
‘ব্রি’। একে বলা হয় পনিরের রাজা, রাজার পনির। ফ্রান্সের খুব জনপ্রিয় এই পনির। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এই পনিরের জনপ্রিয়তা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী। বোদ্ধারা বলেন, পাতলা আস্তরণের সাদা বা মাখন রঙের এই নরম পনিরের অস্তিত্ব ছিল সেই মধ্যযুগ থেকেই। প্যারিস এবং এর আশপাশ অঞ্চলের প্রাচীন দক্ষতানিপুণ পনিরশিল্পীরা স্বাদের জগতের এই তারকা পনিরের উদ্ভাবক। সে সময়ে প্যারিস আজকের মতো ইট, পাথর আর কংক্রিটের ছিল না। সেন নদীর অববাহিকায় ঘন অরণ্য, কৃষি ও চারণভূমি ছিল চারদিকে। যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে না ওঠায়, সে সময়ে পনির উৎপাদকেরা নিজেদের প্রয়োজনেই এই পনির উৎপাদন করতেন।

বাড়িতে বাড়তি পনির থেকে থাকলে তা নিজেদের মধ্যে পণ্য বিনিময়ে ব্যবহৃত হতো। সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে থাকে অনেক কিছুই। যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে রেলপথ উন্মুক্ত হলে দূরদূরান্তের মানুষ এই পনিরের খবর পান। একবার যাঁরাই এমন মজার স্বাদের খাবার আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরাই ভক্ত হয়েছেন এর। সাধারণের কুটির ছেড়ে এই অসাধারণ পনির ব্রি পৌঁছে গেছে রাজরাজড়াদের সুউচ্চ অট্টালিকায়, অঢেল প্রাচুর্যে ভরা সুরক্ষিত প্রসাদে।
রোমান সম্রাট ‘ইউরোপের জনক’ শার্লেমেন (৭৪২-৮১৪) খুব পছন্দ করতেন এই সুস্বাদু পনির। দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী এই সম্রাট বদলে দিয়েছিলেন ইউরোপের চেহারা। তিনিই পশ্চিম এবং মধ্য ইউরোপের বহু ক্ষুদ্র রাজ্য দখলে নিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। তাঁর রাজত্বকালে শিল্প, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ইউরোপজুড়ে আমূল পরিবর্তন ঘটে। তিনি সূত্রপাত করেছিলেন একটি নবজাগরণ, ক্যারোলিঞ্জিয় রেনেসাঁর। শার্লেমেন ছিলেন ক্যারোলিঞ্জিয় রাজবংশের। সে কারণেই এমন নামকরণ।

প্রজাহিতৈষী ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ হেনরি (১৫৫৩-১৬১০) ছিলেন এই পনিরের একজন বিশ্বস্ত সমঝদার। ক্যাথলিক ও প্রটেস্ট্যান্টদের মধ্যে ৩৬ বছরের (১৫৬২-১৫৯৮) দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে তিনি শান্তি স্থাপনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণরাষ্ট্রে সব ধর্মের নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ধারণা ও নীতি গ্রহণ করে ফরাসি জাতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। সাম্য, মৈত্রী আর স্বাধীনতার স্বপ্নময় ভবিষ্যতের একজন পথপ্রদর্শক রাজা চতুর্থ হেনরিকে ফরাসিরা তাঁদের হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন সে কারণেই।
আরেকজন ভোজনপ্রিয় রাজার কথা উল্লেখ করতেই হয়। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই (১৬৩৮-১৭১৫)। যখন তাঁর মাথায় রাজমুকুট ওঠে, তখন তাঁর বয়স পাঁচ বছরও হয়নি। তাই তিনিই ছিলেন ফ্রান্সের কনিষ্ঠতম রাজা। নানা দুরারোগ্য রোগে ভুগেও দীর্ঘ ৭৭ বছরের জীবন পেয়েছিলেন তিনি। এই জীবনের মোট ৭২ বছরের বেশি স্থায়ী হয়েছিল তাঁর শাসনকাল। এত দীর্ঘ শাসনকাল ফ্রান্সের আর কোনো শাসকের ভাগ্যে জোটেনি। আমরা জানি, রাজা চতুর্দশ লুই ছিলেন ফ্রান্সের রাজাদের মধ্যে বেশ জাঁদরেল এক নৃপতি।

