
সে অনেক দিন আগের কথা। ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিমে ইংলিশ চ্যানেল ঘেঁষে নরম্যান্ডি অঞ্চলের ভিমুতিয়ে নামে ছোট্ট নির্জন একটি গ্রামে বাস করতেন এক দরিদ্র কিষানি, নাম মারি-ক্রিস্তিন আরেল (১৭৬১-১৮৪৪)। ভীষণ টানাটানির সংসার; অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী। তিনি গরুর কাঁচা দুধ থেকে পনির তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। সাদামাটা পনির, স্বাদে-গন্ধে কোনো বিশেষত্ব ছিল না। সে পনিরের তেমন কোনো কদর ছিল না। প্রায়ই তাঁর পনির অবিক্রীত থেকে যেত। ফলে জীবন নির্বাহ করার জন্য পনির তৈরি করে বিক্রির পাশাপাশি পাশের গ্রামে এক সচ্ছল পরিবারের বিশাল বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটার কাজ করতেন।

হঠাৎ একদিন সেই বাড়িতে এক আগন্তুকের আবির্ভাব ঘটল। মারি আরেল লক্ষ করলেন যে ব্যক্তিটি দিনের অধিকাংশ সময়ে তাঁর কামরায় থাকেন এবং বাড়ির অন্য সবাইকে এড়িয়ে চলেন। কোনো কারণে তাঁর ঘরের বাইরে এলে মুখ ঢেকে রাখেন। কেমন যেন নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা। মারির কাছে মানুষটিকে বেশ রহস্যময় মনে হয়। কৌতূহলে ভর করে কাজের ছলে প্রায়ই তাঁর কক্ষে যেতেন এবং একটু একটু আলাপ শুরু করে একসময় রহস্যময় আগন্তুকের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
কিছুদিন পর একদিন আগন্তুক নিজের পরিচয় দিলেন, নাম ফাদার শালর্স জঁ বনভু। জানালেন, একজন ধর্মযাজক ছিলেন। তিনি বিপ্লবীদের চোখ এড়িয়ে জীবন হাতে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পালিয়ে নরম্যান্ডির এই গ্রামে এসেছেন নিজের জীবন বাঁচাতে। কারণ, প্রজাতন্ত্রের বিপ্লবীরা তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তাঁদের হাতে পড়লে গিলোটিনের ধারালো ধাতব ব্লেডের নিচে জীবন দিতে হবে। ১৭৯১ সালের ঘটনা ছিল এটি।
এর দুই বছর আগে, ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ঘটেছিল এমন একটি ঘটনা, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসের গতিপথকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। কী ঘটেছিল সেই বিশেষ দিনটিতে? সকাল থেকেই প্যারিসের আকাশে জ্বলজ্বলে সূর্য।

