সামান্য মসলায় রান্না মায়ের হাতের বিফ কোরমাই ছিল ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কোরবানি শেষে বাড়িভর্তি লোকজন, আনন্দ-আড্ডা, রান্নাঘরে ব্যস্ত মা, চুলার ওপর দমে চড়া এক হাঁড়ি বিফ কোরমা; আর ঘরময় ছড়িয়ে পড়া মাংস ও মসলার এক মোলায়েম সুগন্ধ—কোরবানির ঈদ এলেই শেফ খন্দকার কায়সার আহমেদের মনে ভেসে ওঠে সেই স্মৃতি। তিনি এখন রেনেসন্স ঢাকা গুলশান হোটেলের ইন্ডিয়ান সেকশনের শেফ দ্য পার্টি। পেশাদার রান্নাঘরে কাটিয়েছেন এক যুগের বেশি সময়। কিন্তু অসংখ্য আন্তর্জাতিক ও দেশি পদ রান্না করেও মায়ের হাতের সেই বিফ কোরমাকে যেন ছাড়িয়ে যেতে পারেননি।

শেফ কায়সার পেশাদার রান্নাঘরে কাটিয়েছেন এক যুগের বেশি সময়
শেফ কায়সার পেশাদার রান্নাঘরে কাটিয়েছেন এক যুগের বেশি সময়

টাঙ্গাইলের পরিবারে বেড়ে উঠলেও তাঁদের রান্নাঘরে ঈদ এলেই জায়গা করে নিত পুরান ঢাকার একটি বিশেষ পদ। শেফ কায়সার জানান, তাঁর মা এক খালার কাছ থেকে এই রান্না শিখেছিলেন। এরপর প্রতি কোরবানির ঈদে পরিবারের জন্য যত্ন করে তৈরি করতেন সেই খাবার।

মজার বিষয় হলো কোরবানির ঈদে নানা ধরনের মসলাদার ও সমৃদ্ধ খাবারের আয়োজন থাকলেও শেফ কায়সারের সবচেয়ে প্রিয় ছিল এই তুলনামূলকভাবে সাদামাটা অথচ স্বাদে অনন্য পদটি। তাঁর ভাষায়, ভারী মসলার খাবারের চেয়ে এই রান্নাই বেশি তৃপ্তি দিত তাঁর স্বাদকোরককে।

শেফ কায়সারের সবচেয়ে প্রিয় ছিল এই তুলনামূলকভাবে সাদামাটা অথচ স্বাদে অনন্য পদটি
শেফ কায়সারের সবচেয়ে প্রিয় ছিল এই তুলনামূলকভাবে সাদামাটা অথচ স্বাদে অনন্য পদটি

খাবারের স্বাদ অনেক সময় মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের উঠানে, পারিবারিক আড্ডায় কিংবা উৎসবের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্তে। শেফ কায়সারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ব্যতিক্রম নয়। কোরবানি ঈদের কথা মনে পড়লে আজও তাঁর চোখে ভেসে ওঠে মায়ের ব্যস্ত রান্নাঘর আর সেই পরিচিত সুগন্ধ।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও কিছু স্বাদ কখনো পুরোনো হয় না; বরং বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও সেগুলো হয়ে ওঠে পরিবারের ইতিহাস, ভালোবাসা আর উৎসবের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতির অংশ। শেফ কায়সারের জন্যও মায়ের হাতের সেই পুরান ঢাকার রান্না ঠিক তেমনই এক অমলিন ঈদস্মৃতি।

স্মৃতির কেন্দ্রে মায়ের রান্না

খাবারের স্বাদ অনেক সময় মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের উঠানে
খাবারের স্বাদ অনেক সময় মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের উঠানে

ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে সারা দিন মার্বেল খেলা, ঈদের সকালে সবাই মিলে কোরবানি দেখা; আর দুপুরে মায়ের রান্নার অপেক্ষা—এসব স্মৃতি আজও স্পষ্ট তাঁর মনে।
টেবিলে অনেক ধরনের মাংসের পদ থাকত, বিশেষ করে মেহমান এলে। তখন তিনি অপেক্ষা করতেন মায়ের বিফ কোরমার। কারণ হিসেবে তিনি জানান, কম মসলার কারণে মাংসের আসল স্বাদটা পাওয়া যায় এই পদে, যা আজও তিনি ভুলতে পারেননি।
রান্নার প্রতি তাঁর মায়ের ছিল আলাদা ভালোবাসা। নতুন নতুন রেসিপি সংগ্রহ করা, পরিচিতজনদের কাছ থেকে রান্নার কৌশল শেখা এবং সেগুলো নিজের মতো করে তৈরি করা ছিল তাঁর নেশার মতো। এ জন্য মায়ের নেশাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন শেফ কায়সার।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের শেফ কোর্সে ভর্তি হন কায়সার। শুরুটা সহজ ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রাম, নিরলসভাবে শেখা ও এক যুগের অভিজ্ঞতার পথ পেরিয়ে আজ তিনি দেশের অন্যতম স্বনামধন্য একটি তারকা হোটেলের ‘শেফ দ্য পার্টি’। সময়ের সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। আজ তিনি আন্তর্জাতিক মানের রান্নাঘরে কাজ করেন, তৈরি করেন অসংখ্য পদ; কিন্তু রান্নার দর্শনে এখনো সবচেয়ে বড় প্রভাব মায়েরই।

