
পানি হচ্ছে পৃথিবীর জীবন, আর দুধ হচ্ছে পৃথিবীর আত্মা—এ রকম একটি প্রবাদ আছে জানি। জন্মের পর যে খাদ্য প্রায় সব মানবশিশুর মুখে প্রথম তুলে দেওয়া হয়, তা হলো দুধ। সাদা রঙের এই তরল খাদ্য সাধারণভাবে সুপাচ্য ও অত্যন্ত পুষ্টিকর। দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের প্রতি মানুষের প্রবল আকর্ষণ সেই প্রাচীনকাল থেকে। বলা চলে মানবতার উষাকাল থেকেই মানুষ এই খাদ্যকে তাঁর খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছে। দই, ননি, ঘোল আর মাখন ছাড়িয়ে দুগ্ধজাত যে খাদ্যটি আজও বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়, তা হলো ‘পনির’। প্রায় ১০ হাজার বছর আগে নব্যপ্রস্তরযুগ থেকে অর্থাৎ যখন থেকে মানুষ চাষাবাদ ও পশুপালন শুরু করেছিল, তখন থেকেই মানুষের রসনা মিটিয়েছে এই মজার স্বাদের পনির।

বিশ্বের প্রাচীনতম পনির কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তরে গবেষকেরা তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কোনো কথা বলে চান না। তবে পৃথিবীর দেশে দেশে অনবরত খোঁড়াখুঁড়ি, গবেষণা, অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে পড়েছে তিন হাজার বছরের পুরোনো পনির। মিসরের এক সমাধিতে মেষ ও ছাগল আঁকা একটি পাত্রে রক্ষিত ছিল এই পনির। তবে এর স্বাদ কেমন ছিল, তা জানা যায়নি। এই প্রাচীন খাদ্যে অনেকে চোখে দেখলেও, তা চেখে দেখার দুঃসাহস কেউ করেননি। কারণ, এই পনিরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাঁটি গেড়েছিল মানুষের জন্য এক ভীষণ ভয়ংকর প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া, ব্রুসেলা। অনেকটাই যেন রূপকথায় গুপ্তধনে সঞ্চিত অঢেল মণিরত্ন পাহারায় থাকা বিষধর শঙ্খচূড় বা রাজ গোখরার মতো।
প্রাচীনতম পনির নিয়ে বিজ্ঞানী, গবেষকেরা এখনো তাঁদের শেষ কথা বলেননি। তবে সবকিছুতেই চীনারা যেন এক পা এগিয়ে। ২০০৩ সালে উত্তর-পশ্চিম চীনের জিয়াওহে সমাধিতে একটি মানবমমির ৩ হাজার ৬০০ বছর ধরে গলার কাছে আটকে থাকা তিন টুকরা পনির খুঁজে পান প্রত্নতাত্ত্বিকেরা।

