মন ভার করা বার্গার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ডিসেম্বরের ইউরোপিয়ান শীতটা হাড়ে হুল ফুটিয়ে চলেছে। থেকে থেকে এলোপাতাড়ি তুষার পড়ছে। হাতমোজা, কানটুপিতেও হু হু কাঁপুনি থামছে না। এই মুহূর্তে জাঁকানো শীতের একটা হাঁকানো গরম সমাধান দরকার। খিদেও পেয়েছে জব্বর। ঘরে ফিরে একথালা ভাত-মাছ উড়িয়ে দেওয়া যায়। তবে বাঙালি খানায় শীত কমে না, শুধু আলসেমিটাই বাড়ে। তাই বুদ্ধি করে বাড়ির রাস্তা না ধরে আটান্ন নম্বর বাসে চেপে বসলাম। কয়েকটা স্টপ পরই ঝুপ করে নেমে পড়তে হবে। মোড়ের কাছে সবুজ নিয়ন সাইনবোর্ডটা চোখে পড়তেই লাল বোতামটা টিপে দিলাম। বাস হুমবল্টস্ট্রাসেতে এসে কড়া ব্রেক করে থেমে গেল। ক্যাঁচ করে অটোমেটিক দরজা চিচিং ফাঁক হতেই চল্লিশ চোরের মতো হুড়মুড়িয়ে নামলাম আমরা একপাল যাত্রী। বেরিয়েই এতগুলো লোক দুদ্দাড় করে এদিক–সেদিক মিলিয়ে গেল। শহুরে লোকের বড্ড তাড়া।

বিজ্ঞাপন

সিগন্যালের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি হুমবল্টস্ট্রাসেতে। বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফন হুমবল্টের নামে নাম এ পথের। জ্ঞানী লোকের কদর করে জার্মান মহল্লার রাস্তাঘাটের নাম রাখা এদের পুরোনো স্বভাব। তবে হুমবল্ট সাহেব যদি জানতেন, তাঁর নামের রাস্তার এ পাশে আছে সুবিশাল এক অ্যাডাল্ট শপ, সেখানে টাঙানো রগরগে সব ছবি; আরেক পাশে রাশিয়ান মদের খুচরা দোকান, তাহলে কতটা খুশি হতেন বলা মুশকিল!

মিউনিখে ডিসেম্বরের হি হি শীত
মিউনিখে ডিসেম্বরের হি হি শীত

সিগন্যাল বাতি সবুজ হতেই ধীরেসুস্থে এগোলাম ওপারের নিয়ন সাইনবোর্ড বরাবর। এ মাথা  থেকে ও মাথাজুড়ে বড় করে লেখা Vollmundig। এই মাথামুন্ডু নামের খাস জার্মান উচ্চারণ আসলে, ফলমুন্ডিশ। সারা জীবন ফক্সওয়াগন গাড়িকে ভক্সওয়াগন আর ‘হুমবল্ট’ সাহেবকে ‘হামবল্ট’ বলে আসা এই অধমের সুকঠিন জার্মান উচ্চারণ বাগে আনতে বেগ পেতে হয় বৈকি। উচ্চারণটা বা ‘ফলমুন্ডিগ’ও হতে পারে। আর বাংলা মানেটাও ঠিকঠাক মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। তবে ইংরেজিতে বোধ হয় wholeheartedly হবে। মানে যা–ই হোক, পেটচুক্তি একদফা খাওয়া হলেই হলো।

বিজ্ঞাপন

হিম হিম ঠান্ডাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পাল্লা ঠেলে ভেতরে সেঁধিয়ে গেলাম। উনুনের উষ্ণ ঘ্রাণে নিমেষেই চাঙা লাগছে। রেস্তোরাঁর ভেতরটা খোলামেলা। বসার জায়গা আছে বেশ। তবে মেনুর ধরন ফাস্ট ফুড ধাঁচের। লোকে এসে দাঁড়িয়ে থেকে ডোনার কাবাব আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে যায়। বসে খাওয়ার সময় নেই। আমার সময়ের অভাব নেই আপাতত। তাই হাত-পা ছড়িয়ে, গা এলিয়ে বসে আয়েশ করে খাব আজ।

‘আরে, অনেক দিন পর যে! কী খবর?’ রেস্তোরাঁর ভালো মানুষ চেহারার মালিক লোকটা খুশি খুশি গলায় বলে উঠলেন।

এলোপাথাড়ি তুষারপাত
এলোপাথাড়ি তুষারপাত

‘হ্যাঁ, সব ভালো। মিউনিখ ছেড়ে দূরে বাসা নিয়েছি। তাই আর আসা হয় না। কিন্তু আজ মন টানল, চলে এলাম। আপনি ভালো তো?’ খুব পরিচিতের মতো আলাপ জুড়ে দিতে সময় লাগল না। ‘আর আপনার বউ ভালো আছেন তো?...’

