জর্জিয়ার স্বাদে ককেশাসের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কৃষ্ণসাগরের তীরবর্তী প্রতিটি জনপদ আমার কাছে অসম্ভব রকমের সুন্দর মনে হয়। ২০১৯ সালের কথা, তুরস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ট্রাবজোনে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সামসুন থেকে শুরু করে অরদু, গিরেসুন আর রিজে—পুরো পথে প্রকৃতির অবর্ণনীয় রূপে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেদিন থেকেই কৃষ্ণসাগর আমার হৃদয় হরণ করে নিয়েছে। সাগরের নীলাভ জলের সঙ্গে চারপাশের সবুজ প্রকৃতির এক মোহনীয় যুগলবন্দীতে তৈরি হয়েছিল এক মায়াবী দৃশ্যপট, যা আজীবন অম্লান থাকবে স্মৃতির পাতায়।

তুরস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ট্রাবজোন
তুরস্কের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ট্রাবজোন

ট্রাবজোনের সেই সুখস্মৃতিকে উপজীব্য করেই মূলত জর্জিয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা।
ইউরোপ আর এশিয়ার ঠিক মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা ২৬,৯১১ বর্গমাইল আয়তনের এক ছিমছাম দেশ জর্জিয়া। ১৯৯১ সালে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আলাদা হয়ে এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে। বয়সের বিচারে রাষ্ট্রটি নবীন হলেও, এই ভূখণ্ডের জনবসতি আর ঐতিহ্যের শেকড় প্রোথিত রয়েছে কয়েক হাজার বছরের সুগভীর ইতিহাসে।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত কোনো দেশের ভিসা বা রেসিডেন্ট পারমিট পকেটে থাকলে জর্জিয়ায় পা রাখার জন্য বাড়তি কোনো ভিসার ঝক্কি পোহাতে হয় না। ইমিগ্রেশন পেরোনোর সময় অফিসার পাসপোর্টে শুধু একটি অ্যারাইভাল সিল বসিয়ে দেন, আর সেটিই এই অপরূপ দেশে প্রবেশের চূড়ান্ত ছাড়পত্র।

কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত বাটুমি জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং জর্জিয়ার একমাত্র সমুদ্র বন্দর
কৃষ্ণসাগরের তীরে অবস্থিত বাটুমি জর্জিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং জর্জিয়ার একমাত্র সমুদ্র বন্দর

এককালের সোভিয়েত বলয়ের দেশগুলোতে জর্জিয়ান খাবারের সুখ্যাতি রীতিমতো কিংবদন্তিতুল্য। বিশেষ করে খাচাপুরি আর জর্জিয়ান ডাম্পলিং হিসেবে পরিচিত খিঙ্কালির স্বাদ না নিলে পুরো জর্জিয়া ভ্রমণই এক রকম অপূর্ণ থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

খাচাপুরির সঙ্গে ইতালিয়ান পিৎজার বেশ খানিকটা সাদৃশ্য থাকায় অনেকেই একে ‘জর্জিয়ান পিৎজা’ নামে ডাকতে ভালোবাসেন। তবে পিৎজার মতো এতে নানা রকমের টপিংয়ের কোনো বাহুল্য নেই।

রাজধানী তিবিলিসির একেবারে প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তাভিসুপলেবিস ময়দানি। ইংরেজিতে এ স্থানকে ফ্রিডম স্কয়ারও বলা হয়
রাজধানী তিবিলিসির একেবারে প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত তাভিসুপলেবিস ময়দানি। ইংরেজিতে এ স্থানকে ফ্রিডম স্কয়ারও বলা হয়

খাচাপুরির আসল জাদুটুকু লুকিয়ে থাকে এর পনিরে, যার একটি অলিখিত শর্ত রয়েছে—এই পনির অবশ্যই জর্জিয়ার কোনো স্থানীয় গোয়ালার পালিত গরুর খাঁটি দুধ থেকে তৈরি হতে হবে। স্রেফ ময়দার তৈরি মোলায়েম খামিরের ওপর সেই আদি ও অকৃত্রিম পনিরের প্রলেপ দিয়ে সেটিকে ওভেনে বা চুলায় পরম যত্নে সেঁকে নেওয়া হয়। এভাবেই জন্ম নেয় সুস্বাদু খাচাপুরি।

জর্জিয়ার প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের খাচাপুরি তৈরির স্বকীয়তা রয়েছে। তবে বাটুমি শহরে বসে যে ‘আচারিয়ান খাচাপুরি’র স্বাদ নিয়েছিলাম, তার রেশ আমার জিবে এখনো আছে। সাধারণ খাচাপুরির চেয়ে এটি একেবারেই আলাদা; কারণ এতে পনিরের পাশাপাশি ডিমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। আচারিয়ান খাচাপুরির দুই প্রান্ত দেখতে মাকুর মতো তীক্ষ্ণ, আর ঠিক মাঝখানের অংশে থাকে গ্রেট করা পনিরের স্তূপ।

বাটুমিতে খাওয়া আচারিয়ান খাচাপুরির স্বাদ এখনও আমার জিবে লেগে আছে
বাটুমিতে খাওয়া আচারিয়ান খাচাপুরির স্বাদ এখনও আমার জিবে লেগে আছে

