
বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের লড়াই নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। মাঠে খেলোয়াড়রা যখন গোলের জন্য লড়াই করেন, তখন টেলিভিশনের সামনে বসে কোটি কোটি দর্শক নিজেদের প্রিয় খাবার নিয়ে উপভোগ করেন ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত। মজার বিষয় হলো, বিশ্বকাপ দেখার খাবারও দেশভেদে বদলে যায়। কোথাও বারবিকিউ, কোথাও টাকো, কোথাও আবার ফিশ অ্যান্ড চিপস ছাড়া খেলার আমেজই জমে না।
চলুন দেখে নেওয়া যাক, বিশ্বকাপ প্রিয় দলের ম্যাচের সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের পাতে কী থাকে।

ফুটবল আর আর্জেন্টিনা যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। ম্যাচের দিন পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে জমে ওঠে ‘আসাদো’—খোলা আগুনে ধীরে ধীরে গ্রিল করা গরুর মাংসের আয়োজন। সঙ্গে থাকে চোরিজো সসেজ, সালাদ এবং জনপ্রিয় হার্বাল পানীয় মাতে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের দিন অনেক পরিবারই ছোটখাটো বারবিকিউ উৎসবে মেতে ওঠে।

ব্রাজিলে ফুটবল কেবল খেলা নয়, জীবনযাপনের অংশ। বিশ্বকাপের সময় দেশজুড়ে দেখা যায় চুরাস্কো পার্টি। বিভিন্ন ধরনের গ্রিলড মাংস, ফেইজোয়াদা, চিজ ব্রেড এবং ট্রপিক্যাল ফলের জুস মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

বিশ্বকাপের অন্যতম স্বাগতিক মেক্সিকোতে ম্যাচের দিন মানেই টাকোর উৎসব। গরু, মুরগি কিংবা সি-ফুড দিয়ে তৈরি টাকোর সঙ্গে থাকে নাচোস, সালসা ও গুয়ারাকামোলি। বন্ধুদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়ার জন্য এসব খাবার আদর্শ।

ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপের আবহ সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে পাবগুলোতে। বড় পর্দার সামনে জড়ো হন ফুটবলপ্রেমীরা। ফিশ অ্যান্ড চিপস, চিকেন উইংস, পাই এবং নানা ধরনের স্ন্যাকস ম্যাচ উপভোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

জার্মানদের কাছে ম্যাচ মানেই ব্রাটওয়ার্স্টসহ বিভিন্ন ধরনের সসেজ এবং নরম প্রেটজেল। বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে খেলা দেখার জন্য এসব খাবার প্রায় অপরিহার্য।

ইতালিতে বিশ্বকাপের রাত মানেই অনেক পরিবারের জন্য পিৎজা নাইট। মার্গারিটা থেকে শুরু করে সি-ফুড পিৎজা—সবই জনপ্রিয়। সঙ্গে থাকে পাস্তা, অলিভ এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিপাস্তি। কিন্তু এবারও তারা নেই বিশ্বকাপে। তাই উৎসব জমবে কি আর তেমনভাবে?

জাপানে ম্যাচ দেখার সময় জনপ্রিয় খাবারের মধ্যে রয়েছে কারা-আগে, ইয়াকিতোরি এবং বিভিন্ন ধরনের বেন্টো বক্স। ছোট ছোট পরিপাটি পরিবেশন জাপানি খাদ্যসংস্কৃতির স্বকীয়তাকেই তুলে ধরে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘চিম্যাক’—অর্থাৎ ফ্রাইড চিকেন ও পানীয়—ফুটবল দেখার সবচেয়ে জনপ্রিয় কম্বিনেশনগুলোর একটি। বিশ্বকাপের রাতে রেস্তোরাঁ ও ফুড ডেলিভারি সেবাগুলো থাকে সবচেয়ে ব্যস্ত।

২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচের দিন জনপ্রিয় খাবারের তালিকায় থাকে বার্গার, হটডগ, চিকেন উইংস, বারবিকিউ ও নাচোস। বড় পর্দার সামনে বন্ধুদের নিয়ে ‘ওয়াচ পার্টি’ এখন আমেরিকান সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ মানেই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা। আর রাত জাগার সঙ্গী হিসেবে থাকে চা, কফি, সিঙ্গারা, সমুচা, চানাচুর, ফুচকা, হালিম কিংবা বিরিয়ানি। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে ছোটখাটো দাওয়াতের আয়োজনও কম হয় না। বিশ্বকাপের সময় মধ্যরাতের বিরিয়ানি অর্ডার যেন এক আলাদা সংস্কৃতিতেই পরিণত হয়েছে।
ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় পৃথিবীর সব ফুটবলপ্রেমী এক হয়ে যায়—খাবারের টেবিলে। কেউ টাকো খায়, কেউ বারবিকিউ, কেউ পিৎজা, কেউ বা সিঙ্গাড়া। কিন্তু সবার লক্ষ্য একটাই—প্রিয় দলের খেলা উপভোগ করা।
২০২৬ বিশ্বকাপ যখন উত্তর আমেরিকার তিন দেশজুড়ে শুরু হয়, তখন শুধু গোল, ট্রফি কিংবা তারকাদের গল্পই নয়; আলোচনায় থাকে বিশ্বের নানা প্রান্তের খাবারের গল্পও। কারণ ফুটবল আর খাবার—দুটোই মানুষকে কাছাকাছি আনার সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
—প্রিয় দলের খেলা দেখতে বসে পৃথিবীজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের সঙ্গী হয়ে ওঠে নিজস্ব স্বাদের খাবার।
ছবি: এআই ও উইকিপিডিয়া