথমে শুকনা মরিচ, রসুন আর কালিজিরার ফোড়ন পড়ে ঐতিহ্যগতভাবে। আর এর সঙ্গে সবার কাছ থেকে এটা–সেটা মিলে যা পাওয়া যেত, তা দিয়ে করা হতো বিভিন্ন রকমের ভর্তা। আলু, বেগুন, টমেটো, শিম, উচ্ছের মতো সবজির পাশাপাশি পটোল বা কুমড়ার খোসার ভর্তাও করা হতো। শুঁটকি, চ্যাপা শুঁটকি, গুঁড়া মাছের মাথা, চিংড়ির খোসা বেটে পাওয়া নির্যাস—সবকিছুর ভর্তাই দারুণ উপাদেয় বউখুদার সঙ্গে।

তবে আর যা–ই থাকুক, সঙ্গে লাল টুকটুকে মরিচবাটা থাকতই। সব বাধা উপেক্ষা করে, সব প্রতিকূলতার মধ্যে, সীমিত সাধ্যের মধ্যে নিজেদের মতো এভাবেই একটু হাসি-আনন্দ খুঁজে নিয়ে পেট পুরে খেয়ে ভালো একটি দিন কাটত বউ-ঝিদের। নারীশক্তির আনন্দ-উদযাপনের এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

বউখুদা এখন এ দেশের খাদ্যসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী খাবারগুলোর একটি বলে বিবেচিত হয়। বাঙালিয়ানার উৎসবে বা বড় রেস্তোরাঁর মেনুতে হালে স্থান করে নিয়েছে বিভিন্ন রকমের ভর্তা আর বউখুদার প্ল্যাটার।

তবু এর নামটি চিরকাল গ্রামবাংলার বউদের কথা মনে করিয়ে দেবে, যাঁরা সব প্রতিকূলতার মধ্যেও সমবেত আনন্দ–উদযাপনের উপলক্ষ তৈরি করতে পারে আপন শক্তিতে। এই বউখুদার মূলমন্ত্রে সব বাধা পেরিয়ে সমাজের সর্বস্তরের নারীর হাসি-কলতানে মুখরিত হোক, উদযাপিত হোক আজকের নারী দিবস।

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮: ০০
বিজ্ঞাপন