সেই পনিরের উষ্ণতায় আধসিদ্ধ হতে থাকে একটি আস্ত ডিমের কুসুম। অনেকেই পিৎজার সঙ্গে বাড়তি সস বা মেয়োনেজ খেতে পছন্দ করেন, কিন্তু এখানে এর বদলে দেওয়া হয় খাঁটি মাখন বা ক্রিম চিজ। গরম থাকা অবস্থাতেই ওয়েটার এসে পুরো খাচাপুরির গায়ে বাটার ব্রাশ করেন। এরপর চামচ দিয়ে মাখন, ডিমের কুসুম আর গলিত পনির একসঙ্গে মিশিয়ে কিছুক্ষণ ঘেঁটে এক অদ্ভুত সুন্দর মিশ্রণ তৈরি করতে হয়। সবশেষে খাচাপুরির মুচমুচে কিনারা থেকে রুটি ছিঁড়ে সেই উষ্ণ মিশ্রণে ডুবিয়ে মুখে পুরে নেওয়ার অনুভূতি এক কথায় স্বর্গীয়।

আবার ককেশাস পর্বতমালার কোলে অবস্থিত অপরূপ পাহাড়ি জনপদ স্তেপানৎসিমিন্দার হিমশীতল বাতাসের মাঝে বসে খেয়েছিলাম এক ভিন্ন স্বাদের খাচাপুরি। আচারিয়ান খাচাপুরির মতো এতে ডিম বা মাখনের আভিজাত্য নেই; বরং এটি দেখতে অনেকটা আমাদের পরিচিত গোলাকার রুটির মতো, যাকে স্থানীয় লোকজন মূলত ‘ইমেরুলিয়ান খাচাপুরি’ হিসেবে চেনেন। এর ভেতরে থাকে গলিত পনিরের পুরু স্তর। আগুনে সেঁকার ফলে ওপরের দিকটা হালকা বাদামি বর্ণ ধারণ করে। চারপাশের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি পরিবেশ আর হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মাঝে চুলা থেকে নামানো এমন ধোঁয়া ওঠা একটুকরা গরম খাচাপুরি মুখে পুরে দেওয়ার তৃপ্তি আক্ষরিক অর্থেই অতুলনীয়।

ইমেরুলিয়ান খাচাপুরি
ইমেরুলিয়ান খাচাপুরি

খাচাপুরির স্বাদ আমার কাছে প্রচলিত যেকোনো খাবারের চেয়ে একেবারেই আলাদা মনে হয়েছে। তবে এক অদ্ভুত কারণে জর্জিয়ান এই পনিরের মাঝে আমি বারবার আমাদের দেশীয় ঢাকাই পনির বা অষ্টগ্রামের পনিরের এক স্মৃতিকাতর ঘ্রাণ খুঁজে পাচ্ছিলাম।

অন্যদিকে খিঙ্কালি আত্মীয়তার এক সুদৃঢ় বন্ধন গড়ে তুলেছে আমাদের অতি পরিচিত মোমোর সঙ্গে। তবে আকারে এটি মোমোর চেয়ে বেশ বড় আর এর গড়নটাও ভারী চমকপ্রদ। ময়দার তৈরি মোলায়েম আর পাতলা আবরণের ভেতর ঐতিহ্যগতভাবে কিমা করা মাংস, ধনেপাতা, পেঁয়াজ আর নানা রকম সুগন্ধি মশলার এক রসালো পুর ঠেসে দেওয়া হয়। খিঙ্কালির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর ভেতরের মাংসের ব্রথ বা স্যুপ। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর স্বাদেও এসেছে বৈচিত্র্য। এখন মাংসের পাশাপাশি আলু, পনির, পালং শাক, এমনকি সুস্বাদু মাশরুমের পুর দেওয়া খিঙ্কালিও সমান তালে তৈরি হয়, যা নিরামিষভোজীসহ সবার কাছে দারুণ সমাদৃত।

এই পদটি খাওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী কায়দা আছে। কাঁটাচামচ বা ছুরি দিয়ে কাটলে ভেতরের সব রসালো ব্রথ প্লেটে গড়িয়ে পড়বে, যা আক্ষরিক অর্থেই স্বাদের অপচয়। একে ধরতে হয় এর ওপরের প্যাঁচানো গিঁট বা মাথার দিকটি ধরে।

জর্জিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার খিঙ্কালি
জর্জিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার খিঙ্কালি

প্রথমে খুব সাবধানে একটুখানি কামড় দিয়ে ভেতরের গরম আর সুস্বাদু ঝোলটুকু চুমুক দিয়ে পান করে নিতে হয়। এরপর মূল অংশটুকু খেতে হয় পরম তৃপ্তিতে। ওপরের যে শক্ত গিঁট ধরে এটি খাওয়া হয়, সেটি সাধারণত খাওয়া হয় না; জর্জিয়ানরা একে প্লেটের এক পাশে রেখে দেন হিসাব রাখার জন্য—কে কয়টি খিঙ্কালি খেলেন! জর্জিয়ানদের আতিথেয়তা আর তাদের সংস্কৃতির এক অনবদ্য প্রতীক এই খিঙ্কালি, যার প্রতিটি কামড়ে লুকিয়ে থাকে ককেশাস পর্বতমালার এক আদিম আর স্নিগ্ধ স্বাদ।

ছবি: লেখক

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৬: ০০
বিজ্ঞাপন