বলতে না বলতেই মালিক হেঁশেল বরাবর হাঁকডাক জুড়ে দিলেন। ‘অ্যাই, কই তুমি? এদিকে একবার দেখো কে এসেছে’। বউ বেচারা তড়িঘড়ি উদয় হলেন ওপাশ থেকে। ‘আরে, তুমি যে! ইশ্, এত্ত দিন পর!!’ ভদ্রমহিলার অনুযোগের সুরটা অকৃত্রিম, আন্তরিক।

রেস্তোরাঁয় আর জনাদুই খদ্দের আছেন। তাঁরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছেন। এই কালোপনা মেয়ের জন্যে মিয়া–বিবির এত ব্যস্ততা তাঁদের মাথায় ঢুকছে না।

‘মেয়েটার পড়াশোনা কেমন চলছে? ল নিয়ে পড়ছে তো, তা–ই না? উকিল হতে আর কদ্দুর বাকি?’ অতি পরিচিতের মতো প্রশ্ন ছুড়লাম।

মেয়ের কথায় বাবার মুখে গর্বের হাসি ফুটল, ‘আর বোলো না, সামনে পরীক্ষা। নাকেমুখে পড়ছে সারাক্ষণ। তা তুমি কী খাবে? ফরমায়েশ দাও। গরম গরম বানিয়ে দিই।’

‘এই রেস্তোরাঁর সিগনেচার বিফ বার্গার ছাড়া আর কী। কিন্তু ঝাল বেশি করে।’
‘আলবত! তোমার ঝালের ধরন আমাদের খুব জানা। এখন ফ্রিজ থেকে একটা কোল্ড ড্রিঙ্ক নামিয়ে আরাম করে বসো তো।’

বাধ্য মেয়ের মতো সেদিকে পা বাড়ালাম।

‘পাওলানার’ নামে বিয়ারের একটা লোকাল ব্র্যান্ড আছে মিউনিখে। পুরো জার্মানিতে খুব নাম। তিতকুটে বিয়ারের বাইরে তারা ‘স্পেৎজি’ নামের নন-অ্যালকোহলিক এক অতি সুমিষ্ট সোডা বানায়। খেলে মনে হয়, আহা কী খেলুম! একই সঙ্গে কোক আর ফান্টার মিষ্টি ঝাঁঝালো স্বাদ। সে স্বাদে কোক-ফান্টার বাইরে আরও কিছু আছে। খুব চেনা, তবু অচেনা। সেটা যে কী, ভাবতে ভাবতে বোতল ফুরিয়ে যায়।

হাতের স্পেৎজি অর্ধেকে এসে ঠেকেছে। এই বোতল উড়িয়ে আরেকটা নেব নাকি?
‘তুমি সব শেষ করে ফেললে কিন্তু আমি কাঁদব।’

ফলমুন্ডিশ রেস্তোরাঁর অন্দরমহল
ফলমুন্ডিশ রেস্তোরাঁর অন্দরমহল

ভ্যাবাচেকা খেয়ে নকল ফ্যাঁচকান্নার উৎস বরাবর তাকালাম। বছর সাতেকের ছেলেটাকে যে সঙ্গে নিয়ে এসেছি, বেমালুম ভুলে গেছি। কোল্ড ড্রিঙ্কসমেত দিল ঠান্ডা করতে মশগুল থাকার সাইড এফেক্ট।

‘মা, তুমি কি মাঝেমধ্যে ভুলে যাও যে তোমার সঙ্গে একটা ছোট বাচ্চা আছে?’
চোঁ চোঁ বোতল টানা থামিয়ে বাকিটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে ধামাচাপার সুরে বললাম, ‘কী যে বল, ভুলে যাব কেন। নাও বাবা, খাও।’