তাঁর সময়ে বর্ধিষ্ণু ফ্রান্সের জয়জয়কার চারদিকে, প্যারিসের অদূরে ভার্সাই প্রাসাদ ছিল ইউরোপের ক্ষমতা, রাজনীতি, সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। এক কথায় বলা চলে চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বকালে সূর্য ছিল ফ্রান্সের মাঝ–আকাশে। তাই তাঁর আরেকটি নাম ‘সূর্য রাজা’। তবে জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল ‘ঈশ্বরের উপহার’। তিনি নিয়ম করে দিয়েছিলেন, সপ্তাহে অন্তত একদিন ভার্সাই প্রাসাদে নানা স্বাদ ও ঘ্রাণের পনির আসবে। নির্দেশ ছিল—তাঁর রাজকীয় খাবার টেবিলে নানারকম পনিরের সঙ্গে বেশ বড় গোলাকার ব্রি অবশ্যই থাকতে হবে। কারণ, এটি ছিল তাঁর খুব পছন্দের।
আজ ব্রি বলতে পনিরের একটি বেশ বড় পরিবার বোঝায়। গরুর দুধ থেকে নানা কায়দায়, নানাভাবে তৈরি ব্রির এক ডজনের বেশি প্রকারভেদ আছে। এর মধ্যে নামকরা ব্রি হচ্ছে, ‘ব্রি দ্য মোঁ’ এবং ‘ব্রি দ্য মোঁলা’। ব্রি পরিবারে এই বিশেষ দুটি ব্রি উৎপত্তি এবং আদি নাম নির্দেশক ‘সুরক্ষিত’ পনিরের মর্যাদা পেয়েছে। কাছাকাছি স্বাদের গোলাকার, নরম, ৩৬ সেন্টিমিটার ব্যাস এবং ৩ সেন্টিমিটার পুরু এই পনির প্রতিটি প্রায় ৩ কেজি ওজনের হয়ে থাকে। হালকা ফুলেল সুবাসের পুষ্পিত পাতলা আস্তরণসহ খেতে আলাদা স্বাদের হয়। তবে গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে আকার–আয়তনে হেরফের হতে পারে।
প্যারিস থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার বা ৩০ মাইল দূরে আজকের মোঁ শহর হলো ব্রি পনিরের উৎপত্তিস্থল।

এই শহরেই অনেকটা ‘বি হ্যাপি’ কথাটির সঙ্গে মিল রেখে প্রতিবছর ‘ব্রি হ্যাপি’ উৎসবের আয়োজন করা হয় এবং সেই ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিবছর খুব ঘটা করে ব্রি শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় পর্যায়ে ব্রি পনিরের বিশিষ্ট কারিগরেরা তাঁদের তৈরি পনিরসহ এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। উৎসবের আবহে এই প্রতিযোগিতায় খুব জাঁদরেল, গুরুগম্ভীর বিশেষজ্ঞরা বিচারের আসনে বসেন।

তাঁদের সব ইন্দ্রিয় খুব সজাগ থাকে। পনিরের স্বাদ, ঘ্রাণ, রং, গঠন, আস্তরণ, উপস্থাপন ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে মোট ২০ নম্বরের মধ্যে পরীক্ষকেরা নম্বর দিয়ে থাকেন। চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হতে কম করে হলেও ১২ নম্বর পেতে হয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম তিনজনকে যথাক্রমে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদকে সম্মানিত করা হয়। ২০২৫ সালে স্বর্ণপদক অর্জন করেছিল পনির প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘গ্যানো’। পারিবারিক এই পনির কারখানার স্বত্বাধিকারী দুই ভাই-বোন—ইজাবেল ও স্তেফেন।
ল্য মার্ন নদীর তীরে মোঁ শহরেই জাদুঘর ‘লা মেজোঁ দু ব্রি দ্য মোঁ’। এই জাদুঘরে পা রাখতেই যা উপলব্ধি হবে, তা হলো একটি অঞ্চলের ঐতিহ্য, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পনির কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে! প্যারিসের অদূরে মোঁ শহরে পর্যটকেরা পা রেখে কখনোই হতাশ হয়ে ফিরে যাননি। এখানেই রয়েছে ইউরোপের সর্ববৃহৎ প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) স্মৃতি জাদুঘর, মানবতার ইতিহাসের করুণ এক অধ্যায় স্থির হয়ে আছে এই জাদুঘরে। একটু পা বাড়ালেই চোখে পড়বে অনুপম গথিক ভাস্কর্য সুষমামণ্ডিত ৮০০ বছরের প্রাচীন এক ক্যাথিড্রাল।

ঐতিহ্য এক দিনে গড়ে ওঠে না এবং এর পেছনে থাকে সমষ্টিগত ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, ত্যাগ, নিষ্ঠা, সাধনা, সুনিপুণ দক্ষতা আর মননশীলতায় সযত্নে লালিত ব্যঞ্জনা ও শিল্পবোধ। আজ রূপকথার চরিত্রের মতো অতীতের রাজা-রানিরা নেই, নেই গথিক ভাস্কর্যের প্রতিভাদীপ্ত ভাস্করেরা। মহাকালের অন্তরালে হারিয়ে গেছেন উপকথার চরিত্রের মতো ব্রি পনিরের শিল্পীরা; কিন্তু আজও টিকে আছে তাঁদের কীর্তি ও গৌরবগাথা। টিকে আছে আজও তাঁদের প্রিয় খাবার ব্রি—পনিরের রাজা, রাজার পনির ব্রি। (চলবে)
লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী লেখক