কোরবানির মাংস সংরক্ষণ, শুঁটকিতে হারিয়ে যাওয়া স্বাদ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

রান্নার প্রতি ভালোবাসাটা তাঁর জন্মেছিল খুব ছোটবেলায়। পাশে বসে মায়ের রান্না মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। কীভাবে এত সহজে সুস্বাদু সব খাবার তৈরি হয়ে যায়, সেটাই ছিল বিস্ময়ের। তখন থেকেই মনে মনে ভাবতেন, একদিন তিনিও রান্না শিখবেন। নিজের হাতে প্রিয় মানুষদের জন্য খাবার তৈরি করবেন। সেই শৈশবের মুগ্ধতাই একসময় তাঁকে নিয়ে আসে পেশাদার কুলিনারি জগতে।

সু শেফ মাহবুবুল আলম

রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনের সু শেফ মাহবুবুল আলমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জে। ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ঢাকায় এসে পর্যটন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সেখান থেকেই রান্নার জগতের সঙ্গে তাঁর পথচলা শুরু। ১৯৯৭ সালে প্রথম চাকরি হয় দুবাইয়ে। আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দক্ষ করে তোলে। এরপর ২০০৫ সালে দেশে ফিরে যোগ দেন ঢাকার পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসনে। কমিস ওয়ান পদবি থেকে শুরু করে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন তিনি সু শেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজ্ঞাপন

এত বছরের পেশাদার জীবনের পরও তাঁর রান্নার সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতি জড়িয়ে আছে গ্রামের বাড়ি আর মায়ের হাতের রান্নার সঙ্গে। কোরবানির ঈদের কথা উঠতেই যেন ফিরে গেলেন শৈশবে। গরু কেনা, খাওয়ানো, গোসল করানো সবকিছুর মধ্যেই ছিল অন্য রকম আনন্দ। ঈদের সকালে বাবার সঙ্গে নামাজ পড়ে এসে কোরবানি দেওয়া, তারপর পরিবারের সবাই মিলে মাংস ভাগ করা—এসব স্মৃতি আজও তাঁর কাছে অমলিন। তাঁর কাছে কোরবানির ঈদ মানেই শুধু উৎসব নয়, বরং মায়ের হাতের বিশেষ কিছু রান্না। বিশেষ করে একটি খাবারের কথা বলতে গিয়ে তিনি হয়ে পড়েন নস্টালজিক—তা হলো গরুর মাংসের শুঁটকি। সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী পদ এখন অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। তিনি জানান, একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিল না। তাই কোরবানির অতিরিক্ত মাংস সংরক্ষণের জন্য মানুষ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করত। এর মধ্যে অন্যতম ছিল মাংস শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা। অঞ্চলভেদে একে কেউ বলত মাংসের শুঁটকি, কেউ গরুর শুঁটকি, আবার কোথাও মাংস শুকনা।

খুব মনে পড়ে কোরবানির ঈদের পরদিন সকালের কথা। গ্রামজুড়ে তখন উৎসবের আবহ। ঘুম থেকে উঠেই মায়েরা চালের রুটি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আর সেই গরম রুটির সঙ্গে খাওয়া হতো মাংসের শুঁটকি কিংবা অন্য মাংসের পদ। মাহবুবুল আলমের ভাষায়, এটা শুধু খাবার ছিল না, ছিল গ্রামের মানুষের বহুদিনের ঐতিহ্য। তিনি বলেন, মা বেঁচে থাকা পর্যন্ত প্রতি ঈদেই তাঁর এই আবদার পূরণ করতেন। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর যেন সেই স্বাদও হারিয়ে গেছে। এখন বাড়ি গেলে আর আগের মতো কেউ যত্ন করে রান্না করে খাওয়ায় না। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে গ্রামের চিত্রও। ঘরে ঘরে ফ্রিজ এসেছে, তাই মাংসের শুঁটকির প্রচলনও কমে গেছে। তবু শৈশবের সেই স্বাদ আর মায়ের রান্নার স্মৃতি আজও তাঁর কাছে ঈদের সবচেয়ে বড় অনুভূতি।

বিজ্ঞাপন

কথার ফাঁকেই মাহবুবুল আলম শোনালেন এই ঐতিহ্যবাহী পদ তৈরির গল্প। নিজ হাতে রান্না করেও খাওয়ালেন শুঁটকি। গরুর মাংসের শুঁটকি তৈরির জন্য প্রথমে চর্বি ছাড়া মাংস লম্বা ও পাতলা টুকরা করে কেটে নিতে হয়।

এরপর একটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে তাতে হলুদ, লবণ, আস্ত দারুচিনি, কালো গোলমরিচ ও তেজপাতা দেওয়া হয়। সেই পানিতে পরিমাণমতো মাংস সেদ্ধ করে নিতে হয়। সেদ্ধ হওয়ার পর মাংস থেকে অতিরিক্ত পানি শুকিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু সময় ফ্যানের নিচে বা খোলা বাতাসে রাখা হয়।

তবে চাইলে শুধু পানিতে মাংস সেদ্ধ করেও পরে আলাদা করে মসলা ব্যবহার করা যায়। সে ক্ষেত্রে মাংসের সঙ্গে লবণ, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া ও রসুন বাটা মাখিয়ে ২- ৩ ঘণ্টা রেখে দিতে হয়। এখানে লবণ সংরক্ষকের কাজ করে। এরপর পরিষ্কার সুতা, তার বা বাঁশের কাঠিতে গেঁথে মাংস কড়া রোদে ঝুলিয়ে শুকাতে হয়। টানা চার থেকে সাত দিন রোদে শুকানোর পর মাংস পুরোপুরি শক্ত হয়ে গেলে তৈরি হয়ে যায় শুঁটকি।

রাতে অবশ্যই মাংস ভেতরে রাখতে হয়, যাতে শিশির বা বৃষ্টির পানি না লাগে। মাছি ও অন্যান্য পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে পাতলা কাপড় বা নেট ব্যবহার করা যায়। এভাবেই একসময় গ্রামবাংলার মানুষ দীর্ঘদিন মাংস সংরক্ষণ করতেন।

শুধু সংরক্ষণই নয়, এই শুঁটকি দিয়ে তৈরি হয় দারুণ সব পদও। সু শেফ নিজেই রান্না করে দেখালেন ভুনা গরুর শুঁটকি। আগে বানিয়ে রাখা শুঁটকি গরম পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে নরম করে নিতে হয়। এরপর হামানদিস্তা বা শিল–নোড়া দিয়ে ছেঁচে কিংবা ছোট ছোট টুকরা করে নেওয়া হয়। তারপর শর্ষের তেলে পেঁয়াজকুচি, রসুন ও শুকনা মরিচ ভেজে এর সঙ্গে শুঁটকি দিয়ে ভালোভাবে ভুনতে হয়। অল্প পানি দিয়ে ঢেকে কিছুক্ষণ রান্না করলেই তৈরি হয়ে যায় ঝাঁজালো, মজাদার ভুনা গরুর শুঁটকি।

গরম ভাত কিংবা চালের রুটির সঙ্গে এর স্বাদ যেন ফিরিয়ে আনে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া এক নস্টালজিয়া।

শেফ জানান, পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে শুঁটকি কাচের বোতল বা বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা যায়। শুকনা ও ঠান্ডা জায়গায় রাখলে এটি কয়েক মাস ভালো থাকে। চাইলে হালকা ভেজে তেল মেখেও সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রা বদলেছে, এখন ঘরে ঘরে ফ্রিজ পৌঁছে গেছে। তাই এই সংরক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহারও অনেক কমে এসেছে। তবু শৈশবের সেই স্বাদ, গ্রামের উঠানে রোদে শুকাতে দেওয়া মাংস আর মায়ের হাতের রান্না এখনো তাঁর কাছে কোরবানির ঈদের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতি হয়ে আছে।

কেবল শুঁটকি নয়, একসময় গ্রামবাংলায় গরুর মাংস সংরক্ষণের আরও একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি ছিল চর্বি দিয়ে মাংস সংরক্ষণ। সু শেফ জানালেন, কোরবানির পর দীর্ঘদিন মাংস ভালো রাখার জন্য মানুষ নানা কৌশল ব্যবহার করত। এর মধ্যে এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর ও সুস্বাদু একটি পদ্ধতি। বিভিন্ন অঞ্চলে একে ভিন্ন নামে ডাকা হয়। পশ্চিমা রান্নায় এটি অনেকটা কনফিট ধরনের সংরক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।

এই পদ্ধতিতে প্রথমে গরুর মাংস ছোট ছোট টুকরা করে কেটে নেওয়া হয়। এরপর মাংসে হলুদ, মরিচ, এলাচি, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলা দিয়ে হালকা সেদ্ধ করা হয়। সেদ্ধ হওয়ার পর পানি ভালোভাবে ঝরিয়ে শুকনা সুতি কাপড় দিয়ে মাংসের টুকরাগুলো মুছে শুকিয়ে নিতে হয়।

অন্যদিকে আলাদা পাত্রে কম তাপে গরুর চর্বি গলিয়ে তরল করা হয়। মাংস শুকিয়ে গেলে তা একটি পরিষ্কার ও শুকনা পাত্রে রেখে ওপর থেকে পুরোপুরি গলিত চর্বি ঢেলে দেওয়া হয়, যাতে মাংসের ভেতরে বাতাস প্রবেশ করতে না পারে। ঠান্ডা হওয়ার পর চর্বি জমে মাংসের চারপাশে শক্ত একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে।

এই স্তর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমিয়ে দেয় এবং মাংস দীর্ঘদিন ভালো রাখতে সাহায্য করে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে এই মাংস প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত খাওয়া যায়। তবে ভালো রাখতে সপ্তাহে অন্তত এক দিন চর্বিসহ মাংস গরম করে নেওয়ার পরামর্শ দেন সু শেফ।

সু শেফ বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক এলাকায় কোরবানির সময় এই পদ্ধতিতে মাংস সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, যেখানে ফ্রিজের সুবিধা ছিল না, সেখানে এটি ছিল খুব পরিচিত একটি উপায়। শুধু এই অঞ্চলেই নয়, মরুভূমি ও শীতপ্রধান দেশগুলোতেও বহু আগে থেকে একই ধরনের সংরক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। প্রযুক্তির উন্নয়নে সেই প্রয়োজন আজ অনেকটা কমে গেলেও, এই ঐতিহ্যবাহী সংরক্ষণ কৌশল এখনো বহন করে পুরোনো দিনের স্বাদ, স্মৃতি ও সংস্কৃতি।

ছবি: হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন