সেমাই: ইতিহাস, স্বাদ, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সেমাই ছাড়া কি বাঙালির ঈদ হয়? ঈদে এটি নিঃসন্দেহে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত একটি পদ। এই মিষ্টি পদের কদর প্রতিটি ঘরে। বাংলাদেশের এমন কোনো ঘর পাওয়া যাবে না, যেখানে ঈদে সেমাই রান্না হয় না। দেখতে মিহি হলেও বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হয়েও এটি আজ বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় খাবার।
আপনি জেনে অবাক হবেন, এই সেমাইয়ের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। যতটুকু জানা যায়, সেমাই, ভারমিসেলি, সেভিয়ান বা সেমাইয়ের উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে চমৎকার ইতিহাস। এটি সরাসরি এক জায়গা থেকে আসেনি; বরং বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বাণিজ্যপথের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিবর্তিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সেমাই শব্দের উৎপত্তি

ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, গ্রিক শব্দ সেমিদালিস (ময়দা) থেকে সংস্কৃত সমিদা, আর সেখান থেকেই এসেছে সেমাই বা সেমিয়া শব্দ। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় গ্রিক-ভারতীয় যোগাযোগের মাধ্যমে শব্দটির আগমন ঘটে বলে ধারণা করা হয়, যদিও খাবারটি পরে বিবর্তিত হয়েছে।

মিষ্টি সেমাই—যেমন শির খুরমা বা সেমাই ক্ষীর—মূলত পারস্য ও আফগান প্রভাবিত। মোগলরা এটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রিয় করে তোলে। বাংলাদেশে ১৯৩০-৫০–এর দশক থেকে এটি ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

সেমাইয়ের মূল উৎস

চীনের এই ধরণের নুডুলস থেকেই মনে করা হয় সেমাইয়ের উৎপত্তি
চীনের এই ধরণের নুডুলস থেকেই মনে করা হয় সেমাইয়ের উৎপত্তি

• প্রাচীনতম উৎস হিসেবে ধরা হয় চীনের ভারমিসেলি জাতীয় সরু নুডলস। হোয়াং শো নদীর কাছে প্রায় চার হাজার বছর আগের নুডলসের ফসিল পাওয়া গেছে। মঙ্গোলদের মাধ্যমে এটি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে মোগলদের হাত ধরে মধ্য এশিয়া হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। এখানে এসে এটি মিহি গড়ন ও মিষ্টি স্বাদ লাভ করে।
• আরেকটি মত অনুযায়ী, আরব বিশ্বে (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা) ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারমিসেলির মতো পাস্তা প্রচলিত ছিল, যা পরে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে সেটি আমাদের সেমাইয়ের মতো মিহি ছিল না।

• ভারতীয় উপমহাদেশে সেমাই আসে মূলত মধ্য এশিয়া, পারস্য ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে। মোগল আমলে (১৬-১৭ শতাব্দী) এটি জনপ্রিয়তা পায়। সম্রাট হুমায়ুন ও শাহজাহানের সময়ে পারস্যের খুরমার সঙ্গে দুধ ও ভাজা সেমাই মিশিয়ে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়। এর আগে সেমাই মিষ্টি ছিল না বলেও জানা যায়।

মিষ্টি সেমাই/শির খুরমা/সেমাই ক্ষীরের উৎপত্তি

• শির খুরমা: ফারসি শব্দ—‘শির’ মানে দুধ, ‘খুরমা’ মানে খেজুর। এর উৎপত্তি পারস্য ও আফগানিস্তানে। ইরানে দুধ ও খেজুর আর আফগানিস্তানে দুধ, শুকনা ফল ও বাদাম দিয়ে তৈরি হতো। পরে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মোগল আমলে ভাজা সেমাই ও চিনি যোগ হয়ে বর্তমান রূপ পায়।

মিষ্টি সেমাই
মিষ্টি সেমাই


• দক্ষিণ ভারত: প্রাচীন পায়সমের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ভারমিসেলি যোগ হয়। অনেকটা পায়েসের মতো হলেও এতে চালের বদলে সেমাই ব্যবহৃত হতো।
• বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ: পশ্চিমবঙ্গে এটি সিমুই নামে পরিচিত। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে ঈদে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং ১৯৩০-৫০–এর দশকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আগে হাতে তৈরি হলেও পরে এটি শিল্পজাত পণ্যে রূপ নেয়।

হাতে কাটা সেমাই
হাতে কাটা সেমাই

• বাংলার ঘরে তৈরি চুই বা চুটকি সেমাই ছিল একটি বিশেষ বিবর্তন। দুই আঙুলের চাপে ছোট দানা তৈরি করে দুধ ও চিনি দিয়ে রান্না করা হতো। কোথাও কোথাও হাতে কাটা সেমাইও তৈরি করা হয়, যেখানে চালের আটা ব্যবহার করা হয়। শীতে খেজুরের রস, নারকেলের দুধ ও কোরানো নারকেল দিয়ে এই সেমাই রান্না করা হয়।

লাচ্ছা সেমাই
লাচ্ছা সেমাই

চুই সেমাই থেকে লম্বা সেমাই আর পরে জিলাপির মতো প্যাঁচ দিয়ে লাচ্ছা সেমাই—এই কারিগরি এসেছে বাংলার ঘরের মায়েদের হাত ধরেই। দক্ষিণ ভারতে এতে নারকেল যোগ করা হয়।

আজ আমরা নানা পদের সেমাই খাই—রসালো, ক্ষীরভিত্তিক, লাচ্ছা বা ঝুরি—সবই এখন ঐতিহ্যের অংশ। ঈদে সেমাই না হলে যেন আনন্দই অসম্পূর্ণ! ঘরে ঘরে নতুন নতুন রেসিপির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে।

নানা দেশের রেসিপিও এখন সহজলভ্য। ফলে সেমাইয়ের বৈচিত্র্য আরও বাড়ছে। এভাবেই এর বিবর্তন ঘটেছে।
ঈদের মিষ্টি স্বাদে সেমাইয়ের গুরুত্ব যেন অটুট থাকে। ইতিহাস বদলাবে, স্বাদের বৈচিত্র্য আসবে—আর সেটাই সভ্যতার স্বাভাবিক অগ্রযাত্রা।

ছবি: হাল ফ্যাশন, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া

প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬, ১২: ০৮
বিজ্ঞাপন