
দত্তপাড়ার সেই হাতে তৈরি পনির বিক্রি হতো স্থানীয় বাজারে। জিবে জল আনা স্বাদ আর আকর্ষণীয় বর্ণ ছিল পনিরের। গুণ আর মানের কারণে এই পনিরের পরিচিতি দ্রুত দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ পথচলায় অষ্টগ্রামের পনির কখনো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা জাগায়, আবার নানা প্রতিকূলতায় তা মুখ থুবড়ে পড়ে। কয়েক বছর ধরে অষ্টগ্রামের পনিরের পরিচিতি বিশেষ মাত্রা পায়। জাগায় নতুন করে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. বদরুজ্জামান ভূইয়া অষ্টগ্রামের বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে কোষাধ্যক্ষ পদে কর্মরত। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
বদরুজ্জামান ভূইয়া বলেন, অষ্টগ্রামের গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে গরু, মহিষ ও দুগ্ধজাত পণ্যের যোগসূত্র রয়েছে। পনিরের প্রধান উপকরণ দুধ। হাওরের বিশাল চারণভূমি আর সতেজ ঘাস থাকায় দুধে প্রচুর ক্রিম থাকে। এ কারণে অষ্টগ্রামের পনিরের রং ও স্বাদ আলাদা। এককথায় স্বাদের ভিন্নতার কারণে এখন হাওরের ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে উঠেছে অষ্টগ্রামে পনির।
তবে গৌরবের পাশাপাশি এই নিয়ে তাঁর দুঃখবোধও কম নয়। আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, পনিরকে ঘিরে যে ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠা প্রয়োজন, এখন পর্যন্ত সেই কাঠামো চোখে পড়ে না। পেশাটির সঙ্গে জড়িত মানুষদের উদ্দীপ্ত রাখতে নেই কোনো সহায়তা।
বর্ষায় বিস্তীর্ণ জলরাশি আর গ্রীষ্মে দিগন্তজোড়া মাঠ হাওরের সাধারণ চিত্র। হাওরের জমি মূলত এক ফসলি। বেশির ভাগ জমিতে ইরি ধান ফলে। এ কারণে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ প্রধান পেশা হয়ে ওঠে।

আবার বর্ষায় পানির বিশালতার কারণে সেই মানুষগুলো মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত হন। বড় একটি অংশ হয়ে পড়েন বেকার। নতুন কাজের সন্ধান করতে গিয়ে অনেকে হয়ে ওঠেন পনিরের কারিগর। ষাটের দশক অষ্টগ্রামের পনিরের জাগরণের বছর। সেই সময়টিতে হাওরবাসীর প্রায় ঘরেই পনির তৈরি হতো। তবে জৌলুশ বেশি দিন টেকেনি। প্রযুক্তির আধিক্য শুরু হওয়ার পর এই পেশার মানুষ বেকায়দায় পড়েন। অনেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পাড়ি জমান। তবে পেশা বদল করে অনেকে চলে গেলেও পনির পেশা বিলীন হয়ে যায়নি। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার লড়াই করে টিকে ছিলেন পেশায়।
কয়েক বছর ধরে অষ্টগ্রামের পনির দেশ–বিদেশে বেশ আগ্রহ জাগিয়েছে।
এখানকার পনির বিশেষ মর্যাদা পায় ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর। দিনটিতে হাওরের অলওয়েদার সড়ক উদ্বোধন হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সড়কটি উদ্বোধন করেন। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় ছিল অষ্টগ্রামের পনিরের স্তুতি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অষ্টগ্রামে আন্তর্জাতিক মানের পনির তৈরি হয়। আমি মনে করি, এখানকার পনির শুধু ঢাকা শহরে না, আমরা বিদেশেও পাঠাতে পারব।’
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মিঠামইনের বাড়িতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই দিনের মধ্যাহ্নভোজে খাবার তালিকায় ছিল পনির।


পেশা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর সেই দিনের বক্তৃতা অষ্টগ্রামের পনিরের বাজার সম্প্রসারণের বড় ভূমিকা রাখে।
মো. রফিক উপজেলা সদরের আলমদীঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা। অন্য পেশায় না গিয়ে পনির তৈরিকে মূল পেশা হিসেবে নেন তিনি। রফিক বলেন, এই পেশায় ছয় বছর। ১ কেজি পনির পেতে ১০ কেজি দুধ প্রয়োজন। হাঁড়িতে দুধ গরম করে ছানা করা এবং ছেঁকে পনির তৈরি করতে হয়। উৎপাদন খরচ ৭০০ টাকার কম নয়। বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। অনলাইনে অর্ডার আসছে সারা দেশ থেকে। বিদেশের চাহিদাও মেটাতে হয়।
এই পেশার অনেকে জানালেন, হাওরের বুকচিরে তৈরি হওয়া অষ্টগ্রাম, মিঠামইন ও ইটনা সড়ক এখন দেশবাসীর বিশেষ আগ্রহের জায়গা। প্রতিবছর, বিশেষ করে বর্ষায় সারা দেশ থেকে লাখো পর্যটক এখন ভিড় জমান হাওরের এই সড়কে। ফেরার সময় অনেকে হাতে করে নিয়ে যান পনির। এতে পনিরের চাহিদা বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। চাহিদার কারণে প্রতিবছর নতুন করে কিছু মানুষ এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।
উপজেলা সদরের কারবালাহাটি গ্রামের বাসিন্দা নিশান মিয়ার তিন পুরুষ পনির তৈরির সঙ্গে যুক্ত। পরিবারটির মধ্যে দাদা নূর আলী প্রথমে আসেন এই পেশায়। মৃত্যুর আগপর্যন্ত বাবা ফিরোজ আলীর আয়ের মাধ্যম ছিল পনির। বাবা–দাদার পেশায় তিনি টিকে আছেন বেশ ভালোভাবেই।

পনিরের কারিগর হতে পেরে এখন তাঁর গর্বের শেষ নেই। গর্বের কারণ তাঁদের তৈরি পনির বঙ্গভবন ও গণভবনে যায় নিয়মিত। যাচ্ছে বিদেশ। শৌখিন মানুষের কাছে পনিরের কদর বিশেষ।
গর্ব নিয়ে জানালেন, কয়েক বছর আগেও দিনে ৩০ থেকে ৪০ কেজির বেশি দুধের প্রয়োজন হতো না। এখন ২০০ কেজির কমে চলে না। কখনো ৩০০ কেজির প্রয়োজন হয়। সেদিন বেশি বেশি দূরে নয়, ৫০০ কেজি দুধ দিয়েও দিনের চাহিদা মেটাতে পারবেন না।