
এক বিখ্যাত পরিব্রাজক বলেছিলেন, কোনো জায়গার আসল স্বাদ পেতে হলে সেখানকার স্থানীয় পথখাবার খেয়ে দেখতে হয়। কথাটি আমার বেশ মনে ধরে। তাই নতুন কোনো শহরে গেলে চেষ্টা থাকে স্থানীয় মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার। কারণ, একটি এলাকার খাবারের মধ্য দিয়েই তার মানুষ, জীবনযাপন আর খাদ্যসংস্কৃতিকে খুব কাছ থেকে অনুভব করা যায়।

টাঙ্গাইলে গিয়েও তাই মিষ্টির বাইরে খুঁজছিলাম এমন কোনো খাবার, যা শহরের মানুষের প্রতিদিনের অভ্যাসের সঙ্গে মিশে আছে। সেই খোঁজেই পৌঁছে গেলাম জেলা জজ কোর্টের পাশের সড়কের জনপ্রিয় ঝাল চাপড়ির দোকানগুলোতে। জেলা জজ কোর্টের পাশে বিক্রি হয় বলেই স্থানীয়দের মুখে মুখে এর নাম হয়েছে ‘ডিস্ট্রিক কেক’।
কেক নয়, এ এক বিশাল চাপড়ি
নামটা শুনেই কৌতূহল জাগে—কেক কোথায়, আর চাপড়ি রুটি কোথায়?
দোকানের সামনে দাঁড়াতেই অবশ্য নামের রহস্যটা বুঝতে বেশি সময় লাগল না। রাস্তার পাশে মাটির চুলা, তার ওপর বিশাল গোলাকার তাওয়া।

তাওয়ার ওপর তৈরি হচ্ছে বিশাল আকারের চাপড়ি। কেউ গরম চাপড়ি নিয়ে বসেছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন পরেরটির জন্য। স্থানীয়দের কাছে এটি স্রেফ চাপড়ি। আর মজার ছলে, জেলা জজ কোর্টের পাশের এই খাবারই পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘ডিস্ট্রিক কেক’ নামে।
বিশাল এক চাপড়ির কারিগরি
টাঙ্গাইল শহরের জেলা জজ কোর্টের পাশের সড়কে হাঁটলে চোখে পড়ে সারি সারি ছোট খাবারের দোকান। প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনেই মাটির চুলা, তার ওপর বিশাল তাওয়া। সেই তাওয়াতেই তৈরি হচ্ছে একেকটি বড়সড় চাপড়ি। চাপড়ির মূল উপকরণ চালের গুঁড়া। এর সঙ্গে মেশানো হয় ময়দা, ডালবাটা, হলুদ, লবণ ও কালিজিরা। প্রথমে এসব উপকরণ দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। এরপর কালিজিরা মেশানো উষ্ণ গরম পানি দিয়ে ময়ান দেওয়া হয়।

তারপর শুরু হয় আসল কারিগরি। হাতে করে ময়ান নিয়ে বিশাল তাওয়ার ওপর চেপে চেপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। হাতের নিপুণ কৌশলে ধীরে ধীরে তৈরি হয় গোলাকার চাপড়ি। কোনো কোনো চাপড়ির আকার ২৪ ইঞ্চি, আবার কখনো তা ৩৬ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।
এত বড় চাপড়ি একজনের পক্ষে খাওয়া কঠিন। তাই তাওয়া থেকে নামানোর পর বিক্রি করা হচ্ছে দা দিয়ে কেটে। দ্রুত তিন কোনা আকৃতিতে কেটে ছোট ছোট টুকরা করে পরিবেশন করা হয় এই ঝাল কেক।

