পপি সিড আর পোস্তদানা কি একই জিনিস? পপি সিড খেলে কী হয় আর কেন নিষিদ্ধ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

পপি সিডস বা পোস্তদানা এক ধরনের মসলা, যা রান্নায় স্বাদ বাড়ায়। আলু পোস্ত, ঝিঙে পোস্ত তো ওপার বাংলার পাতে যুগ যুগ ধরেই পড়ছে। আমাদের দেশে অনেক জায়গায় সবজি রান্নায় পোস্ত দেওয়া হয়। এদিকে পার্সী আর মোগল খাবারেও পোস্তবাটার আবশ্যকতা আছে। মুর্গ মুসাল্লাম থেকে শুরু করে বিয়ে বাড়ির রোস্টে কিন্তু এই মসলা না দিলে স্বাদ খোলতাই আর টেক্সচার মাখা মাখা হবে না। একে 'খাস খাস' বলা হয় পার্সী ভাষায়।

আলু পোস্ত এক ঐতিহ্যবাহী পদ
আলু পোস্ত এক ঐতিহ্যবাহী পদ
ব্যাগেলে ব্যবহার করা হয় কালো পোস্তদানা
ব্যাগেলে ব্যবহার করা হয় কালো পোস্তদানা

আর এরই ইংরেজি নাম পপি সিড। কালো পোস্তদানা বেশি ব্যবহার হয় নানা দেশে রুটি-কেক বেক করতে। আর সাদা পোস্ত আমাদের এদিকে বেশি চলে রান্নায়। জানলে অবাক হতে হয়, এই ক্ষুদ্র দানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফিম নামের এক শক্তিশালী মাদক উপাদানের সম্পর্ক। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশে এটি নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত। সম্প্রতি আমাদের দেশে পাখির খাবারের নামে পাকিস্তান থেকে আসা একটি বড় পরিমাণে পপি সিডসের চালান ধরা পড়ার পর এ নিয়ে সবার মনেই অনেক প্রশ্ন জাগছে আর বিষয়টি উঠে এসেছে আলোচনায়। চলুন জেনে নেওয়া যাক, পপি সিড আসলে কী, এটি খেলে কী হয়, এবং কেন এত দেশে এর ব্যবহার আইনত বন্ধ।

বিজ্ঞাপন

পপি সিড কী

পপি সিড আসে আফিম গাছ (Papaver somniferum) থেকে। এই গাছের ফল থেকে যে সাদা দুধের মতো রস বের হয়, সেটিই শুকিয়ে তৈরি হয় আফিম (Opium। আর এই আফিম থেকেই তৈরি হয় শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ যেমন—

মরফিন (Morphine)

কোডিন (Codeine)

হেরোইন (Heroin)

পপি সিড বা আফিমের গাছ এমন হয় দেখতে
পপি সিড বা আফিমের গাছ এমন হয় দেখতে
পপি সিড বা পোস্তদানা হলো সেই গাছের শুকনো বীজ
পপি সিড বা পোস্তদানা হলো সেই গাছের শুকনো বীজ

অন্যদিকে, পপি সিড বা পোস্তদানা হলো সেই গাছের শুকনো বীজ। এই বীজ নিজে মাদক নয়, কিন্তু ফসল তোলার সময় আফিমের রস বীজের গায়ে লেগে যায়, ফলে এতে অল্প পরিমাণে মরফিন বা কোডিনের চিহ্ন থেকে যেতে পারে। তাই অপরিশোধিত পপি সিডস নিষিদ্ধ মাদকের তালিকায়ই পড়ে যায়। এই পপি সিডসই আবার পরিশোধন করে ফুড গ্রেড লাইসেন্স নিয়ে খাদ্যযোগ্য পোস্তদানা হিসেবে কেনাবেচা ও ব্যবহার করা হয় অনেক দেশে।

বিজ্ঞাপন

পপি সিড খেলে কী হয়

পরিষ্কার ও রান্নার উপযোগী পোস্তদানা সাধারণভাবে খাওয়ার জন্য নিরাপদ। এতে থাকে—

প্রোটিন ও ফাইবার

ক্যালসিয়াম ও আয়রন

উপকারী ফ্যাট (omega fatty acids)

তবে এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এতে সামান্য আফিম উপাদান রয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রান্নায় ব্যবহারের আগে ভালোভাবে ধোয়া না হলে এতে অল্প পরিমাণ মরফিন থাকতে পারে। এই পরিমাণে নেশা হয় না, কিন্তু ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ ফল দিতে পারে। বেশি পরিমাণে খেলে ঝুঁকি আছে, তবে তা অপরিশোধিত হলে।

ভালোভাবে ধোয়া না হলে এতে অল্প পরিমাণ মরফিন থাকতে পারে। এই পরিমাণে  ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ ফল দিতে পারে
ভালোভাবে ধোয়া না হলে এতে অল্প পরিমাণ মরফিন থাকতে পারে। এই পরিমাণে ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ ফল দিতে পারে

বেশি পরিমাণে অপরিশোধিত পোস্তদানা খেলে দেখা দিতে পারে—

মাথা ঝিমঝিম ভাব

ঘুম ঘুম ভাব বা তন্দ্রা

বমি বা বমি ভাব

অতিরিক্ত হলে অপিয়েট বিষক্রিয়া (Opiate poisoning) পর্যন্ত হতে পারে।

তাহলে পপি সিড ও পোস্তদানা কি একই জিনিস

পোস্তদানা আর পপি সিড একই জিনিস। পোস্ত হলো এর বাংলা নাম, আর পপি সিড ইংরেজি নাম। দুই ক্ষেত্রেই উৎস হলো Papaver somniferum নামের আফিম গাছ।
তবে এর বৈধতা দেশভেদে আলাদা। যেমন ভারতে এটি খাওয়ার জন্য বৈধ (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে খাবারে ব্যবহৃত)। কিন্তু বাংলাদেশে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কারণ এটি আফিমজাত পদার্থের আওতায় পড়ে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইউএই, সিঙ্গাপুরসহ বহু দেশে এটি মাদক হিসেবে গণ্য।

আমাদের দেশসহ অনেক দেশেই এটি নিষিদ্ধ
আমাদের দেশসহ অনেক দেশেই এটি নিষিদ্ধ

কেন পপি সিড নিষিদ্ধ

১. আফিমজাত উপাদানের উপস্থিতি

বীজের গায়ে থাকা অল্প পরিমাণ মরফিনের কারণে আইনত এটি আফিমজাত পণ্যের অন্তর্ভুক্ত।

২. অপব্যবহারের আশঙ্কা

কেউ চাইলে এই বীজ থেকে মাদক উপাদান আলাদা করতে পারে, যা বেআইনি কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

৩. আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জটিলতা

আফিম গাছ থেকে বৈধ ও অবৈধ পদার্থ আলাদা করা কঠিন, তাই নিরাপত্তার জন্য পুরো পণ্যকেই নিষিদ্ধ করা হয়।

বীজের গায়ে থাকা অল্প পরিমাণ মরফিনের কারণে আইনত এটি আফিমজাত পণ্যের অন্তর্ভুক্ত
বীজের গায়ে থাকা অল্প পরিমাণ মরফিনের কারণে আইনত এটি আফিমজাত পণ্যের অন্তর্ভুক্ত

পপি সিডসের ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর তফসিল (Schedule) অনুযায়ী,“Papaver somniferum” অর্থাৎ আফিম গাছ এবং এর যে কোনো অংশ, যেমন—
বীজ (পোস্তদানা),
ফল,
গাছের রস (latex),
নির্যাস বা গুঁড়া সবকিছুই নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য হিসেবে বিবেচিত।

অর্থাৎ, পোস্তদানাও আইনের চোখে “আফিমজাত মাদকদ্রব্য”-এর অংশ। এর বিক্রি, ক্রয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, আমদানি বা রপ্তানি সবই অবৈধ। লাইসেন্স বা অনুমতি ছাড়া পোস্তদানা রাখলে বা বহন করলে তা মাদকদ্রব্য বহনের অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আইন অনুযায়ী, এ অপরাধের জন্য হতে পারে গ্রেফতার জরিমানা, এবং কারাদণ্ড (সাজার মেয়াদ নির্ভর করে পরিমাণ ও উদ্দেশ্যের ওপর)।

সূত্র: লা প্রুভ, ডি এইচ গেইট, উইকিপিডিয়া

ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স, ইন্সটাগ্রাম, পেকজেলস

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৬: ১১
বিজ্ঞাপন