গ্রীষ্মের তীব্র তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে মুক্তিপাগল প্রান্তিক জনগণ এগিয়ে চলেছেন রাজার অস্ত্রভান্ডার বাস্তিল দুর্গ দখল করতে। অস্ত্রভান্ডার পাহরায় রয়েছে রাজার একান্ত অনুগত সুশিক্ষিত, সুসজ্জিত অস্ত্রধারী বিশাল এক সেনাবাহিনী। বাস্তিল অভিমুখে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অপ্রতিরোধ্য স্বতঃস্ফূর্ত মিছিলের অগ্রভাগে নেতৃত্বের অধিকাংশই ছিলেন নারী। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় জনতার স্রোত এগিয়ে চলে অসম সাহসিকতায়। ‘হয় স্বাধীনতা, না হয় মৃত্যু’—স্লোগানে স্লোগানে রাজধানী প্যারিস তখন এক উত্তপ্ত ভূখণ্ড। ফরাসি বিপ্লবীরা দখল করে নেয় বাস্তিল দুর্গ, উপড়ে ফেলে বিষবৃক্ষ, রাজক্ষমতার স্বৈরাচারী শক্ত খুঁটি। ফলে রাজা ষোড়শ লুই একচ্ছত্র ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়েন।
বাস্তিল দুর্গ ছিল ফরাসি রাজরাজড়াদের ক্ষমতার প্রতীক। সিন্দাবাদের বুড়োর মতো অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে ধর্মযাজককুলও উঠে বসেছিল সাধারণ মানুষের কাঁধে। তারা সুদক্ষ কৌশলে ধর্মকে ব্যবহার করত শোষণের হাতিয়ার হিসেবে। রাজকরের ভারে বিপর্যস্ত সাধারণ জনগণ দিশাহারা শহরে, গ্রামে, গঞ্জে। সর্বত্র প্রকট খাদ্যাভাব। রুটির মূল্য অনেক আগেই আকাশ ছুঁয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। কর্মক্ষম যুবকেরা বেকার। রাজপরিবার, পরিষদদের বহুদিনের বহতা অমিতব্যয়িতা। বিলাসে, ব্যবহারে আর স্বৈরাচারী অবহেলায় দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা সংকটের চরমে। তদুপরি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থনে অর্থ জোগান দিতে খরচ হচ্ছে এক অকল্পনীয় অঙ্কের অর্থ। রাজকোষাগার শূন্য, একেবারে দেউলিয়া। অবশেষে অনেক প্রাণের বিনিময়ে ফরাসিরা হাজার বছরের রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্রের অত্যাচার, নিপীড়ন আর বৈষম্যের কঠিন শিকল চূর্ণ করে।
রাজতন্ত্রের পতনের আগে শালর্স জঁ বনভু ছিলেন একজন দাপুটে পুরোহিত, পুরোহিততন্ত্রের একজন পুরোধা ব্যক্তি। ফ্রান্সের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে রাজা ষোড়শ লুইকে সরিয়ে দেওয়ার পরের বছর ১৭৯০ সালের ১২ জুলাই, সারা দেশের পাদরিদের প্রজাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে আহ্বান জানানো হয়। সে সময়ে অনেক পুরোহিত এতে রাজি না হয়ে পালিয়ে গিয়ে নিজেদের মাথা বাঁচানোকেই শ্রেয় মনে করেন। শালর্স জঁ বনভু তাঁদেরই একজন, প্রজাতন্ত্রীদের চোখের শূল।
মারি একজন পনিরশিল্পী হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, এ কথা জেনে ফাদার শালর্স তাঁকে সাহায্য করতে চাইলেন।

শর্ত একটাই যে তাঁর গোপন আস্তানার কথা কারও কাছে ফাঁস করা যাবে না। পনিরের গুণগত মান বাড়ানোর জন্য তিনি মারিকে কয়েকটি খুঁটিনাটি বিষয় পরিবর্তন করতে এবং সেই সঙ্গে আরও পরামর্শ দিলেন, পরিপক্ব হওয়ার সময়কালে একটি বিশেষ জাতের উদ্ভিদের কাঠের পাটাতনের ওপর পনিরের চাকতিগুলো বিছিয়ে রাখতে। পরামর্শ মেনে মারি তা-ই করলেন। অনেকটা জাদুর মতোই বদলে গেল সব। সৃষ্টি হলো একেবারে নতুন স্বাদ আর অনেকটা বুনো ফুলের মাদকীয় ঘ্রাণের নরম এক পনির। হালকা উষ্ণ রুটিতে মাখিয়ে খেলে স্বাদের জগতের অমরাবতীতে পৌঁছে যাওয়া যায়। মারি চমৎকৃত হলেন। তবে তিনি তখনো বুঝতে পারেননি, কী অবিশাস্য বিস্ময় তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে!
প্রতিবছর গ্রীষ্মে নরম্যান্ডির সাগরের তীরে ভিড় জমান সমুদ্রবিলাসী পর্যটকেরা। অচিরেই তাঁদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে এই পনির। দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে সুনাম। ফরাসি রাজাদের পতন ঘটলেও সে অস্থির সময়ে স্বাদের সাম্রাজ্যের অনেকখানি দখলে নেয় জাদুর খাদ্যটি। রন্ধনকৌলিন্যের জগতে সাধিত হয় এক নীরব বিপ্লব। উৎসস্থলের নাম অনুসারে এই অত্যাশ্চর্য পনিরের নাম হয় ‘ক্যামেমবার্ত’।