বিশাল রুটি যখন আগুনের আঁচে সেঁকা হয়, চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে গরম আটার সঙ্গে মিশে থাকা ধোঁয়া আর মসলার ঘ্রাণ। রুটি নামানোর পর সেটি পুরোপুরি কেটে দেওয়ার আগেই অনেক সময় একের পর এক টুকরা চলে যায় ক্রেতাদের হাতে। জানতে পারলাম, প্রতিদিন প্রায় দুই মণ পর্যন্ত ময়ান তৈরি হয়। অর্থাৎ ছোট ছোট এই দোকানগুলোর আড়ালে প্রতিদিন চলে বেশ বড়সড় এক আয়োজন।
আগুনের আঁচেই স্বাদের রহস্য
চাপড়ির বিশেষত্ব শুধু এর বিশাল আকারে নয়, তৈরির পদ্ধতিতেও। এটি তেলে ভাজা হয় না। মাটির চুলায় লাকড়ির আগুনের আঁচে সেঁকে তৈরি করা হয়। ফলে রুটির বাইরের অংশে আসে হালকা মচমচে ভাব, আর স্বাদের সঙ্গে মিশে থাকে কাঠের আগুনের ধোঁয়া ও মাটির চুলার আলাদা ঘ্রাণ। সাধারণ কিছু উপকরণ, কিন্তু আগুনের আঁচ আর তৈরির কৌশল সেই সাধারণ খাবারকেই এনে দিয়েছে আলাদা স্বাদ।
ভর্তার ঝালে জমে ওঠে চাপড়ি
চাপড়ি একা খাওয়ার খাবার নয়। এর আসল মজা যেন জমে ওঠে সঙ্গে থাকা ভর্তা আর মাখায়। প্রায় সব দোকানেই থাকে আলুভর্তা, ধনেপাতাভর্তা, পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচের ঝাঁজ। আমি যে চাপড়ি খেয়েছিলাম, তার সঙ্গে ছিল আলুভর্তা এবং পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ দেওয়া ধনেপাতাভর্তা। দুটিই ছিল বেশ ঝাল।


চাপড়ির সেঁকা স্বাদের সঙ্গে ভর্তার ঝাল, পেঁয়াজের ঝাঁজ আর কাঁচামরিচের তীব্রতা মিলে বেশ জমে উঠেছিল পুরো ব্যাপারটি। আর দাম? ভর্তাসহ এক টুকরা চাপড়ি মাত্র ২৫ টাকা। আকারে এমন বড় যে অনায়াসে দুজন মিলে খাওয়া যায়। অল্প খরচে পেট ভরে, আবার পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের স্থানীয় খাবারের স্বাদও।
সকালের নাশতায় স্থানীয়দের পছন্দ
চাপড়ি যে শুধু পথচারী কিংবা কৌতূহলী ভোজনরসিকদের খাবার নয়, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললেই তা বোঝা যায়। টাঙ্গাইলের ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির জানালেন, তাঁর প্রতিদিনের সকালের নাশতার তালিকায় থাকে চাপড়ি রুটি। অর্থাৎ তাঁর কাছে এটি কোনো নতুন বা ব্যতিক্রমী খাবার নয়; বরং প্রতিদিনের পরিচিত স্বাদ।
রিকশাচালক মতিন মিয়ার কথায় উঠে এল খাবারটির আরেকটি দিক। তাঁর ভাষায়, ‘এত কম দামে এর চেয়ে ভালো খাবার আর কোথাও নেই। আর স্বাদও দুর্দান্ত।’

দোকানের কর্মচারী উজ্জ্বল মিয়া জানালেন, শুধু টাঙ্গাইল শহরের মানুষই নন, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও অনেকে এই চাপড়ি খেতে আসেন। মধুপুর, সখীপুর, ঘাটাইলসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসেন ‘ডিস্ট্রিক কেক’-এর স্বাদ নিতে।
তবে এই স্বাদ পেতে হলে সময়টাও মনে রাখতে হবে। চাপড়ি মূলত সকালের খাবার। দিনের প্রথম বেলাতেই এর আয়োজন জমে ওঠে। বিকেলে গেলে হয়তো সেই বিশাল তাওয়ার ওপর চাপড়ি তৈরির দৃশ্য আর পাওয়া যাবে না।
সাজসজ্জা নেই, আছে মানুষের টান
চাপড়ির দোকানগুলোর পরিবেশ খুব সাধারণ। রাস্তার পাশে ছোট দোকান, সামনে মাটির চুলা, তার ওপর বিশাল তাওয়া। কোথাও কয়েকটি বেঞ্চ, কোথাও সাধারণ চেয়ার। শহুরে রেস্তোরাঁর ঝকঝকে সাজসজ্জা নেই, নেই কৃত্রিম আভিজাত্য। আছে আগুনের আঁচ, গরম রুটির গন্ধ আর খাবারের জন্য অপেক্ষা করা মানুষের ভিড়।