বিজ্ঞাপন

কম মসলায় মাংসের আসল স্বাদ

কোনো বাড়তি তেলে নয়; বরং গরুর চর্বিতেই রান্না হতো এই মাংস
কোনো বাড়তি তেলে নয়; বরং গরুর চর্বিতেই রান্না হতো এই মাংস

অন্যান্য রান্না তো আছেই, তবে হোটেলে অতিথিদের জন্য মাংসের কোরমা রান্না করলে সবার কাছে প্রশংসা পান তিনি। সহকর্মীর অনেকেই রেসিপি জানতে চান। অথচ রান্নার পদ্ধতিটি অবিশ্বাস্য রকমের সহজ।

শেফ কায়সারকে মুগ্ধ করে রেখেছে এই কোরমার সিম্পলিসিটি। কোরমা মানেই অনেকের কাছে বেশি মসলা, দই, বাদাম, তেল ও ঘির সমারোহ; সেখানে তাঁর মায়ের এই রান্না হয় একেবারেই ভিন্ন ধারায়। কোনো বাড়তি তেলে নয়; বরং গরুর চর্বিতেই রান্না হতো। মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজার মতো অনেকটা। আর মসলা? সেগুলোও থাকত খুবই সীমিত। কিছু আস্ত গরমমসলা ছাড়া তেমন কিছুই ব্যবহার হয় না লোভনীয় এই পদে।

প্রথমে গরুর চর্বি গলিয়ে, এরপর আস্ত গরমমসলা ভেজে পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হবে
প্রথমে গরুর চর্বি গলিয়ে, এরপর আস্ত গরমমসলা ভেজে পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হবে

বিফ কোরমা তৈরি করতে প্রথমে গরুর চর্বি গলিয়ে নিতে হবে। এরপর আস্ত গরমমসলা ভেজে পেঁয়াজ ছেড়ে দিতে হবে। পেয়াঁজ একটু নরম হয়ে এলেই খুব সামান্য আদা-রসুনবাটা যোগ করতে হবে। তারপর স্বাদমতো কাঁচা মরিচ। মসলা ভাজা হয়ে গেলে দিয়ে দিতে হবে মাংস। কষানোর পর চাইলে সামান্য গরম পানি দেওয়া যায়। আবার পানি ছাড়াও মাংসের পানিতেই রান্না করা যায়; আর মাঝামাঝি সময়ে দিতে হবে স্বাদমতো লবণ। তারপর ৪০-৪৫ মিনিটের জন্য অল্প আঁচে দম বসিয়ে শেষ করতে হবে মাংসের কোরমা।

একদম সাদামাটা, বাড়তি কিছু নেই এই রেসিপিতে
একদম সাদামাটা, বাড়তি কিছু নেই এই রেসিপিতে

এখনো যেন সেই স্বাদ মুখে লেগে আছে শেফ কায়সার আহমেদের। তাঁর ভাষায়, ‘মায়ের হাতে রান্না সেই কোরমার স্বাদ এখনো আমার মুখে লেগে আছে। আমি নিজেও রান্না করি এই পদ। কাছাকাছি হয় মায়ের; কিন্তু মায়ের রান্না তো মায়ের রান্নাই। আমার বিস্ময় লাগে এত অল্প মসলায় কী মজার খাবার! একদম সহজ-সরল রান্না, ঠিক আমার মায়ের মতোই। একদম সাদামাটা, বাড়তি কিছু নেই। ছোটবেলার সেই ঈদগুলো সত্যিই খুব মনে পড়ে।’

মায়ের শেখানো গুরুত্বপূর্ণ কৌশল

শুরুতেই লবণ না দিয়ে বরং রান্নার মাঝামাঝি সময়ে লবণ যোগ করতে হয়
শুরুতেই লবণ না দিয়ে বরং রান্নার মাঝামাঝি সময়ে লবণ যোগ করতে হয়

এই পদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগুলো শিখেছেন মায়ের কাছেই। এক, মাংসের কোরমায় সয়াবিন তেল না দিয়ে বরং মাংসের চর্বি গলিয়ে তাতে রান্না। দুই, পানি যত কম পারা যায় ব্যবহার করা। তিন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শুরুতেই লবণ না দিয়ে বরং রান্নার মাঝামাঝি সময়ে লবণ যোগ করতেন তাঁর মা। শুধু কোরমা নয়, যেকোনো মাংসের রান্নাতেই মাঝামাঝি সময়ে লবণ দেওয়ার পরামর্শ দেন শেফ। এতে মাংস নরম থাকে।
পেশাদার শেফ হওয়ার বহু আগে মায়ের রান্নাঘরেই তিনি শিখেছিলেন রান্না আর স্বাদের প্রথম পাঠ। সেই পাঠের সবচেয়ে মধুর স্মৃতি হয়ে শেফ কায়সারের কাছে আজও রয়ে গেছে দমে চড়া এক হাঁড়ি বিফ কোরমা।

ছবি: কানিজ ফাতেমা

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১৪: ০০
বিজ্ঞাপন