আগারগাঁওয়ে উচ্ছেদ হলেও চলছে স্ট্রিট কেকের হুজুগ, কী আছে এই রং-বেরঙের ক্রিমে ভরা ভাইরাল কেকে?
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ঢাকার আগারগাঁওয়ে হাজারে-বিজারে স্লাইস করা সুলভ কেক বিক্রি নিয়ে বিগত এক মাস সোশ্যাল মিডিয়া ছিল সরগরম। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই কেকপট্টির বদৌলতে আজকাল কেকের নাম শুনলেও উলটো দিকে দৌড় দেওয়ার অবস্থা হয়েছে। আগারগাঁওয়ে উচ্ছেদ হয়েছে রাস্তা আটকে ভাইরাল কেকের পসরার মেলা। তবু চলছে স্ট্রিট কেকের হুজুগ। কী আছে এই রং-বেরঙের ক্রিমে ভরা ভাইরাল কেকে?

কী আছে এই রং-বেরঙের ক্রিমে ভরা ভাইরাল কেকে?
কী আছে এই রং-বেরঙের ক্রিমে ভরা ভাইরাল কেকে?

এ রকম খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে মানুষকে সচেতন করা না গেলে, অযথা জনদুর্ভোগ যেমন বাড়বে তেমনি সৃষ্টি হবে জটিল রোগের আশঙ্কা। কারণ এখন এই স্ট্রিটকেক এক ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ঢালাওভাবে সবাইকে দায়ী করা ঠিক না হলেও অনেক প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে এসব কেক নিয়ে। আর সেগুলোর উত্তর খোঁজার এক প্রয়াস রইল এখানে হাল ফ্যাশনের তরফ থেকে।

বিজ্ঞাপন

কী দেওয়া হয় এসব ভাইরাল আর সুলভে প্রতি স্লাইস বিক্রি করা কেকে? এখানে ব্যবহৃত চোখে লাগা সব রং আর ফ্লেভার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত? কেনই-বা নাভিশ্বাস ওঠা গরমে গলে যায় না কেকের লেয়ারে লেয়ারে আর ওপরে দেওয়া ভুরি ভুরি ক্রিম। এসব প্রশ্ন জেগেছে অনেক ভোক্তা ও খাদ্যসচেতন মানুষের মনে। মানুষের হুমড়ি খেয়ে পড়া আর প্রচুর বিক্রির হাতছানিতে কতটা মেনটেইন করেন হেলথ ও হাইজিনের ইস্যুগুলো এই স্ট্রিট কেক বিক্রেতারা? এসব বিষয়ে আমাদের কথা হয় ইউনিভার্সাল হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রভাষক প্রতীক প্রসাদ সাহার সঙ্গে। তিনি যা জানালেন, তা চোখ কপালে তোলার মতো। তিনি বলেন, এসব কেকে প্রচুর পরিমাণে তরল ডেইরি উপকরন আর নিউট্রিয়েন্ট থাকে। এর ফলে এটা লিস্টেরিয়াসহ অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির অন্যতম একটা মাধ্যম হতে পারে। ফ্রিজে রাখা হলেও কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।

এখানে ব্যবহৃত চোখে লাগা সব রং আর ফ্লেভার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?
এখানে ব্যবহৃত চোখে লাগা সব রং আর ফ্লেভার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?

এ ছাড়া এই কেক অনেক বেশি বা বারবার করে হাতে ধরা হয়। খোলা জায়গায় বিক্রি করার ফলে রাস্তার ধুলাবালু লাগে, মাছি বসতে পারে। এর ফলে নানারকম ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয় কেকের ওপরে। ঠিকঠাক করে ফ্রিজিং না করার জন্য গরম আর আর্দ্রতার কারণে কেক খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আরেকটা ব্যাকটেরিয়া আছে; নাম স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস। এই কেক বারবার হাত দিয়ে ধরার ফলে এতে এই ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। এই ব্যাকটেরিয়া টক্সিন তৈরি করে; ফলে মারাত্মক বমি হতে পারে। আরেকটি ব্যাকটেরিয়া হলো ব্যাসিলাস সিরিয়াস। কেককে যদি ঠিকঠাক করে ঠান্ডা না করা হয় আর সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে এই সিরিয়াস ব্যাকটেরিয়া সিরিয়াস হয়ে কেকের ওপর জন্ম নেয়। এতে ডায়রিয়া হতে পারে। এর সঙ্গে রক্ত পর্যন্ত যেতে পারে। আবার কেক ঠিকঠাক ঠান্ডা করা হলেও এই কেকের ওপরে লিস্টেরিয়া জন্মাতে পারে; যা শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। আর যদি সারাদিন এভাবে রাস্তায় রেখে বিক্রি করলেও কেক নষ্ট না হয়, তাহলে তো তা আরও বড় দুঃসংবাদ। এতে বোঝা যায় যে ন্যাচারালের বদলে হাই প্রসেসড আর কৃত্রিম উপকরণ আর উচ্চ মাত্রার প্রিজারভেটিভ দেওয়া হয়েছে কেকে।

বিজ্ঞাপন

কেককে সুন্দর করে সাজানোর জন্য কৃত্রিম রং ব্যবহার করা হয়। সেই সঙ্গে কমার্শিয়াল বিভিন্ন কেক ইম্প্রুভার, ইমালসাইফার আর ক্ষতিকর অ্যাডিটিভ দেওয়া হয় কেক দ্রুত বেক করা, প্রতিটি একই শেপের হওয়া আর খুব ফ্লাফি ও নরম টেক্সচার পাওয়ার অব্যর্থ উপায় হিসেবে। এই রং ও কেমিক্যালস থেকে ক্যানসার ছাড়াও নানা জটিল রোগ হতে পারে। কেকের নিম্নমানের সস্তা ক্রিমে প্রচুর পরিমাণে ট্রান্স–স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে, যা আমাদের স্থূলতাকে বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া রক্তে কোলেস্টেরলসহ অন্যান্য চর্বির পরিমাণ বৃদ্ধি করে।