নাহ্, আরেক বোতল স্পেৎজি দরকার। ছোট বাচ্চাদের পানীয়তে ভাগ বসানো উচিত নয়। তারা একঢোক মুখে পুরে আদ্ধেকটা গিলে বাকি আদ্ধেকটা আবার বোতলে বা গ্লাসে ফেরত দেয়। কুলিকুচি স্টাইলে চলে তাদের পান পর্ব। লালা আর খাবারের কণা মিশে পানীয়র ঘনত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে অতি ভয়ানক হেমলক বিষ হয়ে যায়। কেবল মরুভূমির ধু ধু প্রান্তরে জান বাঁচানোর জন্যে এই বস্তু খাওয়া যেতে পারে। নচেৎ নহে।

এ বয়সীদের সাথে কোল্ড ড্রিঙ্কস ভাগ করে না খাওয়াই উত্তম
এ বয়সীদের সাথে কোল্ড ড্রিঙ্কস ভাগ করে না খাওয়াই উত্তম

রেস্তোরাঁর মালিক আর মালকিনই সর্বেসর্বা। জামাই ওয়েটার আর ক্যাশিয়ার, বউ শেফ। মাংসের প্যাটি ভাজার ঘ্রাণ ছুটিয়ে দুই থালায় উড়ে এল দুই জাম্বো সাইজের বার্গার। মাঝবরারব কেটে সেখানে মচমচে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইগুলোর জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।

‘কিন্তু ফ্রাই তো অর্ডার করিনি...।’

‘এটা আমার অর্ডার ধরে নাও। অন দ্য হাউস, ওকে?’ দরাজ হাসিতে এ কান-ও কান ওয়েটারের।

ওকের বিপরীতে বিরাট এক ‘দাঙ্কেশ্যোন’ শুনিয়ে ধন্যবাদ দিয়ে প্লেট টেনে নিলাম কাছে।

সবুজ সালাদ পাতার সঙ্গে লাল টমেটোর তাজা টুকরা ভাব জমিয়েছে জব্বর। গোল গোল পেঁয়াজের রিং আয়েশি ভঙ্গিতে শুয়ে আছে নরম রুটির তাকিয়ায় বিছানা পেতে। গলন্ত পনিরের সোনালি আস্তরণের আড়ালে জলপাইয়ের টুকরাগুলো পিটপিটিয়ে চাইছে অলস চোখে।

ফলমুন্ডিশ রেস্তোরাঁর বার্গার
ফলমুন্ডিশ রেস্তোরাঁর বার্গার

চোখ বুজে এক কামড় বসিয়ে দিলাম হালুম করে। উনুনের গরম তাওয়ায় এ পিঠ–ও পিঠ ঝলসানো মাংসের চাকতিটা যে বাসনা ছুটিয়েছে, তার কাছে গুচি-শ্যানেল ফেল মারবে। এ ঘ্রাণ ছোট শিশিতে ভরে কেন লোকে বাজারে ছাড়ে না? ফলমুন্ডিশ ব্রান্ডের বার্গার ফ্লেবারের পারফিউম মেখে যে তরুণী একবার পথ দিয়ে হেঁটে যাবে, তার চারপাশে ছেলেপেলেরা সব পা হড়কে পড়ে থাকবে।

‘খেতে ঠিকঠাক হয়েছে তো?’ দারুণ বিজনেস আইডিয়ার বেলুনে পিন ফুটিয়ে জানতে চাইলেন রেস্তোরাঁর মালিক ভদ্রলোক।

দুই গালে বিশাল দুটো টুকরা পুরে কথা কইবার অবস্থা নেই। তাই সজোর মাথা নেড়ে বারদুই ‘ঘোঁৎ’জাতীয় শব্দ তুলে জানিয়ে দিলাম, লাজওয়াব।

জবাবে খুশি হয়ে তিনি কোল্ড ড্রিঙ্কসের আলমারি থেকে আরেক বোতল স্পেৎজি এনে হাজির করলেন। বটল ওপেনারে ধাতব ছিপি ফটাশ করে খুলে কোন দিকে দৌড় দিল, কে জানে। ঝাঁঝালো ফেনা তোলা সোডা ওয়াটার বোতল ডিঙিয়ে দুর্বার বেরিয়ে আসতে চাইল। চুমুকে গলা ভিজিয়ে আর্দ্র চোখে কৃতজ্ঞতা জানালাম। এ লোক নির্ঘাত টেলিপ্যাথি জানেন।

