
আফ্রিকার কোনো কোনো দেশে অবশ্য রীতিমতো প্রধান খাদ্য এই অদ্ভুতদর্শন সবজি। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বেশ জনপ্রিয় এটি। নাম তার মেটে আলু। অঞ্চল ভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত এই সবজি।যেমন মোম আলু, চুপরি আলু, মাইট্যা আলু, প্যাচড়া আলু, গাছ আলু, মাছ আলু, মাচা আলু ইত্যাদি।মেটে আলুর গাছ একটি একবীজপত্রী লতানো উদ্ভিদ। ইংরেজিতে গ্রেটার ইয়াম বা উইংড ইয়াম বলা হয়।

মাটির নিচে জন্মানো এই বিশাল আলুর ওজন ২ কেজি থেকে শুরু করে ৫০-৬০ কেজিও হয়ে থাকে। কোনোটি ডিম্বাকৃতি বা লম্বাটে আবার হাতির পা বা হরিণের মাথার মতও হয়ে থাকে। এই আলু চার পাঁচ জাতের হলেও আমাদের দেশে সাধারণত এক জাতেরই হয়ে থাকে। জাতভেদে এর রং ধূসর, কালো, গোলাপি ও মেটে রঙের হয়। মাটির নিচের এই আলু ছাড়াও এ লতানো গাছে ছোট ছোট ডিম্বাকৃতির ১০০- ১৫০ গ্রাম ওজনের আলু হয়। গাছে ঝুলে থাকা এই ছোট আলুই বীজ হিসেবে ব্যবরিত হয়। এই গাছ এক মৌসুমে ফল দিয়েই মারা যায়। পরের বছর মুল থেকে নতুন করে চারা গজায়।
বাণিজ্যিকভাবে আমাদের দেশে এর চাষাবাদ তেমন একটা দেখা না গেলেও গ্রামাঞ্চলের সব জেলাতেই বাড়ীর চারপাশে, আঙিনায়, বেড়ার ধারে এই গাছ লাগানো হয়। ছাদেও এখন অনেকেই লাগাচ্ছেন।
সারা বছর এই আলু তেমন দেখা না গেলেও শীত এলেই বাজারে পাওয়া যায় মেটে আলু।
এই আলু স্বাদে যেমন অনন্য পুষ্টিগুণেও এর জুড়ি নেই। এই আলু অন্যান্য সবজির মতোই ভর্তা, মাছ ও মাংস দিয়ে রান্না করে খাওয়া হয়।

অনেকে শুঁটকি দিয়েও রান্না করেন। কেউ আবার সেদ্ধ করে আলু গলিয়ে ডালও রান্না করে খান। গ্রামে মেটে আলু খোসাসহ চুলার আগুনে পুড়িয়েও খাওয়ারও প্রচলন আছে।

জনপ্রিয় স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথ লাইন ও হেলথ বেনিফিট টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, মেটে আলুতে রয়েছে উচ্চমাত্রায় ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেট। এছাড়া এতে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফাইবার, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রনসহ নানা খনিজ উপাদান।

প্রতি ১০০ গ্রাম মেটে আলুতে রয়েছে
ক্যালরি- ১৪০ গ্রাম,
কার্বোহাইড্রেট- ২৭ গ্রাম
প্রোটিন- ১ গ্রাম
চর্বি- ০.১ গ্রাম
ফাইবার- ৪ গ্রাম
সোডিয়াম- ০.৮৩ শতাংশ
পটাসিয়াম- ১৩.৫ শতাংশ
ক্যালসিয়াম- ২ শতাংশ
আয়রন- ৪ শতাংশ
ভিটামিন সি- ৪০ শতাংশ
ভিটামিন এ- ৪ শতাংশ

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে
এই আলুতে রয়েছে ভিটামিন এ ও প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
এতে রয়েছে প্রচুর আঁশ, পটাসিয়াম, ভিটামিন সি ও ভিটামিন এ। এসব উপাদান হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এটি হার্টের কোলেস্টেরলের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখে।
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়
মেটে আলুতে রয়েছে ফোলেট, যা ডিএনএ তৈরি ও সংস্কারে সহায়তা করে। ফলে শরীরে থাকা ক্যান্সারের কোষগুলো ধ্বংস হয়। তাই এটি নিয়মিত খেলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।

কোলেস্টেরল কমায়
মেটে আলুতে থাকা ভিটামিন সি, মিনারেল ও পটাসিয়াম শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটি ওজন কমাতে বেশ কার্যকরী।
শক্তি বৃদ্ধি করে
মেটে আলুতে রয়েছে প্রচুর শর্করা, যা শরীরের শক্তি বৃদ্ধিতে ভালো ভূমিকা রাখে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে
রক্তচাপ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে সোডিয়াম। মেটে আলুতে সোডিয়ামের মাত্রা একেবারেই কম। তবে এতে থাকা অন্যান্য খনিজ উপাদান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা
এই আলুতে রয়েছে আয়রন ও ক্যালসিয়াম, যা হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দারুণ ভূমিকা রাখে।

ত্বকের সুরক্ষা নিশ্চিত করে
ত্বক টানটান ও ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য খাদ্যতালিকায় মেটে আলু রাখুন। এটি ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়তা করে।
চুল পড়া কমায়
এই আলুতে রয়েছে ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, জিংক, নিয়াসিন ও আয়রন। এসব উপাদান চুল পড়া কমায়।
হজমশক্তি বৃদ্ধি করে
হজমের জন্য প্রয়োজন আঁশযুক্ত খাবার। মেটে আলুতে রয়েছে প্রচুর খাদ্যআঁশ, যা খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে।
ছবি: সেলিনা শিল্পী
তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন ও হেলথ বেনিফিট টাইমস।