সবচেয়ে দারুণ দৃশ্য তৈরি হয় তাওয়া থেকে চাপড়ি নামানোর সময়। গরম রুটি নামিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই তিন কোনা করে কাটা হচ্ছে। একের পর এক টুকরা চলে যাচ্ছে ক্রেতাদের হাতে। কেউ দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন, কেউ বাড়ির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। শ্রমজীবী মানুষ থেকে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী থেকে পথচারী—নানা শ্রেণি–পেশার মানুষকে এখানে দেখা যায়। আদালতপাড়ার ব্যস্ততার মধ্যেও চাপড়ির দোকানগুলো ঘিরে তৈরি হয় খাবারপ্রেমীদের ছোট্ট এক জগৎ।
একটি শহরের খাবার, একটি শহরের গল্প
স্থানীয়দের কাছে চাপড়ি শুধু সস্তা ও পেটভরা একটি নাশতা নয়। সময়ের সঙ্গে এটি টাঙ্গাইল শহরের খাদ্যসংস্কৃতিরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে। জেলা জজ কোর্টের পাশের সড়কে সারি সারি চাপড়ির দোকান থেকেই ‘ডিস্ট্রিক কেক’ নামটির প্রচলন হয়েছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়। নামটি শুনতে মজার, কিন্তু এর পেছনের গল্পটি একেবারেই স্থানীয়।

মাটির চুলা, লাকড়ির আগুন, বিশাল তাওয়া, হাতে চেপে চাপড়ি তৈরির কৌশল, ঝাল ভর্তা আর আদালতপাড়ার ব্যস্ততা—সবকিছু মিলিয়ে এ খাবারটি যেন টাঙ্গাইল শহরের প্রতিদিনের জীবনেরই একটি ছোট্ট ছবি।
টাঙ্গাইলের বাইরে রাজশাহী শহরেও এর সঙ্গে কিছুটা মিল আছে, এমন খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার। তবে অঞ্চলভেদে উপকরণ, মসলা কিংবা তৈরির পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতেই পারে। স্থানীয় খাবারের সৌন্দর্যটাই হয়তো এখানে। দেখতে কাছাকাছি হলেও প্রতিটি এলাকার খাবার তার নিজের মানুষ, মাটি আর অভ্যাসের গল্প বলে।
ভ্রমণে গিয়ে দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার অভিজ্ঞতা যেমন মনে থাকে, তেমনি রাস্তার পাশে মাটির চুলার ধারে বসে খাওয়া একটি সাধারণ চাপড়ির স্বাদও অনেক দিন মনে থেকে যায়। কারণ, সেখানে শুধু খাবার খাওয়া হয় না; একটু ছুঁয়ে দেখা যায় একটি শহরের জীবনযাপন, মানুষের অভ্যাস আর মাটির সঙ্গে মিশে থাকা খাদ্যসংস্কৃতিকে।

টাঙ্গাইলের চাপড়ি তাই শুধু একটি বড় গোল রুটি নয়। মাটির চুলার আগুন, ঝাল ভর্তার ঘ্রাণ, ব্যস্ত আদালতপাড়া আর স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে শহরের নিজস্ব এক খাদ্যপরিচয়। আর সেই কারণেই হয়তো স্থানীয়দের দেওয়া মজার নামটি বেশ মানিয়ে যায়—‘ডিস্ট্রিক কেক’।
ছবি: লেখক