‘মা, তোমার নাকে সস। তোমাকে সার্কাসের ক্লাউনের মতো লাগছে, হি হি...।’

ছেলের সঙ্গে রেস্তোরাঁমালিক আর তাঁর মালকিন বউও হেসে উঠলেন। এরা দুজন সামনে দাঁড়িয়ে আগ্রহ নিয়ে বার্গার ভক্ষণ দেখছেন। হঠাৎ একটা রহস্য বোঝা গেল। এই রুটি, এই মাংসের প্যাটি আর যত রসদ, সে তো আর দশখানে খুব পাওয়া যায়। কিন্তু আজ, এখানে, একটা সিক্রেট ইনগ্রেডিয়েন্ট মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই গোপন মসলার নাম ভালোবাসা। কোথাকার কোন বাংলাদেশের কালো মেয়ের জন্যে এত মমতা এরা না দেখালেও পারতেন। দুটো নির্মল হাসিমুখের সামনে খুব আড়ষ্ট লাগছে এই মুহূর্তে।

বাইরে ট্রাফিক সিগন্যালের হলুদ বাতি জ্বলছে। ভেতরে ফলমুন্ডিগ রেস্তোরাঁয়ও যেন সময় বইছে খুব ধীরে। ডিসেম্বরের হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসা শীতের বনামে এই উষ্ণ আয়োজন খুব দরকার ছিল। রসাল রুটির টইটম্বুর পেটে কামড় পড়ে তার আকৃতি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। সেই সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে জাগতিক যত সমস্যা আর দুশ্চিন্তারা।

ধীরে ধীরে খাদ্য পর্ব গুটিয়ে বিল চুকিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

‘দেশে যাচ্ছি, সামনে কিছুদিন দোকানে এলে পাবে না’।
প্রায় নিশ্চিত সুরে বললাম, ‘আফগানিস্তানে যাচ্ছেন? তা, কোন শহরে?’
‘আমরা তো আফগান নই। ইরাক থেকে এসেছিলাম এই জার্মান দেশে। তারপর উনচল্লিশ বছর কেটে গেছে। ফেরা আর হয়নি...।’ উদাস শোনাল তাঁর স্বর।
উনচল্লিশ বছর পর স্বদেশে ফেরা লোককে কী বলতে হয়, জানা নেই। তাই আর কিছু খুঁজে না পেয়ে আবার বেমানান জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা, কোন শহরে?’
‘বাগদাদ। বাগাদাদে জন্ম আমার।’

মনে মনে হিসাব কষলাম। সাল ২০২২ থেকে উনচল্লিশ বিয়োগ করলে দাঁড়ায় ১৯৮৩ সাল। তার মানে সেই ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে আসা হয়েছিল তাঁর। নিশ্চয়ই শরণার্থী হিসেবে। এ দেশের কৃষ্টি-কালচার-ভাষা শিখে আবার একটা নতুন জীবনের তাগিদে টাইগ্রিস নদীর তীরঘেঁষা বাগদাদ শহর ক্রমে ক্রমে সরে গেছে বহু দূরে। এত বছরের অভিমানী দূরত্ব মানচিত্রের হাজার মাইল-কিলোমিটারের চেয়ে অনেক বেশি যে।

‘হুউউমম...।’ কী বলব, বুঝতে না পারা আমার একপেশে প্রতিক্রিয়া।
হালকা মেজাজটা ফিরিয়ে আনতে ওপাশ থেকে তরল রসিকতা ভেসে এল, ‘বাংলাদেশের সব মেয়ে কি তোমার মতো সুন্দর আর তোমার মতো করেই হাসে নাকি?’
জবাবে আবলুশ কাঠের মতো মিশকালো বঙ্গকন্যা তার কুলাকান দুলিয়ে, মুলাদাঁত খেলিয়ে পটলচোখে দুষ্টু হেসে বলল, ‘একদম ঠিক বলেছেন।’

লেখক: ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার, গবেষক, মিউনিখ, জার্মানি।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১৩: ১৭
বিজ্ঞাপন