কেন নাভিশ্বাস ওঠা গরমে গলে যায় না কেকের লেয়ারে লেয়ারে আর ওপরে দেওয়া ভুরি ভুরি ক্রিম
কেন নাভিশ্বাস ওঠা গরমে গলে যায় না কেকের লেয়ারে লেয়ারে আর ওপরে দেওয়া ভুরি ভুরি ক্রিম

ফরাজী হাসপাতালের পুষ্টিবিদ রুবাইয়া ঋতি বলেন, কেককে মজাদার করার জন্য প্রচুর পরিমাণে আর্টিফিশিয়াল সুইটনারযুক্ত সিরাপ বা ফিলিং ব্যবহার করা হয়, যা আমাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। এই শর্করা ধীরে ধীরে ফ্যাটে রূপান্তরিত হয়ে পাকাপাকিভাবে শরীরে জায়গা করে নেয়। কৃত্রিম উপকরণের ফলে এসব সিরাপ আর ফিলিং ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তোলে। তাই এসব খাবার ভাইরালের নেশায় বেশি বেশি খেয়ে বিপদ ডেকে আনবেন না যেন।

হলিডে ইন ঢাকা সিটি সেন্টারের প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ পেস্ট্রি শেফ আবদুল হাই জানান, অনেকেই প্রশ্ন বা অভিযোগ করেন কেন ভালো বেকারিতে কেক বা পেস্ট্রির দাম এত বেশি। গুণগত মান বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে ভালো উপাদান ব্যবহার করা হয় এসব জায়গায়। ভাইরাল সব কম দামের কেকের ক্রিমে দেওয়া মার্জারিন আর হাইড্রোজেনেটেড ভেজিটেবল ফ্যাট স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বেশি লাভের জন্য এসব দিয়ে কেক বানানো হয়। বিভিন্ন কমার্শিয়াল ক্রিম দিয়ে কেক বানালে কেক গলে না। হুজুগে অনেকে এই উপাদান দিয়ে কেক বানাচ্ছেন যাতে রাস্তায় রাস্তায় বিনা আয়াসে বিক্রি করা যায়, যা খুবই ক্ষতিকর। কারণ, এতে আছে প্রচুর পরিমাণ ট্রান্সফ্যাট। কেকে অবশ্যই উৎপাদনের তারিখ দিতে হবে। কেক তৈরির ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেলে সেই কেক কখনোই বিক্রি করা যাবে না বা খাওয়া যাবে না। কেক বানানোর পর দুই ঘণ্টার মধ্যে তা রেফ্রিজারেটরের পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। যেসব ডেইরি প্রডাক্ট ব্যবহার করা হয় সেগুলোর মাইক্রোবিয়াল টেস্ট করতে হবে। কাঁচা ডিম সরাসরি ব্যবহার না করে পাস্তুরিত ডিমের প্রডাক্ট ব্যবহার করতে হবে। সর্বোপরি ক্রেতা–বিক্রেতাসহ সবাইকে সচেতন হতে হবে।

আর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দেখা যায়, ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই একই সাইজের কেক
আর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দেখা যায়, ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই একই সাইজের কেক

মানসম্মত কেক তৈরি করা হোম বেকাররাও তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন আমাদেরকে অনেকেই। ঢাকার সুপরিচিত অনলাইন বেকিং উদ্যোগ ডীন'স বেকারির স্বত্ত্বাধিকারী উম্মে সালমা রুনু। তিনি বললেন, কেক বা এই জাতীয় ডেজার্ট শিশুরাই বেশি খায় ও পছন্দ করে। তাই মানের দিকে কোনো ছাড় দেন না তিনি। তাঁর কাছ থেকে মিলল শকিং তথ্য। তিনি বললেন, মান ঠিক রেখে দুই পাউন্ডের একটি সিম্পল ভ্যানিলা ফ্লেভারের কেক ২২০০ টাকার নিচে সেল করা সম্ভব হয়না তাঁর পক্ষে। আর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দেখা যায়, ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই একই সাইজের কেক। তিনি বললেন, অনেক ধরনের হুইপড ক্রিম পাওয়া যায় যেগুলো কখনো গলে যায় না। আবার এমন সব উপকরণ আছে, যা দিলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে কেক। ভেঙেও যায় না। এগুলো গ্রহণ করলে মারাত্নক স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে। রুনু আরও জানান, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালে কেকের বেসিক উপকরণের দাম ৫ গুণ বেড়েছে। ৮০০-৯০০ কেজির চকলেট এখন ২৫০০-২৬০০ টাকায় কিনতে হয়। সব উপকরণের অবস্থাই এরকম। তাই এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আসলে এত কম দামে মানসম্মত কেক বিক্রি করা কতটা সম্ভব তা নিয়ে এই হোম বেকার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

কেক আমাদের প্রতিদিনের খাবার নয়, বরং বিশেষ মুহূর্তের আনন্দের প্রতীক। কিন্তু অসচেতনতার কারণে এই খাবার বিষে পরিণত হলে ক্ষতি আমাদেরই। বিশেষ করে শিশুদের। তাই এসব স্ট্রিটকেক খাওয়ার আগে একটু সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি খাবারকে বেছে নিতে হবে। হুজুগে মাতা কোনোভাবেই উচিত হবে না।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৭: ৪৭
বিজ্ঞাপন