এই নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় মারি আরেলের নাম। অনুচ্চারিত থাকে একজন পলাতক ধর্মযাজকের অবদান। দারিদ্র্য কাটিয়ে ধনাঢ্যদের চাকচিক্যময় জগতে পা রাখেন মারি। আট দশকের দীর্ঘ জীবনে মারি-ক্রিস্তিন আরেল দেখেছেন জীর্ণ কুটির ছেড়ে তাঁরই সৃষ্টি পৃথিবী জয় করতে চলেছে। আজও সেই জয়যাত্রা অব্যাহত। পরিণত হয়েছে ফরাসি জাতীয় প্রতীকে।
ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে ১১ সেমি. ব্যাসের গোলাকার এবং পাতলা কাঠের মোড়কে আচ্ছাদিত প্রতিটি ২৫০ গ্রামের ক্যামেমবার্ত আজ পৃথিবীর বহু দেশে রসনাবিলাসীদের কাছে বিশেষ পছন্দের পনির। এর জনপ্রিয়তা আজও তুঙ্গে। এমন ব্যাপক জনপ্রিয়তাই এই মজার খাবারের জন্য হয়েছে হিতে বিপরীত। ফ্রান্সসহ বিভিন্ন অঞ্চলে, দেশে এই দুগ্ধজাত পণ্যটি ‘ক্যামেমবার্ত’ নাম দিয়ে নানাভাবে ভোক্তাদের টেবিলে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় এগিয়ে এল ফরাসি প্রশাসন।

তারা এই পণ্যের ভৌগোলিক সীমানা এবং দুধের জন্য গরুর জাত নির্দিষ্ট করে দিল। সেই সঙ্গে আদি ক্যামেমবার্তের স্বাদ, ঘ্রাণ, আস্তরণ ও গঠন ঠিক রাখার জন্য কঠিন সব শর্ত জুড়ে দিল। সে কারণেই সেই ১৯৮৩ সাল থেকে গরুর কাঁচা দুধ দিয়ে তৈরি ‘এওপি’লোগো যুক্ত ‘ক্যামেমবার্ত দ্য নরম্যান্ডি’একটি সুরক্ষিত পনির। ফ্রান্সে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন ক্যামেমবার্ত উৎপাদন হয়ে থাকে। এর মধ্যে ‘ক্যামেমবার্ত দ্য নরম্যান্ডি’র উৎপাদন ৬ হাজার টনের বেশি।
প্যারিস থেকে ২০০ কিলোমিটার বা ১২৪ মাইল দূরে নরম্যান্ডি পর্যটকদের খুবই পছন্দের একটি গন্তব্য। সমুদ্রতীরের এই জনপদ বিখ্যাত হয়ে আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ১৯৪৪ সালের ৬ জুন মিত্রবাহিনীর বীরত্বগাথায়। নাৎসি বাহিনীর পরাজয়ের সূচনা হয়েছিল এখান থেকেই। এই শহর থেকে খুব কাছেই ক্যামেমবার্ত গ্রামের একটি সরণির নামকরণ করা হয়েছে মারি আরেলের নামে। জাদুঘর ‘লা মেজোঁ দু ক্যামেমবার্ত’এই সরণিতে অবস্থিত।


পাশের গ্রাম ভিমুতিয়েতে দেখতে পাওয়া যাবে মারি আরেলের ভাস্কর্য। এখানে বেড়াতে এসে একটুকরা ফুলেল আস্তরণের ক্যামেমবার্ত দ্য নরম্যান্ডি পনির মুখে দিয়ে এর স্বাদ আস্বাদন করতে করতে সব থেকে বেরসিক মানুষটির মুখ ফসকে যদি বেরিয়ে আসে ‘ক্যামেমবার্ত দ্য নরম্যান্ডি একটি কিংবদন্তি পনির’, তাতেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। ক্যামেমবার্ত দ্য নরম্যান্ডি সত্যিই একটি কিংবদন্তি পনির।
লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী