
ইস্তাম্বুল ইতিহাসে মোড়া এক শহর। অলিগলি থেকে রেস্তোরাঁর খাবারের পেছনে লুকিয়ে আছে শতাব্দীর গল্প। মধ্য এশিয়ার যাযাবর তুর্কি গোত্রের সহজ খাবার থেকে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজকীয় রান্নাঘর আর নিউ-ক্ল্যাসিক ইস্তাম্বুলের ব্যস্ত রাস্তায় বিক্রি হওয়া স্ট্রিট ফুড—সবকিছুতেই ফুটে ওঠে তুর্কি খাবারের বহুমাত্রিক পরিচয়। রাস্তার সিমিত, ধোঁয়া ওঠা কফি, কাবাবের সুগন্ধ—এসব শুধু স্বাদই দেয় না; বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনের গল্পও বলে। সম্প্রতি এই জাদুনগরী ঘুরে এসে দারুণ সব খাবারের লোভনীয় গল্প সাজিয়েছেন নাদিয়া ইসলাম

রিং সিমিতের গল্প শুরু বহু শতাব্দী আগে; অটোমান আমলের ইস্তাম্বুলে। ষোড়শ শতাব্দী থেকে তিলে মোড়া এই গোলাকার রুটি শহরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। বেক করার আগে আঙুরের সিরাপে ডুবিয়ে তিল ছড়ানোর পদ্ধতি একে দেয় বিশেষ স্বাদ ও রং। বাইরে খসখসে, ভেতরে নরম এই রুটি ইস্তাম্বুলের রাস্তায় সকালে গরম–গরম বিক্রি হয়। চা বা পনিরের সঙ্গে এটি এই রুটি তুর্কিদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।রিং সিমিতের গল্প শুরু বহু শতাব্দী আগে; অটোমান আমলের ইস্তাম্বুলে। ষোড়শ শতাব্দী থেকে তিলে মোড়া এই গোলাকার রুটি শহরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। বেক করার আগে আঙুরের সিরাপে ডুবিয়ে তিল ছড়ানোর পদ্ধতি একে দেয় বিশেষ স্বাদ ও রং। বাইরে খসখসে, ভেতরে নরম এই রুটি ইস্তাম্বুলের রাস্তায় সকালে গরম–গরম বিক্রি হয়। চা বা পনিরের সঙ্গে এটি এই রুটি তুর্কিদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।


চোরবাসি বা লেন্টিল স্যুপ তুরস্কের অন্যতম প্রাচীন ও ঘরোয়া খাবার। অটোমান আমল থেকেই এটি শ্রমজীবী মানুষ ও ভ্রমণকারীদের জন্য পুষ্টিকর খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। লাল মসুর ডাল, পেঁয়াজ ও সহজ মসলার মিশ্রণে তৈরি এই স্যুপ তুর্কির হোম ফুডের একটি চিরচেনা অংশ। স্ট্রিট ফুড হিসেবে চোরবাসি ইস্তাম্বুলে বিশেষ জায়গা দখল করেছে। ভোরে বা গভীর রাতে ছোট দোকানগুলোয় ধোঁয়া ওঠা গরম স্যুপ পরিবেশন করা হয়। মসলাদার স্বাদ, হালকা মিষ্টি টোন এবং বাটার-অলিভের সুবাস মিশে তৈরি করে এক অসাধারণ স্বাদ।


স্ট্রিট ফুড হিসেবে মিডিয়া দোলমা ইস্তাম্বুলের উপকূলীয় এলাকায় বিশেষভাবে জনপ্রিয়। বিশেষ করে বসফরাস ও গালাটা সারাইয়ের পাশের রেস্তোরাঁগুলোয় বিকেল হলেই ভোজনরসিকদের ভিড় দেখা যায়। ঝিনুকের খোলের ভেতরে ভরা সুগন্ধি ভাত, মসলা ও হার্বস, ওপরে লেবু ও চিলি ফ্লেক্স প্রতি গ্রাসে স্বাদের ভিন্নতা মুগ্ধ করে। অটোমান আমলের সমুদ্রনির্ভর খাবারের ঐতিহ্য থেকেই এর উৎপত্তি। হাতে ধরে খাওয়ার এই স্ট্রিট ফুডে লেবুর টক স্বাদ যোগ হয়, যা ইস্তাম্বুলের সামুদ্রিক খাবারের ভিন্নতা দারুণভাবে তুলে ধরে।

লাহমাজুন তুরস্কের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড, যা ট্র্যাডিশনাল তুর্কি পিৎজা বলা হয়। এর বিশেষত্ব হলো পাতলা রুটির ওপর মসলাদার কিমা, টমেটো ও হার্বস ছড়িয়ে দ্রুত বেক করা হয়। সহজ উপকরণে পেটভরা খাবার তৈরির চিন্তা থেকে অটোমান-পূর্ব আনাতোলিয়া অঞ্চলে উদ্ভব হয় এই খাবারের। আধুনিক ইস্তাম্বুলে মাংস, টমেটো সস বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি লাহমাজুন জনপ্রিয় পথের খাবার। লাহমাজুনের ইতিহাস জানতে বহু শতক পেছনে আনাতোলিয়ার প্রাচীন অটোমান ও পারস্য প্রভাবিত অঞ্চলে ফিরে যেতে হয। তখনকার কৃষক ও যাযাবরেরা সহজ ও পুষ্টিকর খাবারের প্রয়োজনীয়তা থেকে পাতলা রুটির ওপর মসলাদার মাংস রাখার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। সময়ের সঙ্গে এটি রাজপ্রাসাদ থেকে সাধারণ বাজারে এসে পৌঁছায় এবং আজও ইস্তাম্বুলের রাস্তায় স্ট্রিট ফুড হিসেবে মানুষের প্রিয়। ইস্তাম্বুলে পৌঁছে সন্ধায় এর স্বাদ নিয়েছিলাম; লবণ, জলপাই তেল আর মাংসের স্বাদ মনে রাখার মতো।

তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী আইসক্রিমকে বলা হয় দোন্ডুরমা। এটি সাধারণ আইসক্রিমের চেয়ে ঘন এবং লাঠির মতো টেক্সচারযুক্ত, কারণ এতে স্যালেপ নামক অর্গানিক স্টার্চ ও মাস্টিক রেজিন ব্যবহার করা হয়। ইস্তাম্বুলের রাস্তায় বিক্রেতারা লম্বা লাঠি দিয়ে দোন্ডুরমা পরিবেশন করে, খাওয়ার সময় মজার খেলার মাধ্যম আনন্দ দেয় পর্যটকদের। ইতিহাসে এটি অটোমান যুগ থেকে তুর্কি মিষ্টান্ন সংস্কৃতির অংশ, এর উৎপত্তি তুরস্কের মারাশ অঞ্চলে, যা আজও তুর্কি মিষ্টান্ন সংস্কৃতির অংশ হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

হেরেম সুলতান কাবাব তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী ও আকর্ষণীয় কাবাব, যা মূলত মাটির পাত্রের (টেসটি বা জাগ) মধ্যে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। এতে কিউব করা ভেড়া বা মুরগির মাংস, টমেটো, সবুজ ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ, রসুন, লেজের চর্বি ও মসলা মিশিয়ে টক দইয়ের বিশেষ মিশ্রণের ওপর পরিবেশন করা হয়। পরিবেশনের সময় পাত্রটি ভেঙে খোলা হয়, যা নাটকীয়তা যোগ করে। নামকরণ করা হয়েছে অটোমান সুলতান সুলেমানের স্ত্রী হেরেম সুলতানের নামে, যা রাজকীয় ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।

তুরস্কের পিলাভ একটি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী রাইস ডিশ। সাধারণত চালকে মাখন বা তেলের সঙ্গে হালকা ভেজে তারপর ব্রথে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়, যাতে এটি নরম ও ফ্লাফি হয়। কখনো শেহরিয়ে, টমেটো, ছোলা বা চিনাবাদামও যোগ করা হয়। পিলাভ কাবাব, স্টু বা অন্যান্য মেইন ডিশের পাশে পরিবেশন করা হয়, আবার দইয়ের সঙ্গে খেতেও সুস্বাদু। ডোমাটেসলি পিলাভের মতো ভিন্ন ধরন এটিকে তুর্কি রান্নার অনন্য রন্ধনশৈলীর প্রতীক করে। আদানা কাবাবের সঙ্গে আমরা খেয়েছিলাম। ঝাল নয়, তবু সতেজ স্বাদ মনে রাখার মতো।

তুরস্কের আইরান একটি প্রচলিত দইয়ের ঠান্ডা পানীয়, যা আমাদের দেশের লাবাং বা মাঠার মতো স্বাদের হয়ে থাকে। এটি দই, পানি ও সামান্য লবণ মিশিয়ে ফেনাযুক্ত করে তৈরি করা হয়। স্ট্রিট ফুড হিসেবে এটি কাবাব, পিলাভ বা অন্যান্য তেলযুক্ত খাবারের সঙ্গে খাওয়া হয়, যা স্বাদকে ভারসাম্যপূর্ণ করে এবং হজমে সহায়তা করে। ইতিহাসে এটি শতাব্দীপ্রাচীন, আনাতোলিয়ার কৃষক ও যাযাবরদের জন্য সহজ ও পুষ্টিকর পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

তুরস্কের লোটাস মুহলাবি একটি ক্রিমি এবং সুস্বাদু ডেজার্ট, যা স্ট্রিট ফুড হিসেবে ছোট ক্যাফে ও বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। দুধ, চিনি ও কর্নস্টার্চ দিয়ে তৈরি এই মুহলাবির ওপরে লোটাস কুকিজ বা কারামেল ক্রিস্প ছড়ানো হয়, যা স্বাদকে আরও সমৃদ্ধ করে। মুহলাবির ইতিহাস প্রাচীন অটোমান ও পারস্য মিষ্টান্ন সংস্কৃতির ভিত্তি করে তৈরি, যা আজও তুর্কিদের ঘরে ঘরে এবং রাস্তায় জনপ্রিয়। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত হাফিজ মুস্তফার দোকানে হেজেলনাট লাতের সঙ্গে নেওয়া লোটাস মুহলাবির স্বাদ মুখে লেগে আছে। জানা যায়, এই মিষ্টি এখনো ৩০০ বছরের পুরোনো রেসিপি অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়।


ললিপপ মিষ্টি গালাতা টাওয়ারের চারপাশে সহজেই দেখা যায় এই রঙিন ললিপপ–জাতীয় মিষ্টি, যা তুর্কি মাকুন নামে পরিচিত। এটি চিনি, মধু, চকলেট, লেবু, কমলা ও প্রাকৃতিক রং দিয়ে তৈরি হয়। শতাব্দী ধরে তুর্কি বাজার ও উৎসবে বিক্রি হয়ে আসছে। শীতল বা গরম—উভয় মৌসুমে এবং বিশেষ উৎসব বা পর্যটকসমাগমে এর চাহিদা বেশি। রঙিন দড়িতে মোল্ড করা স্টিক যেমন নজর কাড়ে, তেমনি নরম ও মিষ্টি স্বাদ শিশু-বয়স্ক, সবাইকে আনন্দ দেয়। অটোমান যুগ থেকে এটি শহরের বাজারের আনন্দদায়ক স্ট্রিট ফুড হিসেবে পরিচিত।
ছবি: লেখক