মাখনের দেশ ফ্রান্স
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সকালবেলা অনেকেরই দিন শুরু হয় মাখনের মনমাতানো ঘ্রাণে। পেয়ালাভর্তি কফি, আধখানা চাঁদের আকৃতির 'ক্রোয়াসাঁ' অর্থাৎ মচমচে আবরণে মোলায়েম রুটি আর তার সঙ্গে নরম মাখন এবং খানিকটা জ্যাম, জেলি। সাধারণ ফরাসিদের এমন হালকা প্রাতরাশ বা ‘পিতি ডেজুনে’ দিয়েই দিনের আহার শুরু হয়। শুধু সকালের খাবারেই নয়, নানা পদের কেক, ডেজার্ট-পেস্ট্রি তৈরিতে আর মাছ, মাংস, সবজি, সুপের স্বাদ বাড়াতে মাখনের ব্যবহার লুই পাস্তুরের দেশে সেই নব্যপ্রস্তরযুগ থেকে। ৮০ শতাংশ ফরাসি দিনে একবার হলেও খানিকটা মাখন খেয়ে থাকেন। এ দেশের নাগরিকেরা বছরে মাথাপিছু গড়ে আট কেজির বেশি মাখন খেয়ে থাকেন। মাখন ভোক্তার দেশ হিসেবে পৃথিবীর সব দেশকে ছাড়িয়ে শীর্ষের মুকুটটি ফ্রান্সের দখলে।

৮০ শতাংশ ফরাসি দিনে একবার হলেও খানিকটা মাখন খেয়ে থাকেন।
৮০ শতাংশ ফরাসি দিনে একবার হলেও খানিকটা মাখন খেয়ে থাকেন।
ছবি: সংগৃহীত

ফরাসি সরকারের জরিপ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালে ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের দেশ ফ্রান্সে উৎপাদিত হয়েছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন মাখন। এ কথাও বলা হয়েছে যে ১ কেজি মাখনের জন্য ২২ কেজি দুধের প্রয়োজন হয়। সে বছর ২৪ হাজার কোটি লিটার গরুর দুধ উৎপাদিত হয়েছিল। সে হিসাবে ফ্রান্স হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বিতীয় বৃহত্তম দুধ উৎপাদনকারী দেশ।

বিজ্ঞাপন

তেল ও মাখন, দুটোই স্নেহ উপাদানে গঠিত। তবে পার্থক্য আছে। তেলের প্রায় পুরোটাই স্নেহপদার্থ। আর মাখনে সাধারণত ৮২ শতাংশ স্নেহ উপাদান, বাকিটা পানি, আমিষ, ভিটামিন, খনিজ ইত্যাদি।

অতীতে হৃদয় ও ধমনির জন্য ক্ষতিকর বলে দীর্ঘদিন ধরে মাখনকে কালো তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছিল
অতীতে হৃদয় ও ধমনির জন্য ক্ষতিকর বলে দীর্ঘদিন ধরে মাখনকে কালো তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছিল
ছবি: লেখক

অতীতে হৃদয় ও ধমনির জন্য ক্ষতিকর বলে দীর্ঘদিন ধরে মাখনকে কালো তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছিল। ইদানীং পুষ্টিবিদেরা বলেছেন ভিন্ন কথা। তাঁদের মতে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ না দিয়ে কেবল অপব্যবহার না করে এবং খানিকটা সংযমী হলেই এমন চমৎকার ক্যালোরি–সমৃদ্ধ (প্রতি ১০০ গ্রামে ৭৫০ কিলোক্যালোরি) খাবারটি সুস্বাস্থ্যের জন্য সুখবর হতে পারে। কারণ, মাখনের আকর্ষণীয় পুষ্টিগুণও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অনেকেই দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খেতে পছন্দ করলেও খেতে পারেন না। কারণ, এতে দুধের চিনি ল্যাকটোজ আছে। ফলে হজমে বিপত্তি ঘটে এবং তাতে বেশ অস্বস্তিতে ভোগেন। তাঁদের মাখনের মজার স্বাদ আস্বাদনে মোটেও অসুবিধা নেই। মাখনে এই শর্করা নেই বললেই চলে। বরঞ্চ স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে। মাখন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন এ ও ই-এর ভালো উৎস। এ খাবারটির আরেকটি সুনাম আছে, এতে বুটিরিক অ্যাসিড আছে, যা কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি হ্রাস করে।

মাখনে থাকা বুটিরিক অ্যাসিড কমায় ক্যানসারের ঝুঁকি
মাখনে থাকা বুটিরিক অ্যাসিড কমায় ক্যানসারের ঝুঁকি
ছবি: লেখক

যেহেতু মাখনে সামান্য কোলেস্টেরল থাকে, সে কারণে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ গ্রাম বা সর্বোচ্চ একটি বড় টেবিল চামচ মাখন খেতে পারেন। এর বেশি নয়। তবে যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা, ভারী কাজ বা খেলাধুলা করেন, তাঁরা প্রতিদিন ৩০ গ্রাম পর্যন্ত মাখন খেতে পারেন। উচ্চ তাপে অর্থাৎ ১২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে মাখনের গুণগতমান কমে যায়। বেশি পোড়ালে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হবে।

 কত রকমের মাখন আছে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব একটা সহজ নয়। ফরাসিরা যেমন-তেমন করে এই মাখনের স্বাদ আস্বাদন করেন না। তাঁরা যেমন এই চমৎকার খাদ্যেটির গুণগত মান সম্পর্কে ভীষণই খুঁতখুঁতে, তেমনই রন্ধনশিল্পে বা কেক, ডেজার্ট-পেস্ট্রি তৈরিতে বৈচিত্র্য আনতে নানা রকমের মাখনের ব্যবহার করে থাকে। যেমন—

কাঁচা মাখন দুধ সংগ্রহের পর কোনোরকম পরিশোধন ছাড়াই মাখন তৈরি করা হয়
কাঁচা মাখন দুধ সংগ্রহের পর কোনোরকম পরিশোধন ছাড়াই মাখন তৈরি করা হয়
ছবি: সংগৃহীত

কাঁচা মাখন: দুধ সংগ্রহের পর কোনোরকম পরিশোধন ছাড়াই মাখন তৈরি করা হয়। মাখন তৈরি করার আগে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দুধের ট্যাংকে রাখা হয় এবং যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দুধ থেকে মাখন তুলে নেওয়া হয়। এতে মাখনের একটি খুব চমৎকার ঘ্রাণ থাকে। স্বাদও অটুট থাকে। তবে মাইক্রোফিলট্রেশন বা অণুপরিস্রাবণ–প্রক্রিয়ায় মাখন তৈরির আগে দুধকে ক্ষতিকর অণুজীব মুক্ত করা যেতে পারে। কাঁচা মাখন বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না বা উচিত নয়। কাঁচা মাখন সাধারণত রুটি ও টোস্টে মাখিয়ে খাওয়া হয়। সবজি, তরিতরকারি বা সাদা-ভাত দিয়েও খেতে অনেকে পছন্দ করেন। কেক-পেস্ট্রি, মিষ্টান্নতে ব্যবহার নির্ভর করে শেফের সৃষ্টিকৌশল, নৈপুণ্যের ওপর। রান্নায় কাঁচা মাখন তেমন ব্যবহার করা হয় না।  

অতিমিহি ও মিহি মাখন: কেবল পাস্তুরিত ক্রিম বা ননি (স্নেহপদার্থ ৩০ শতাংশ) থেকে এই চমৎকার মাখন তৈরি করা হয়। দুধ সংগ্রহের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বা দুধ ঘন করার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মাখন তুলতে হবে। এর আগে দুধ মোটেও হিমায়িত করা, জমাট বাঁধানো ও অম্লত্ব পরিবর্তন করা যাবে না। তবে মিহি মাখন তৈরিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্তই হিমায়িত বা ঠান্ডা জমাট বাঁধা দুধ ব্যবহার করা যাবে। কেক-পেস্ট্রি, মিষ্টান্ন তৈরিতে শেফদের এ ধরনের মাখনই বেশি পছন্দের। তা ছাড়া রান্নাতেও ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন রান্নায় স্বাদের মাত্রা বাড়াতে লবণযুক্ত মাখন ব্যবহৃত হয়ে থাকে
বিভিন্ন রান্নায় স্বাদের মাত্রা বাড়াতে লবণযুক্ত মাখন ব্যবহৃত হয়ে থাকে
ছবি: লেখক

লবণযুক্ত মাখন: এ মাখনে লবণের পরিমাণ সাধারণত শূন্য দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশের বেশি হয় না। বিভিন্ন রান্নায় স্বাদের মাত্রা বাড়াতে লবণযুক্ত মাখন ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

এওপি মাখন: মাখন উৎপাদনে ঐতিহ্য ধরে রাখতে কঠোর নিয়মকানুন মেনে বরাবর স্বাদ, ঘ্রাণ এবং গঠনের গুণগতমান অক্ষুণ্ন রাখতে পারলেই মাখনের মোড়কে ‘এওপি’ উৎকীর্ণ বিশেষ ও বিরল সম্মানের লোগোটি লাগানো যাবে। এ পর্যন্তই ফ্রান্সের তিনটি প্রতিষ্ঠান এমন অধিকার অর্জন করতে পেরেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হচ্ছে—সাঘ্রেনতেজ-পোয়াতু, ইসিগ্নি ও ব্রেস। ফ্রান্সের খাদ্যসংস্কৃতিতে এওপি আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