মমিটি ছিল ফ্যাশনদুরস্ত একজন নারীর। পায়ে চামড়ার বুট জুতা, গলায় একাধিক কণ্ঠহার, মাথায় নকশা করা হ্যাট অর্থাৎ টুপি আর পরনে চমৎকার পোশাক। সময়ের থাবা এড়িয়ে প্রায় অক্ষত। গবেষকদের দাবি, প্রাচীন নারীর কণ্ঠহারে লেগে থাকা পনিরই হচ্ছে এ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া প্রাচীনতম পনির।
পনির তৈরি ও প্রথম জাদুকরি স্বাদ আস্বাদনের দাবি করে বেশ কয়েকটি দেশের মানুষেরা বেশ গর্বিত। তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ দেশকে পনিরের জন্মস্থান অর্থাৎ আদিস্থান বলে দাবি করেন! প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও ইসরায়েলে ৯ হাজার ৫০০ বছরের প্রাচীন পনিরের ছাঁচের নিদর্শন খুঁজে পেয়েছেন। পোল্যান্ড হলো প্রথম ইউরোপীয় দেশ, যেখানে ৮ হাজার বছর পুরোনো পনিরের ছাঁচ পাওয়া গেছে।
তবে মানুষের ইতিহাস, জীবনধারা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা জানিয়েছেন যে আরও বহু আগে থেকে মানুষ পনিরের অস্তিত্ব, স্বাদ সম্পর্কে অবহিত ছিল। তাঁদের মতে, প্রাচীন মানুষেরা স্তন্যপায়ী পশুশাবক শিকার করলে, সেসব পশুর পাকস্থলীতে সদ্য পান করা মা পশুর দুধ জমাট বেঁধে পনিরে পরিণত হতো। শিকার করা পশুশাবকের পেট চিরে শিকারিরা, প্রাচীনকালের মানুষেরা জমাট বাঁধা অর্ধ হজম হওয়া দুধ অর্থাৎ পনির খেত। তবে এ তথ্যটি শুধু অনুমাননির্ভর, এর সপক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রথমদিকে পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রায় প্রাকৃতিকভাবে পাত্রে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়ার কারণে দুধ জমে যেত। আমরা প্রচলিত ভাষায় বলে থাকি ‘দুধ ফেটে যাওয়া’। অর্থাৎ জলীয় অংশ থেকে দুধের উপাদানগুলোর একটি অংশ জমাট বেঁধে আলাদা হয়ে যাওয়া। আবার দুধ বহন করা বা রাখার জন্য তৃণভোজী প্রাণীর পাকস্থলী দিয়ে তৈরি আধারের আস্তরণে লেগে থাকা রেনেটের (অনেকগুলো এনজাইম একত্রে) প্রভাবে দুধ জমাট বেঁধে একধরনের পনির, বলা ভালো পনিরসদৃশ খাদ্যের সৃষ্টি হতো। আদিম মানুষেরা এভাবেই এই খাদ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল। এতে করে সহজেই অনুমান করা যায় যে সেই আদিকালের পনির ছিল অনেকটাই বিস্বাদের। মানুষ তখনো স্বাদকে প্রাধান্য দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছেনি, তাদের কাছে তখন জীবনধারণ করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
রোমান সেনাবাহিনী ফ্রান্সে পনিরের প্রসারের বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ দেশে মধ্যযুগ পর্যন্ত পশুপালন সত্যিকার অর্থে বিকশিত হয়নি। সেই সময়ে, ফ্রান্স ছিল গাছগাছালিতে ঢাকা বিশাল এক বনভূমি। পশুপালনের জন্য প্রয়োজনীয় চারণভূমি ছিল না। প্রয়োজনীয় চারণভূমির অভাবে পশুপালন অনেকটাই অবহেলিত ছিল। পরে ঘরবাড়ি, আসবাব ও জাহাজ নির্মাণের জন্য কাঠের উচ্চ চাহিদা মেটাতে বনভূমিগুলোর বেশ অনেকটাই উজাড় করা হয়েছিল। চারণভূমি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পশু লালনপালন বৃদ্ধি পায়। কুটিরশিল্প পর্যায়ে দুধ, দই, ননি, মাখনের সঙ্গে গৃহস্থের ঘরে পানিরও একটি বিশেষ জায়গা দখল করে। এরপর বিভিন্ন ছাঁচে ফেলে আরও কায়দাকানুন করে মানুষ নানা স্বাদের পনির তৈরিতে দক্ষ হয়ে উঠতে শুরু করে। আজও এ দেশের মানুষেরা নানা স্বাদের, ঘ্রাণের, গঠনপ্রকৃতির পনির উদ্ভাবনের লক্ষ্যে নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির বিস্ময়কর উত্থান প্রভাব ফেলেছে খাদ্যসংস্কৃতিতে। গড়ে উঠেছে এক আলাদা রুচি এবং খাদ্যাভ্যাস।

মানুষের সব থেকে প্রিয় তরল খাদ্য, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য। অথচ এই সফেদ সাদা, পুষ্টিকর তরল খাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র, অতি ভয়ংকর প্রাণঘাতী অণুজীব, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া। যার কারণে পনিরের প্রধান উপকরণ দুধের মতো এমন চমৎকার খাদ্যটি মানুষের জন্য অনেক সময় ‘বিষ’ হতে পারে। মানুষকে এই ‘অদৃশ্য বিষ’ থেকে মুক্তি দিতে এগিয়ে আসেন একজন জাদুকর, ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর (১৮২২-১৮৯৫)। তিনি ১৮৬৫ সালে উদ্ভাবন করেন পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি।

এই পদ্ধতি অনুসরণ করে দুধ খুব অল্প সময়ের (১৫ সেকেন্ড) জন্য উচ্চ তাপমাত্রায় (সাধারণত ৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) উত্তপ্ত করার পর পরই দ্রুত তাপমাত্রা কমিয়ে আনলে, দুধের মধ্যে থাকা অধিকাংশ অণুজীব নির্মূল হয়। লুই পাস্তুরের এই আবিষ্কার সমগ্র পৃথিবীতে তরল খাদ্য, বিশেষ করে মানুষের সব থেকে প্রিয় তরল খাদ্য, দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন এবং পরিবর্তনে এক বিপ্লবের সূচনা করে।

ফ্রান্সে সত্যিকার অর্থে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে পনির উৎপাদন প্রসার লাভ করে। তখনকার গণনানুসারে প্রায় হাজারের বেশি পনির ছিল এ দেশে। লুই পাস্তুরের আরেকটি বিস্ময়কর উদ্ভাবন পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতি উদ্ভাবন ফরাসি দেশে পনির উৎপাদন আলাদা মাত্রায় উন্নীত হয়।

বর্তমানে সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নানা কায়দায়, কৌশলে পনির উৎপাদনের বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলেছে শিল্পের সখ্য, রুচির অনন্য উৎকর্ষতা। প্রতিটি পনিরের আছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিছু কিছু পনিরের জনপ্রিয়তা ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অনেক পনির বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে, পরিণত হয়েছে স্বকীয়তায় কিংবদন্তিতে।
লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী লেখক।
ছবি: লেখকের সৌজন্যে