কঠোর নিয়মকানুন মেনে গুণগতমান অক্ষুণ্ন রাখতে পারলেই মাখনের মোড়কে 'এওপি' উৎকীর্ণ বিশেষ এবং বিরল সম্মানের লোগোটি লাগানো যাবে
কঠোর নিয়মকানুন মেনে গুণগতমান অক্ষুণ্ন রাখতে পারলেই মাখনের মোড়কে 'এওপি' উৎকীর্ণ বিশেষ এবং বিরল সম্মানের লোগোটি লাগানো যাবে
ছবি: ইসিগ্নি।

তরল ও অতি তরল মাখন: পাস্তুরিত দুধের ননি থেকে এই মাখন তৈরি করা হয়। তরল মাখনে স্নেহ উপাদান ৬০ থেকে ৬২ শতাংশের মধ্যে থাকতে হবে। আর অতি তরল মাখনে তা ৩৯ থেকে ৪১ শতাংশ। স্নেহ উপাদান কম থাকায় যাঁরা মুটিয়ে যাওয়ার ভয়ে থাকেন, তাঁদের খুব পছন্দের মাখন। রুটিতে মাখিয়ে খেতে, কেক, ডেজার্ট-পেস্ট্রি তৈরিতে ও হালকা আঁচে সবজি বা মাছ ভাজিতে চমৎকার স্বাদ আর ঘ্রাণের জন্য অনেকের খুব পছন্দের তরল ও অতি তরল মাখন।

ফাঁপানো মাখন: প্রস্তুতের সময় বিশেষ কায়দায় মাখনে বাতাস ঢুকিয়ে ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে এর আয়তন বৃদ্ধি করা হয়। ফলে একদম ফেনা না হলেও বেশ মোলায়েম হয় এবং সে কারণেই টোস্ট-বিস্কুট, রুটিতে মাখাতে, ছড়িয়ে দিতে খুব সহজ হয়। ফলের সালাদের ওপর ছড়িয়ে দিলে যেমন দৃষ্টিনন্দন হয়, তেমনই ফল-মাখনের মাখামাখিতে অন্য রকম ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হয়। যাঁরা মাখনের স্বাদ আর ঘ্রাণের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে, তাঁদের এ মাখন খুব একটা পছন্দ হবে না।  

অতিমিহি এবং মিহি মাখন, দুধ সংগ্রহের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মাখন তৈরি করতে হবে
অতিমিহি এবং মিহি মাখন, দুধ সংগ্রহের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই মাখন তৈরি করতে হবে
ছবি: লেখক

শুকনো মাখন: এ মাখন ৮২ শতাংশের স্থলে ৮৪ শতাংশ স্নেহ উপাদানে গঠিত। উচ্চ গলনাঙ্কের এ মাখন অভিজ্ঞ শেফদের বেশ প্রিয়। বিশেষ করে পাফ প্যাস্ট্রি শিটের আকাঙ্ক্ষিত গঠন বা টেক্সচার সৃষ্টিতে এ মাখনের বিকল্প খুব কম আছে।  

 এই শেষ নয়, আরও বহু ধরনের মাখন ফ্রান্সে পাওয়া যায়। স্বাদে, ঘ্রাণে এবং বৈচিত্রে৵ সেরা মাখন উৎপাদনে ফরাসিরা অতিমাত্রায় যত্নশীল। প্রতিটি ধাপে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। আর গরুর খাবারে রাসায়নিক, অ্যাডিটিভ, অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন ব্যবহার করার ব্যাপারে কঠোর আইন আর অনেক বিধিনিষেধ রয়েছে, যেগুলো মেনে চলতেই হবে।

বিশ্বব্যাপী দুগ্ধজাত পণ্য বা ডেইরি প্রোডাক্ট শিল্পের অনেকটাই জুড়ে আছে এই মাখন
বিশ্বব্যাপী দুগ্ধজাত পণ্য বা ডেইরি প্রোডাক্ট শিল্পের অনেকটাই জুড়ে আছে এই মাখন
ছবি: লেখক

বিশ্বব্যাপী দুগ্ধজাত পণ্য বা ডেইরি প্রোডাক্ট শিল্পের অনেকটাই জুড়ে আছে এই মাখন। বৈচিত্র্যগুণে এর ব্যবহারেও আছে বহু ভিন্নতা। আজকের ফরাসি খাদ্যসংস্কৃতির কথা আলোচনা করতে গেলে মাখনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। রন্ধনশিল্পে কৌলীন্য এ দেশটির এক ঈর্ষণীয় অর্জন, এক অনন্য ঐতিহ্য। পৃথিবী সব দেশকে ছাড়িয়ে ফরাসিরা যেমন সর্বাধিক মাখন ভোক্তার আসনটি নিজেদের দখলে রেখেছেন, তেমনই মাখনের এমন ব্যবহারে রন্ধনশিল্প ও কেক, পেস্ট্রি, মিষ্টান্নের মনমাতানো জগৎকে আলাদা মাত্রায় উন্নীত করতে ফরাসিরা সবার থেকে এগিয়ে আছেন।  
লেখক: মইনুল হাসান, ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক

হিরো ইমেজ: পেকজেলসডটকম

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৩, ০৩: ০০
বিজ্ঞাপন